ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

চিকিৎসা

বার্ধক্যজনিত সাধারণ রোগ ও সমস্যা: প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

বার্ধক্যজনিত সাধারণ রোগ ও সমস্যা: প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ
×

মো. আবদুর রহমান খান

মো. আবদুর রহমান খান

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬ | ০৭:২৩ | আপডেট: ১৬ মে ২০২৬ | ০৭:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

মানবদেহের প্রতিটি অঙ্গের হোমিওস্ট্যাটিক রিজার্ভ বা সীমার অতিরিক্ত কাজ করার গোপন ক্ষমতার ক্রমবর্ধমান সংকোচনকে জৈবিক বার্ধক্য বলা যায়। এই ক্ষয় প্রায় ৬০ বছর বয়স থেকে শুরু হয় এবং ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়। জিনগত প্রভাবও থাকে এতে। খাদ্যাভ্যাস, পরিবেশ, ব্যক্তিগত অভ্যাস, মানসিক ও সামাজিক চাপ এবং কিছু সিস্টেমিক রোগও এর জন্য দায়ী। 

জাতিসংঘ মানুষের এ বুড়িয়ে যাওয়াকে স্বীকৃতি দেয়। সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ডে এ বয়সের লোকদের পরিপক্ব মনোভাব ও সক্ষমতার যে ছাপ থাকে, তাকেও সংস্থাটি গুরুত্ব দেয়। জাতিসংঘ ১৯৯৯ সাল থেকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ বর্ষ (আইওয়াইওপি) পালন করে আসছে এবং প্রতিবছর প্রবীণ কল্যাণ দিবস ও বিশ্ব আলঝেইমার রোগ দিবস (২১ সেপ্টেম্বর) পালন করে, যার মূল লক্ষ্য হলো সংহতি, সম্মান, প্রজন্মের মধ্যে আদান-প্রদান, প্রবীণদের সমস্যা এবং তাদের যত্ন নেওয়া।

বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ প্রবীণ। তাদের তরুণ প্রবীণ (৬০-৭০ বছর); মধ্যবয়সী প্রবীণ (৭০+ -৮০ বছর); অতিবৃদ্ধ (৮০+ বছর)– এ তিন ভাগে ভাগ করা হয়।
বাংলাদেশ সরকার এই প্রবীণ ব্যক্তিদের স্বাধীনতা, অংশগ্রহণ, স্বাস্থ্যসেবা, স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং মর্যাদার মতো বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দেয়। জীবনযাত্রার মান, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং স্বাস্থ্যসেবার উন্নতির ফলে এখানে মৃত্যুহার কমেছে, গড় আয়ু ৭২ বছর পর্যন্ত বেড়েছে এবং প্রবীণ মানুষের হার বাড়ছে। আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন, আধুনিকীকরণ, বর্তমান পারিবারিক রীতিনীতি এবং মানুষের মানসিকতার পরিবর্তনের ফলে প্রবীণ ব্যক্তিরা পরিবারের পক্ষ থেকে যথাযথ যত্ন পাচ্ছেন না। পরিবারের আকার, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রভাবের কারণে যৌথ পরিবারের ধারণাটি ভেঙে যাচ্ছে। বাংলাদেশে ভাঙা পরিবার বা একক (শুধু বাবা বা মা-কেন্দ্রিক) পরিবারের ধারণার অনেক অসুবিধা রয়েছে। এটি মূলত শিক্ষিত ও ধনী অংশেই বেশি দেখা যায়, যেখানে উপার্জনকারী সদস্যরা বাইরে বা বিদেশে বসবাস করেন, আর অতিবয়স্ক ব্যক্তিরা দুর্দশার মধ্যে বা বৃদ্ধাশ্রমে বাস করেন।

বাংলাদেশে বয়স্ক ব্যক্তিদের সমস্যা:
যত্ন ও তত্ত্বাবধানের জন্য বাড়িতে ব্যক্তির অভাব
দুর্বল আর্থসামাজিক অবস্থা
খাদ্য ও সঠিক পুষ্টির অভাব
বয়স্কদের জন্য দুর্বল স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা
স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং রোগ সম্পর্কে সচেতনতার অভাব
পরিবারের সদস্য ও সমাজের মানসিক ও আর্থিক নির্যাতন
পরিবার ও সমাজের কাছ থেকে যত্নের ঘাটতি
গুরুতর অসুস্থতায় অর্থনৈতিক সমস্যা

