ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আইন আদালত

বিচারিক স্বাধীনতা রক্ষায় বাজেট বাড়াতে হবে

বিচারিক স্বাধীনতা রক্ষায় বাজেট বাড়াতে হবে
×

এম এম খালেকুজ্জামান

এম এম খালেকুজ্জামান

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ | ০৭:৩২ | আপডেট: ২৪ মে ২০২৬ | ০৭:৩২

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘হয় হেঁটে আসব, নয় ঠেলাগাড়ি দিয়ে আসব। উপর মহলে জানিয়ে দেন।’ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীকে গত ৪ মে বিচারকাজ শুরুর আগে এমন মন্তব্য করতে হয়েছিল। সেদিনই ট্রাইব্যুনাল-২ এর এজলাস কক্ষের এসি (শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র) বিচারকাজ চলাকালীন নষ্ট হয়। অনেকক্ষণ এসি ছাড়াই বিচারকাজ চলে। মূলত যাতায়াত ও এজলাস কক্ষের সার্বিক অবকাঠামোগত দৈন্যের কারণেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন বিচারপতি। তবে এটি শুধু আমাদের বিচার বিভাগের অবকাঠামোগত ঘাটতির প্রতীকী চিত্র নয়। প্রকৃত অবস্থারও প্রকাশ।
এসব ঘাটতির প্রকটতা সত্ত্বেও বিচারক তাঁর অন্তর্নিহিত শ্রেয়বোধ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অন্তর্গত তাগিদ থেকে বিচারকাজ কিন্তু মুলতবি করেননি। জেলা পর্যায়ের বিচারিক আদালতগুলোতে প্রশাসনের অন্য বিভাগের কর্মকর্তাদের তুলনায় অনেক কম সুবিধা নিয়েও সততা ও পেশাদারিত্ব নিয়ে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন বিচারকরা। এসব ঘাটতির বিপরীতে বিচার বিভাগের বিচারকদের কমিটমেন্টই আসলে বিচার বিভাগ নামে এই স্তম্ভের প্রেরণা।

ন্যায়নির্ধারক বিচার বিভাগ শুধু রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ নয়। এটি প্রশাসনিক  ময়লা সাফাইয়ের মূল ভূমিকা পালনকারী অঙ্গ। তারপরও বিচার বিভাগ বাজেট-বুভুক্ষু। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান তাঁর মন্ত্রণালয় ও বিচার বিভাগের জন্য বাজেট বিষয়ে প্রয়োজনের কথা তুলেছেন যখন বাজেট আসন্ন। এবং নতুন রাজনৈতিক ও কাঠামোগত রূপান্তরের বিষয় বিবেচনায় নিলে এবারের বাজেটে বিচার বিভাগের জন্য বিশেষ বরাদ্দ স্বাভাবিক। যদিও আইনমন্ত্রী বেশ রক্ষণশীল পরিমাণ বাজেটের প্রত্যাশা জানিয়েছেন। বিচার বিভাগ কীভাবে রাজস্ব আদায়ে ভূমিকা রেখে চলেছে, এ বিষয়েও জানিয়েছেন তিনি। এখানে একটি তূলনামূলক চিত্র তুলে ধরলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

জাতীয় বাজেটে বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ মাত্র দুই হাজার ২০০ কোটি টাকা। বিপরীতে শুধু বিটিভিকে দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং যুব উন্নয়ন বিভাগকে তিন হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দেয় সরকার। এই সীমিত বাজেট দিয়ে বিচারকদের বেতন, সুপ্রিম কোর্টসহ সব আদালতের প্রশাসনিক ব্যয় মেটানো হয়। ফলে জনগণের কাঙ্ক্ষিত বিচারসেবা নিশ্চিত করা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে (সূত্র: বণিক বার্তা, ২ মে ২০২৬)।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ মোট বরাদ্দের ০.২৫ শতাংশ থেকে ০.২৬ শতাংশ। ১ শতাংশের অর্ধেকও বরাদ্দ পায়নি বিচার বিভাগ।
রীতি মেনে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ফিসক্যাল কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের সভায় রাজনৈতিক সরকারের সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি, বাজেটের দর্শন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতিবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক করে সম্পদ কমিটির সভায় খাতওয়ারি বরাদ্দ চূড়ান্ত করার পর জাতীয় সংসদে পরবর্তী অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হবে। কিন্তু আইনমন্ত্রীর প্রত্যাশার প্রতিফলন কি ঘটবে এবারের বাজেটে? 
বিচার বিভাগের জন্য আলাদা বাজেট কোনো বিশেষাধিকার নয়; বিশেষ প্রয়োজন। অথচ বিচার বিভাগ বাজেটের জন্য পুরোপুরি নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভরশীল। বাজেট বরাদ্দ নিরীক্ষা করে দেখা যায়, বেতন-ভাতাসংশ্লিষ্ট খাত বাদ দিলে আদালতের উন্নয়ন বা অবকাঠামোগত খাতে বাজেট ভয়ংকর অপ্রতুল। 

