সব অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কেন সমাধান নয়
এএম জিয়া হাবীব আহসান
এএম জিয়া হাবীব আহসান
প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ | ০৭:৪৮ | আপডেট: ১৯ মে ২০২৬ | ০৭:৫৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
দুনিয়াজুড়ে সর্বোচ্চ সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা-না রাখা প্রসঙ্গে উত্তপ্ত বিতর্ক চলছে। কেউ বলছেন, অপরাধ নির্মূলে দৃষ্টান্তমূলক সাজা হিসেবে এটা বহাল রাখা উচিত। কেউ বলছেন, শুধু শাস্তি দিয়ে অপরাধপ্রবণতা নির্মূল করা যায় না, তাই এটা পরিহার করা উচিত। আইনের দৃষ্টিভঙ্গি– প্রয়োজনে ১০ জন অপরাধী মুক্তি পাক, তবু একজন নিরপরাধ মানুষও যেন শাস্তি না পায়।
প্রথম পক্ষের যুক্তি, শাস্তির কঠোরতার কারণে অপরাধপ্রবণতা কমে আসে। জঘন্য মানবতাবিরোধী অপরাধ খুন, পাচার, এসিড সন্ত্রাস, যৌতুকের জন্য হত্যা, শিশু ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধ নির্মূলে ফাঁসি বা মৃত্যুদণ্ড সাজা বহাল রাখতে হবে। খুনের বদলা খুন। তবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে কখনও দৃষ্টান্ত স্থাপন করা যায় না। বরং অপরাধীকে তার কাজের জন্য অনুতপ্ত করানোই সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত মনে করে অনেকে।
আমাদের দেশে মোট ১৭টি আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে এবং সব মিলিয়ে ৬০টি অপরাধ মৃত্যুদণ্ডযোগ্য। গত বছর বাংলাদেশের ১৮৫ জনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রদান করা হয়। ৯২টি দেশে মৃত্যুদণ্ড আইনত নিষিদ্ধ। আর ৪৬টি দেশে মৃত্যুদণ্ডের কার্যত কোনো প্রয়োগ নেই। অর্থাৎ সব মিলিয়ে ১৩৮টি দেশ সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে। পৃথিবীতে সর্বপ্রথম মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ করে পর্তুগাল; ১৯৭৬ সালে। এ তালিকায় সর্বশেষ যোগ হয় উজবেকিস্তান ও আর্জেন্টিনা; ২০০৮ সালে।
বিশ্বব্যাপী প্রায় ৭০টি মানবাধিকার সংস্থা সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে কাজ করে যাচ্ছে। এর মধ্যে প্রথমেই যে সংস্থাটির নাম আসে সেটি হলো অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। এ সংস্থা বিশ্বাস করে, মৃত্যুদণ্ড জীবনের অধিকার লঙ্ঘন করে। অপরাধ হ্রাসে এর কোনো সুস্পষ্ট প্রভাব নেই এবং আধুনিক অপরাধ বিচার পদ্ধতিতে এর কোনো স্থান নেই। এখন বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি দেশ আইন করে বা প্রায়োগিকভাবে মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করেছে।
সংস্থাটির প্রতিবেদনমতে, ‘মৃত্যুদণ্ড বিলোপে আশার আলো হয়ে রয়েছে আফ্রিকা’, যেখানে জিম্বাবুয়ে সাধারণ অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করেছে এবং জাম্বিয়া, যা ২০২৩ সালে সম্পূর্ণরূপে মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে, আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তির দ্বিতীয় ঐচ্ছিক প্রটোকল অনুমোদন করেছে। ‘গ্লোবাল রিপোর্ট: ডেথ সেনটেন্সেস অ্যান্ড এক্সিকিউশনস ২০২৪’ ব্যাখ্যা করে, কিছু দেশে স্বচ্ছতার অভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর ও মৃত্যুদণ্ডের নথিভুক্ত প্রকৃত পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী হিসেবে বিবেচিত চীন, যেখানে বছরে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় বলে অনুমান করা হয়। তারা মৃত্যুদণ্ডের পরিসংখ্যান প্রকাশে বাধা দেয়। উত্তর কোরিয়া এবং ভিয়েতনাম একই কাজ করে থাকে।
অ্যামনেস্টি তার প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করেছে, বেশ কয়েকটি দেশে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে চলেছে, বিশেষ করে যখন এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকে প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড, অপ্রাপ্তবয়স্ক বা মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ড, ইচ্ছাকৃত হত্যা ব্যতীত অন্য অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড, অন্যায্য বিচার প্রক্রিয়া এবং নির্যাতন বা দুর্ব্যবহারের মাধ্যমে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়।
মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি মানেই রাষ্ট্র কর্তৃক নাগরিকের বেঁচে থাকার অধিকার হরণ করা। এ দণ্ড সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের দুটি বিধানকে লঙ্ঘন করে। প্রথমটা হলো, জীবন ধারণের অধিকার। দ্বিতীয়টা হলো, অত্যাচার থেকে মুক্ত হয়ে বেঁচে থাকার অধিকার। ১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ১৫০ জন বন্দিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, যারা পরে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছিলেন। অনেক মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রধান ভূমিকা পালন করে, যা অত্যাচার করার মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়। সমাজের দরিদ্র শ্রেণি, সংখ্যালঘু গোষ্ঠী বেশি মৃত্যুদণ্ডের শিকার হয় বিচারে নিরপেক্ষতার অভাবে। অনেক দেশে মৃত্যুদণ্ডের আইন রাখা মানবিক আদর্শের পরিপন্থি।