অসহায়ত্ব বা ঝুঁকির কারণ
১. জীবনযাত্রা এবং দৈনন্দিন জীবনের ব্যাহত কার্যকলাপ এবং বার্ধক্য নিজেই।
২. ধূমপান, মদ্যপান, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ (বায়ু, পানি এবং শব্দদূষণ)
৩. পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়ার ইতিহাস → প্রধানত মাথায় আঘাত।
৪. মানসিক অসুস্থতা → বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপ এবং একাকিত্ব।
৫. স্নায়বিক অসুস্থতা → অস্বাভাবিক চলনভঙ্গি বা ভারসাম্যহীনতা, পেশি দুর্বলতা এবং পারকিনসন্স রোগের আক্রমণ।
৬. সিস্টেমিক রোগ → উচ্চ রক্তচাপ, ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজ (আইএইচডি), স্ট্রোক, ডায়াবেটিস মেলিটাস (ডিএম), থাইরয়েডের রোগ, ক্যান্সার এবং ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি), যকৃতের রোগ এবং কিডনির রোগ।
৭. দুর্বল আর্থসামাজিক অবস্থা এবং পরিবারের সদস্যদের দ্বারা অবহেলা।
৮. সাইকোট্রপিক ওষুধ সেবন।

বয়স্কদের সাধারণ রোগ/সমস্যা:
বার্ধক্যে প্রধানত দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং অসংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব থাকে; যেমন–উচ্চ রক্তচাপ, ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজ, ডায়াবেটিস মেলিটাস, স্ট্রোক, ক্যান্সার, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ এবং শারীরিক, মানসিক অস্থিরতা এবং সামাজিক ও পারিবারিক অসামঞ্জস্যের সঙ্গে সম্পর্কিত মানসিক রোগ। 

সাধারণত জেরিয়াট্রিক অসুস্থতা বা বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা নামে পরিচিত রোগগুলো হলো:
১. ডিমেনশিয়া: বার্ধক্যজনিত মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা, যা সাধারণত ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। এতে উপলব্ধি বা চেতনার কোনো ক্ষতি ছাড়াই স্মৃতি, ভাষা, আবেগ এবং ব্যক্তিত্বের মতো জ্ঞানীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যাবলির স্থায়ী ক্ষতি হয়। ডিমেনশিয়ার সবচেয়ে সাধারণ ধরন হলো আলঝেইমার রোগ, যা মস্তিষ্কের কোষের ক্ষয়, অবক্ষয় এবং কোষগুলোতে প্রোটিন জমার কারণে ঘটে। এতে সংকেত পরিবহনে ত্রুটি দেখা দেয়। রোগী চিনতে বা মনে রাখতে পারেন না, তার যুক্তিসংগত চিন্তাভাবনার ক্ষমতা কমে যায় এবং নিজের আত্মীয় বা পরিচর্যাকারীর প্রতি তার আস্থা বা বিশ্বাস কমে যায়। আলঝেইমার রোগে আক্রান্তদের প্রায় অর্ধেক ৮০ বছরের বেশি বয়সী এবং নারীদের মধ্যে এর হার বেশি। তাদের বেশির ভাগেরই মাথায় আঘাত, হৃদরোগ/স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, বিষণ্নতা, থাইরয়েড রোগের ইতিহাস থাকে। এতে স্মৃতিশক্তি, বিচার-বিবেচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং মল-মূত্র ধরে রাখতে না পারার মতো সমস্যা দেখা দেয়। এই রোগটি কিছু ক্ষেত্রে সংক্রমণ এবং দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতাসহ অন্যান্য বার্ধক্যজনিত রোগের সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে। 

