ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রাইট টার্ন

সস্তা শ্রমের অর্থনীতি, নাকি সৃজনশীল মানবসম্পদ?

সস্তা শ্রমের অর্থনীতি, নাকি সৃজনশীল মানবসম্পদ?
×

মোহাম্মদ গোলাম নবী

মোহাম্মদ গোলাম নবী

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ | ০৭:২৪ | আপডেট: ২৩ মে ২০২৬ | ০৭:২৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ কি শুধু ‘সস্তা শ্রমের অর্থনীতি’ হয়েই থাকবে, নাকি মানুষের সৃজনশীলতা, সংস্কৃতি, জ্ঞান ও মেধাকে অর্থনীতির নতুন শক্তিতে রূপ দিতে পারবে? জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে প্রশ্নটি এখন নতুনভাবে সামনে এসেছে। কারণ প্রথমবারের মতো সরকার সৃজনশীল অর্থনীতি খাতে বিশেষ বরাদ্দের কথা ভাবছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে এ নিয়ে একটি ধারণাপত্রও তৈরি করেছে। সেখানে চলচ্চিত্র, সংগীত, অ্যানিমেশন, গেমিং, ডিজিটাল কনটেন্ট, ফ্যাশন, সফটওয়্যার, গ্রাফিক ডিজাইন, লোকসংস্কৃতি–সবকিছুকে একই অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে। ‘ক্রিয়েট ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডিংয়ের কথাও বলা হয়েছে।

বিষয়টি শুধু নতুন কোনো খাতের বাজেট বরাদ্দের বিষয় না। এর ভেতরে দেশের অর্থনীতির সম্ভাবনাও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আমরা উন্নয়ন বলতে মূলত ইট-বালু-সিমেন্টের উন্নয়ন বুঝেছি। রাস্তা, সেতু, ফ্লাইওভার, বিদ্যুৎকেন্দ্র–এসব অবশ্যই দরকার আছে। কিন্তু একুশ শতকের বিশ্ব অর্থনীতি ধীরে ধীরে এমন এক জায়গায় যাচ্ছে, যেখানে মানুষের সৃজনশীলতাও অর্থনৈতিক সম্পদ।
১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা ইউএনসিটিএডি সৃজনশীল অর্থনীতিকে এখন গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে দেখছে; যেখানে মানুষের সৃজনশীলতা, সংস্কৃতি, জ্ঞান ও মেধাস্বত্বকে প্রধান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ এখানে মূলধন শুধু কারখানা না, একই সঙ্গে মানুষের চিন্তাশক্তি, গল্প বলার ক্ষমতা, ডিজাইন, সংগীত, ডিজিটাল কনটেন্ট, সফটওয়্যার, ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও অর্থনৈতিক সম্পদ।

বিশ্বে এই ধারণা মূলত ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ নামে পরিচিত। তবে লাতিন আমেরিকায় এটিকে ‘অরেঞ্জ ইকোনমি’ বলা হয়। বিশেষ করে ইন্টার-আমেরিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা ও মেধাভিত্তিক অর্থনীতিকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে শব্দটি ব্যবহার করে। চলচ্চিত্র, সংগীত, ডিজাইন, ফ্যাশন, গেমিং, বিজ্ঞাপন, সফটওয়্যার, লোকসংস্কৃতি, হস্তশিল্প–সবকিছুকে তারা অর্থনীতির অংশ হিসেবে দেখে। শুধু ব্রাজিল, মেক্সিকো, কলম্বিয়া বা আর্জেন্টিনার মতো দেশগুলোতেই এই খাত বহু বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি করেছে। অর্থাৎ বিশ্ব এখন বুঝতে শুরু করেছে যে মানুষের কল্পনা ও সংস্কৃতিও অর্থনীতির শক্তি হতে পারে।

এখানে দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণও গুরুত্বপূর্ণ। কোরিয়া শুধু কারখানা তৈরি করেনি। তারা সংস্কৃতিকেও অর্থনীতিতে রূপ দিয়েছে। আজ কে-পপ, কোরিয়ান ড্রামা, গেমিং, অ্যানিমেশন ও বিউটি ইন্ডাস্ট্রি শুধু বিনোদন না; এগুলো কোরিয়ার সফট পাওয়ার এবং বৈদেশিক আয়ের বড় উৎস। অর্থাৎ তারা ‘সংস্কৃতি’-কে অনুষ্ঠান হিসেবে না দেখে ‘উৎপাদনক্ষম সম্পদ’ হিসেবে দেখছে।
বাংলাদেশের জন্য এখানেই বড় প্রশ্ন। আমরা কি এখনও শুধু গার্মেন্টসে সস্তা শ্রমের অর্থনীতি হয়ে থাকব, নাকি সৃজনশীল মানবসম্পদের অর্থনীতি হওয়ার চেষ্টা করব?