অপরাধবিজ্ঞানী সিজার বেকারিয়ার মতে, ‘হত্যা একটা অপরাধ। সমাজ হত্যাকে ঘৃণা করে। কিন্তু হত্যার শাস্তি হিসেবে সেই হত্যাই যখন রাষ্ট্র ঠান্ডা মাথায় কোনো হত্যাকারীর ওপর আরোপ করে, তখন সেই সমাজকে সভ্য সমাজ বলা যায় না। জীবন কেড়ে নেওয়ার অধিকার হত্যাকারীর নেই; হত্যার বিচারকার্য পরিচালনা করা রাষ্ট্রেরও নেই।’ যেখানে হত্যা করলেও হত্যাকারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায় না, সেখানে অন্যান্য অপরাধের জন্য (ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ ইত্যাদি) মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না।
ইংল্যান্ডে রানী প্রথম এলিজাবেথের সময় পকেটমারের শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সময় সেই ভিড়ের মধ্যে পকেটমারেরা তাদের কাজ করত। পকেটমারদের ফাঁসি অন্য পকেটমারদের মনে কোনো ভয়ের সঞ্চার করত না। যদি মৃত্যুদণ্ড জিঘাংসাপ্রবণ মানুষদের মনে ভয়ের সঞ্চার করতে পারত, তবে মৃত্যুদণ্ড থাকা দেশগুলোয় অপরাধের হার কম হতো। কিন্তু দেখা গেছে, যেসব দেশে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে, সেসব দেশেই সবচেয়ে বেশি খুন হয়। আর যেসব দেশে মৃত্যুদণ্ড নেই বা আইন খুব কঠোর নয়, ওসব দেশে খুন তো দূরের কথা, যে কোনো অপরাধ নেই বললেই চলে (ইউরোপের দেশগুলো)। মৃত্যুদণ্ড উঠিয়ে দিলে অপরাধপ্রবণ লোকদের অপরাধ করতে উৎসাহ বাড়বে– এ ধারণা একেবারেই ভুল। এর জ্বলন্ত উদাহরণ কানাডা। কানাডা ১৯৭৬ সালে মৃত্যুদণ্ড তুলে নেয়। ১৯৭৫ সাল থেকে ২০১২ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী কানাডায় খুনের হার ৭০ শতাংশ কমে গেছে।

আর জেলা পর্যায়ে সেশন কোর্টে মৃত্যুদণ্ড হলেই সব শেষ নয়; বরং আইনি লড়াইয়ের শুরু। হাইকোর্টের পর আপিল বিভাগও মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখলে রিভিউ করা যাবে। রিভিউ হলো একই বিষয়ে পুনরায় বিবেচনা করার আবেদন। ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রেই রিভিউ মঞ্জুর হয় না। সর্বশেষ আইনি পদক্ষেপ হিসেবে আপিল বিভাগের আদেশপ্রাপ্তির পর ২১ দিন থেকে ২৮ দিনের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। আইনগত লড়াইয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার পর দণ্ডিত ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা ভিক্ষা চাইতে পারে। তা মঞ্জুর না হলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় জেল কোড অনুযায়ী।
মৃত্যুদণ্ড আমাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩১ ও ৩২ ( স্বাধীনতা ও জীবনের অধিকার)-এর পরিপন্থি। মৃত্যুদণ্ডের ফলে একজন সন্তান তার পিতামাতার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়। খুনই হোক বা অন্য কোনো অপরাধ; অপরাধীকে বুঝাতে হবে– সে যে কাজটা করেছে, তা অন্যায়। এটাও ঠিক, ক্রিমিনাল বিহেভিয়ার সংশোধনের সুযোগ নেই। অভ্যাসগত বা ঠান্ডা মাথার খুনিদের ক্ষেত্রে সংশোধনের সুযোগ কম। এ ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড থাকতে পারে, যাতে সমাজে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করা যায়। তবে কেউ যদি পরিস্থিতির শিকার হয়ে খুন করে, যেমন– জমিজমা নিয়ে বিরোধ, তখন মৃত্যুদণ্ড দেওয়া অমানবিক। মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে অপরাধী কোন সামাজিক অবস্থায়, কোন প্রেক্ষাপটে, কোন অপরাধ করেছে; সংগঠন ও তার ব্যক্তিত্ব বিবেচনায় রেখে এই শাস্তি প্রয়োগ করতে হবে। কখনও কখনও মৃত্যুদণ্ড বিপরীত প্রভাব ফেলে। যারা জানে যে তাদের মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি রয়েছে, তারা তখন তাদের অপরাধের সাক্ষীদের হত্যা করে, যারা তাদের চিহ্নিত ও দোষী সাব্যস্ত করতে সক্ষম হতে পারে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে যারা পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী হারাবে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সার্বিক বিবেচনায় সর্বক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান না রেখে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে যেমন অভ্যাসগত খুনিদের ক্ষেত্রে তা বহাল
রাখা উচিত।
অ্যাডভোকেট এএম জিয়া হাবীব আহসান:
মানবাধিকারকর্মী
- বিষয় :
- আদালত