বাংলাদেশে প্রায় ১৫ লাখ (৬০+ বছর বয়সী প্রতি ১২ জনের মধ্যে একজন) মানুষ ডিমেনশিয়ায় ভুগছেন। এই ধরনের রোগীদের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং পরিচর্যাকারীদের সহায়তার জন্য প্রাথমিক স্ক্রিনিং/রোগ নির্ণয় প্রয়োজন।
২. বিষণ্নতা: বিষণ্ন ভাব, অপরাধবোধ, যা স্নায়বিক রোগ এবং ডেলিরিয়ামের সঙ্গে সম্পর্কিত। ডেলিরিয়াম হলো চেতনার একটি পরিবর্তনশীল ব্যাঘাত, যা জ্ঞানীয় কাজের পরিবর্তন বা উপলব্ধিগত ব্যাঘাতের বিকাশের সঙ্গে যুক্ত। 
৩. উদ্বেগ: মানসিক চাপ বা টেনশন: শুধু মানসিক অসুস্থতা ঘটায় না, এটি ডিমেনশিয়ারও কারণ হতে পারে। যাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা (কগনিটিভ ফাংশন) বেশি সক্রিয়, তাদেরও ডিমেনশিয়া হতে পারে। অর্থনৈতিক, পারিবারিক, দাপ্তরিক এবং ব্যক্তিগত কারণে এটি সব সমাজেই খুব সাধারণ।
৪. পারকিনসনিজম: বয়স্কদের একটি সাধারণ স্নায়ুক্ষয়ী রোগ, যা সাধারণত বিভিন্ন মাত্রার অনমনীয়তা এবং ধীরগতির সঙ্গে একতরফা বিশ্রামকালীন কম্পন দ্বারা চিহ্নিত হয়।
৫. স্ট্রোক: মস্তিষ্কের ধমনিতে রক্ত ​​জমাট বেঁধে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে বা কোনো রক্তনালি ফেটে গেলে মস্তিষ্কের কোষের ক্ষতি হয়, যা মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্তপ্রবাহ ব্যাহত করে এবং কোষের ক্ষতিসাধন ঘটায়। এটি সেরিব্রাল এমবোলিজম বা থ্রম্বোসিসের ফলে সৃষ্ট ইস্কেমিয়া এবং রক্তক্ষরণের কারণে মস্তিষ্কের ধমনি ফেটে যাওয়ার ফলেও ঘটে থাকে। এটি সাধারণত উচ্চ রক্তচাপ, ইস্কেমিক হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে এবং হাইপারলিপিডেমিয়ার কারণে সৃষ্ট অন্যান্য অ্যাথেরোস্কলেরোটিক পরিবর্তনের ফলেও হতে পারে। এর ফলে স্মৃতিভ্রংশ, পক্ষাঘাত, অচেতনতা এবং মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
৬. উচ্চ রক্তচাপ: ক্রমাগত উচ্চ রক্তচাপ, হাইপারলিপিডেমিয়া এবং আরও বেশি অ্যাথেরোস্কলেরোটিক পরিবর্তন মস্তিষ্কের কোষের ক্ষতি করে এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে জটিল করে তোলে। এটি যে কোনো বয়সের মানুষের হতে পারে, যা সাধারণত স্থূলতা, ডায়াবেটিস মেলিটাস (ডিএম), থাইরয়েড রোগ, ধূমপান এবং উদ্বেগের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী অর্ধেক মানুষ এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর ২২ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে ভোগেন।
৭. ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজ (আইএইচডি): হৃৎপেশিতে রক্ত ​​সরবরাহ অপর্যাপ্ত হওয়ায় হৃৎপিণ্ডের পেশিতে অক্সিজেন সরবরাহ এবং পুষ্টির চাহিদার মধ্যে ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। এটি প্রধানত উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস মেলিটাস, স্থূলতা, ধূমপান এবং উদ্বেগে ভোগা রোগীদের মধ্যে দেখা যায়, যার ফলে করোনারি ধমনি আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে অবরুদ্ধ হতে পারে।