এই জায়গায় ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হয়েও তারা একেবারে ভিন্ন ধরনের রাষ্ট্রগত পথ তৈরি করেছে। সেখানে একই সঙ্গে আছে ইসলামী সমাজ, বহুজাতিক বাস্তবতা, সামরিক প্রভাব, দুর্নীতি, গণতান্ত্রিক রূপান্তর, শিল্পায়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি ও সৃজনশীল অর্থনীতি; যা আমাদের সঙ্গে মেলে।

ইন্দোনেশিয়া শত শত বছর ডাচ উপনিবেশ ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তারা স্বাধীনতা অর্জন করে। দ্বীপভিত্তিক রাষ্ট্র, শত শত ভাষা ও জাতিগোষ্ঠীর দেশ হওয়া সত্ত্বেও তারা ‘জাতীয় সক্ষমতা’ গড়ার দিকে জোর দিয়েছে। তাদের রাষ্ট্রদর্শনের অন্যতম ভিত্তি ছিল ‘পঞ্চশিলা’; যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি জাতীয় ঐক্য, মানবতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ তারা ইসলামকে অস্বীকার করেনি, আবার রাষ্ট্রকে শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের ভেতরেও সীমাবদ্ধ রাখেনি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারা ‘সংস্কৃতি’-কে অর্থনীতির অংশ করেছে। বাটিক, স্থানীয় খাদ্য, হস্তশিল্প, ইসলামিক ফ্যাশন, পর্যটন, লোকজ নান্দনিকতা–এসবকে তারা বাজারে এনেছে। একাধিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করেছে। গ্রামের মানুষের সৃজনশীলতাও ডিজিটাল বাজারে ঢুকতে পেরেছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইন্দোনেশিয়া খুব কৌশলগতভাবে তাদের তরুণ জনগোষ্ঠীকে অর্থনীতির শক্তিতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছে। অর্থনীতিবিদরা যাকে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক লভ্যাংশ বলেন। অর্থাৎ যখন একটি দেশে কর্মক্ষম বয়সী তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ে, তখন সেই জনশক্তিকে দক্ষতা, প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে অর্থনীতি বড় লাফ দিতে পারে। ইন্দোনেশিয়া এখন ২০৪৫ সালের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। ডিজিটাল দক্ষতা, সৃজনশীল অর্থনীতি, স্থানীয় উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিভিত্তিক কর্মসংস্থান–সবকিছুকে তারা সেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ করেছে।

বাংলাদেশেও ২০০০ সাল থেকে আমরা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের মধ্যে আছি, যা ২০৪০ পর্যন্ত চলবে। আমাদের এখানে এখনও অনেক সময় সৃজনশীলতা মানে ‘অনুষ্ঠান’, সংস্কৃতি মানে ‘মন্ত্রণালয়ের আয়োজন’, শিল্পী মানে ‘সম্মাননা’–এই পর্যায়ে চিন্তা আটকে থাকে। কিন্তু ইন্দোনেশিয়া এটিকে ‘উৎপাদনশীল অর্থনীতি’ হিসেবে দেখেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইন্দোনেশিয়াও দুর্নীতিমুক্ত দেশ না। সেখানে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, লাইসেন্স বাণিজ্য, ব্যবসায়ী-রাজনীতিক সম্পর্ক ও স্থানীয় প্রশাসনে দুর্নীতির অভিযোগ বহুদিনের; যা আমাদের সঙ্গে মিল আছে। কিন্তু ইন্দোনেশিয়া শিক্ষা, ডিজিটাল বাজার, স্থানীয় উৎপাদন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও সৃজনশীল অর্থনীতিকে দুর্নীতির মধ্যেও ‘উৎপাদনক্ষম স্তম্ভ’ হিসেবে তৈরি করতে পেরেছে। কীভাবে পেরেছে সেই জ্ঞান আমরা তাদের কাছ থেকে নিতে পারি। 

বাংলাদেশের সম্ভাবনা কম না। বাংলা ভাষা, লোকসংস্কৃতি, সংগীত, নাটক, লোকগল্প, গ্রামীণ নান্দনিকতা, তরুণ ডিজিটাল নির্মাতা–এসবই ভবিষ্যৎ অর্থনীতির সম্পদ হতে পারে। এ জন্য দরকার হবে দীর্ঘমেয়াদি ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো ধারাবাহিকতা। ‘ক্রিয়েট ইন বাংলাদেশ’ দুই বছরের প্রকল্প হলে আমরা এর কোনো সুফল পাব না। এটি অন্তত ২০ বছরের রাষ্ট্রীয় কৌশল হওয়া উচিত হবে। কারণ আধুনিক উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো দিয়ে হয় না। আমাদের ‘রেললাইন রাষ্ট্র’ ধারণা থেকে বের হয়ে দরকার ‘মৌচাক রাষ্ট্র’ গঠন। যেখানে শিক্ষা, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, ডিজিটাল বাজার, উদ্যোক্তা ও স্থানীয় অর্থনীতি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন বড় প্রশ্ন সম্ভবত এটিই–আমরা কি শুধু সস্তা শ্রমের বাজার হয়ে থাকব, নাকি মানুষের সৃজনশীলতা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানকে উৎপাদনশীল শক্তিতে রূপ দেব? কারণ শেষ পর্যন্ত একুশ শতকে সবচেয়ে বড় জাতীয় সম্পদ হবে মানুষের মেধা, দক্ষতা ও সৃজনশীলতা।

মোহাম্মদ গোলাম নবী: কলাম লেখক; প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, রাইট টার্ন

আরও পড়ুন

×