৮. ডায়াবেটিস মেলিটাস: বাংলাদেশে ডায়াবেটিসের প্রকোপ অনেক বেশি। ডায়াবেটিসের কারণে অসুস্থতা ও মৃত্যু প্রধানত অল্প বয়সে রোগ নির্ণয় না হওয়া, অপর্যাপ্ত চিকিৎসা এবং অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের ফলে ঘটে থাকে। থ্রম্বোএম্বোলিজম এবং অ্যাথেরোস্কলেরোটিক পরিবর্তনের কারণে এই রোগটি শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ (যেমন– মস্তিষ্ক, কিডনি, চোখ এবং হৃৎপিণ্ড) প্রভাবিত করে। এর প্রধান পরিণতিগুলো হলো কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজ, স্ট্রোক, কিডনি বিকলতা, চক্ষুসংক্রান্ত জটিলতা এবং সংক্রমণ।
৯. আর্থ্রাইটিস এবং অস্টিওপোরোসিস: আর্থ্রাইটিস এবং অস্টিওআর্থ্রাইটিস শরীরের অস্থিসন্ধিগুলোর ক্ষতি করে, যার ফলে ব্যথা ও অক্ষমতা দেখা দেয়। এগুলো প্রধানত সংক্রমণ, অটোইমিউনিটি, হরমোনজনিত পরিবর্তনের সঙ্গে বার্ধক্য, অস্টিওফোরোসিস এবং হাড় ও জয়েন্টের ক্ষয়জনিত পরিবর্তনের কারণে হয়ে থাকে। 
১০. মূত্রাশয়ের নিয়ন্ত্রণহীনতা: এটি বয়সের সঙ্গে এবং পেশি দুর্বলতার কারণে ঘটে। এটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ডায়াবেটিক রোগী, বর্ধিত প্রোস্টেট (পুরুষ), বারবার মূত্রনালির সংক্রমণ এবং মানসিক রোগীদের মধ্যে দেখা যায়। এটি উভয় লিঙ্গের ক্ষেত্রেই একই রকম। ৫০ বছরের বেশি বয়সী পুরুষদের মধ্যে বর্ধিত প্রোস্টেট খুব সাধারণ। এটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিরীহ কিন্তু কখনও কখনও ভয়াবহও হতে পারে।
১১. কোষ্ঠকাঠিন্য এবং মলত্যাগের অভ্যাসের পরিবর্তন: এটি পরিপাকতন্ত্রের একটি অবস্থা, যা কোলনের দুর্বল শোষণ এবং গ্যাস্ট্রো-ইনটেস্টাইনাল গতিশীলতার কারণে ঘটে। 
১২. এম্পটি নেস্ট সিনড্রোম: এই সিনড্রোম বলতে বোঝায় একাকিত্ব, বিষণ্নতা বা দুঃখের অনুভূতি এবং বাবা-মা, বন্ধু, আত্মীয়স্বজন ও যত্নকারীদের দ্বারা প্রকাশিত শোক। এটি নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, তবে সন্তান, সংসার খালি হয়ে গেলে বা সঙ্গীদের মধ্যে কেউ অনুপস্থিত থাকলে এটি উভয় লিঙ্গেরই হতে পারে।
১৩. মাথায় আঘাত ও সংক্রমণ: এর ফলে মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং রক্ত​​প্রবাহ কমে যায়। এতে স্মৃতিভ্রংশ এবং অন্যান্য স্নায়বিক রোগ হতে পারে। এমনকি এর ফলে পক্ষাঘাত ও মৃত্যুও হতে পারে।
১৪. খাদ্য ও পুষ্টি: বয়স্কদের জন্য ভালো এবং সুষম খাদ্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্যান্য আনুষঙ্গিক অবস্থার জন্য বিশেষভাবে খাদ্যাভ্যাসের পরামর্শ দেওয়া হতে পারে, সে ক্ষেত্রে সঠিক পুষ্টিসহ একটি সুষম খাদ্যের জন্য একজন পুষ্টিবিদের সঙ্গে পরামর্শ করা প্রয়োজন।
১৫. চোখ, কান, নাক ও দাঁতের যত্ন: বয়স্ক ব্যক্তিরা দৃষ্টির ত্রুটি, ছানি, শ্রবণ সমস্যা এবং দাঁতের রোগ, যেমন–ক্যারিজ বা দাঁত ক্ষয়, দাঁতের গোড়া নষ্ট হওয়া ইত্যাদিতে ভোগেন। 
১৬. ক্যান্সার: এটি সাধারণত বয়স্কদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। পুরুষদের ক্ষেত্রে ফুসফুসের ক্যান্সার, অন্ত্রের ক্যান্সার এবং প্রোস্টেটের ক্যান্সার, আর মহিলাদের ক্ষেত্রে স্তন ক্যান্সার এবং জরায়ুমুখের ক্যান্সার। যেহেতু এর প্রকোপ এবং মৃত্যুহার খুব বেশি, তাই চিকিৎসার জন্য স্ক্রিনিং এবং প্রাথমিক রোগ নির্ণয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
উল্লিখিত সমস্ত রোগের চিকিৎসা ডাক্তার এবং বিশেষজ্ঞদের দ্বারা করা উচিত। এগুলো একটি বহু-বিভাগীয় দল দ্বারা পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। গুরুতর অসুস্থতার ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি, যার জন্য

সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।
বয়স্কদের রোগ প্রতিরোধ: যেহেতু বয়স্ক ব্যক্তিরা উল্লিখিত বেশির ভাগ রোগে ভোগেন, তাই জটিলতা প্রতিরোধ করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের নিয়মিত স্ক্রিনিং, ব্যায়াম, কাউন্সেলিং, পরামর্শ এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন, যার মধ্যে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অকার্যকারিতার কারণে সৃষ্ট অক্ষমতাও অন্তর্ভুক্ত।
মূল্যায়ন ও স্ক্রিনিং: প্রাথমিক রোগ নির্ণয় এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত পরিষেবা কেন্দ্র থেকে নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং চেক-আপ করা উচিত। ৬০ বছর বয়সী ব্যক্তিদের দৈনন্দিন কার্যকলাপে কোনো প্রতিবন্ধকতা আছে কিনা, তা দেখার জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা প্রয়োজন।
গৃহ ও পারিবারিক পরিচর্যা: বিশেষ ক্ষেত্র: সঙ্গী, পরিচর্যাকারী, পরিবারের প্রবীণ সদস্য; নির্ভরযোগ্য ভালোবাসা, স্নেহ এবং সম্মানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

পরিচর্যাকারীর ভূমিকা:
ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, যত্ন/সহযোগিতা।  শৌচাগারের কাজে সহায়তা, স্নান, শৌচাগার পরিষ্কার করা, সাজসজ্জা; খাদ্য ও পুষ্টি–সুষম খাদ্য এবং প্রস্তাবিত খাবার। হাসিখুশি রাখা, মানসিক সহায়তা প্রদান। সময়মতো ওষুধ প্রদান এবং জরুরি অবস্থা বোঝা। পছন্দের বিষয়–ধর্ম, খাবার, বই পড়া এবং টিভি দেখা ইত্যাদি। নিয়মিত শারীরিক ব্যায়ামের জন্য পরামর্শ দেওয়া।

সামাজিক সহায়তা:
প্রবীণদের প্রতি সম্মান ও মর্যাদা। হাসি-ঠাট্টার আসর, বিনোদন কেন্দ্র এবং প্রবীণবান্ধব পরিবেশ। সম্প্রদায় ও সমাজকে যৌথ পরিবার প্রথা বিষয়ে উৎসাহিত করা। পরিচর্যাকারী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। চিকিৎসা কেন্দ্র–স্ক্রিনিং ও প্রাথমিক চিকিৎসা। প্রবীণদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সভা ও সেমিনারের আয়োজন করা। 
বাংলাদেশ সরকারের সহায়তা ও পদক্ষেপ: 
১. প্রবীণদের জন্য সামাজিক কল্যাণ প্রকল্প এবং মানসিক স্বাস্থ্যনীতি ও কার্যক্রমের মাধ্যমে সরকারি সহায়তা–শান্তিনিবাস ও প্রবীণ হিতৈষী সংঘকে শক্তিশালী ও সম্প্রসারণ করা।
২. সকল স্তরের হাসপাতালে প্রবীণদের জন্য পৃথক স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা।
৩. চিকিৎসকদের পাঠ্যক্রম এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে জেরিয়াট্রিক মেডিসিনের ওপর জোর দেওয়া।
৪. প্রবীণদের জন্য, বিশেষ করে আলঝেইমার্স রোগীদের জন্য বাড়িতে এবং নার্সিং হোমে মানসম্মত পরিচর্যাকারী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি।
৫. শারীরিকভাবে সক্ষম তরুণ এবং মধ্যবয়সী প্রবীণদের উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহার করা।
৬. প্রবীণ ও দরিদ্রদের জন্য সকল হাসপাতালে গুরুতর অসুস্থতার ক্ষেত্রে ভর্তুকি প্রদান।
৭. জাতীয় সংস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে প্রবীণ ব্যক্তিদের সম্মান ও মর্যাদা।

বহু বিভাগীয় দল দ্বারা প্রবীণদের রোগের ব্যবস্থাপনা
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, ফিজিওথেরাপিস্ট, মনোবিজ্ঞানী, জেরিয়াট্রিক বিশেষজ্ঞ, পুষ্টিবিদ এবং সমাজকল্যাণ কর্মীদের যৌথভাবে পরামর্শ ও চিকিৎসা প্রদান করা প্রয়োজন। সুষম খাদ্য, শারীরিক ব্যায়াম, নিরাপদ পরিবেশ, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি ও নিরাপত্তা এবং মানসিক যত্নও গুরুত্বপূর্ণ। প্রবীণদের জন্য দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তির দুর্বলতা সংশোধন এবং হাইপোথার্মিয়ার ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
উপসংহারে বলা যায়, পরিবার, সমাজ, প্রবীণ কল্যাণ সমিতি এবং সরকারের আন্তরিক, সৌহার্দ্যপূর্ণ ও সম্মানজনক ভূমিকার মাধ্যমেই প্রবীণবান্ধব সমাজ ও পরিবেশ সৃষ্টি হবে। 

ডা. মো. আবদুর রহমান খান: অবসরপ্রাপ্ত মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর; ইংরেজি থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর সাইফুর রহমান তপন
 

আরও পড়ুন

×