সাংবিধানিক গণতন্ত্রের মৌল নীতি হচ্ছে নির্বাহী, আইনসভা ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার বিভাজন। বিচারিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে নিয়োগ, মেয়াদকাল ও বিচারিক স্বায়ত্তশাসন নিয়ে বিদ্যায়তনিক  আলোচনা থাকলেও আর্থিক স্বাধীনতার বিষয় তুলনামূলক কম গুরুত্ব পায়। অথচ বিচার বিভাগের জন্য পৃথক ও স্বাধীন বাজেট থাকা উচিত কিনা– এ প্রশ্ন তার কার্যকর পরিচালনা নিশ্চিতকরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 
নিশ্চিতভাবে এ যুক্তি গ্রহণযোগ্য– বিচার বিভাগের জন্য পৃথক বাজেট কেবল প্রশাসনিক পছন্দ নয়; বরং বিচারিক স্বাধীনতা রক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে এটি সাংবিধানিক অপরিহার্যতা। একটি যথাযথ রাষ্ট্রের জন্য বিচারিক স্বাধীনতার কোনো বিকল্প নেই। কার্যত বিচারিক স্বাধীনতার অর্থ, আদালত (বিচারকগণ) যেন নির্বাহী বা আইনসভার অযাচিত প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করতে পারে।

অনেক দেশে প্রচলিত নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভরশীল আর্থিক ব্যবস্থা কাঠামোগত দুর্বলতা সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিকভাবে বিভাজিত রাষ্ট্রে যখন বিচার বিভাগের বাজেট নির্বাহী কর্তৃক নির্ধারিত বা নিয়ন্ত্রিত হয়, তখন বিশেষত রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল মামলায় সূক্ষ্ম চাপ বা প্রতিশোধমূলক আচরণের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। এমন প্রভাব বাস্তবে প্রয়োগ না হলেও এর সম্ভাবনার ধারণাই বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা সম্পর্কে জনআস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে। অথচ জনআস্থাই বিচার বিভাগের অর্জন। বিচার বিভাগের জন্য পৃথক বাজেট ব্যবস্থা জনঅনাস্থার ঝুঁকি কমিয়ে আনতে এবং বিচার বিভাগকে আর্থিক প্রভাবমুক্ত রাখতে পারে।

বিচার বিভাগের জন্য পৃথক বাজেটের প্রধান যুক্তি হলো বিচারিক স্বাধীনতা রক্ষা। বিচার বিভাগ যদি নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ ও ব্যয় নির্ধারণ করতে না পারে, তবে বিচারিক কার্যকারিতা বাধাগ্রস্ত হয়। বাজেটের সীমাবদ্ধতা প্রায়ই মামলাজট, বিচারক সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও দীর্ঘসূত্রতার জন্ম দেয়। ফলে বিচারপ্রার্থীরা সময়মতো ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। বিচার বিভাগের জন্য পৃথক বাজেট এই কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে সহায়ক হতে পারে। এ ছাড়া পৃথক বাজেট বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদার সঙ্গে সম্পর্কিত। 
জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনজ্ঞ অধ্যাপক শিমন শেট্রিট বিচারিক স্বাধীনতার বিষয়ে একজন শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ। তিনি ‘অর্থনৈতিক স্বাধীনতায় বিচারিক স্বাধীনতা’ ধারণার প্রবক্তা। তাঁর গবেষণায় জোর দেওয়া হয়েছে– কার্যকর বিচারিক স্বাধীনতার জন্য বিচারকদের নির্বাহী নিয়ন্ত্রণ থেকে রক্ষা করা প্রয়োজন, যার মধ্যে আর্থিক নিরাপত্তা এবং বিচার বিভাগের বাজেট সুরক্ষিত করা অন্তর্ভুক্ত।
সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান লিখেছিলেন, ‘বাহাত্তরের সংবিধানের খণ্ডিত ব্যাখ্যার কারণে একটি সত্য পাথরচাপা আছে। সেটা হলো হাইকোর্টই বাজেট তৈরি করবে, হাইকোর্টই তা খরচ করবে। ১০৯ অনুচ্ছেদের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের ব্যাখ্যা আমাদের কাছে তাই। তাই হাইকোর্টকে এড়িয়ে আইন মন্ত্রণালয় যেভাবে অধস্তন আদালতের বাজেট তৈরি ও বাস্তবায়ন করে চলছে, সেটা অসাংবিধানিক।’ (বাজেটের স্বাধীনতায় বিচারের স্বাধীনতা, প্রথম আলো)

যেখানে বিচার বিভাগ আর্থিকভাবে নির্বাহীর ওপর নির্ভরশীল, সেখানে বিচারিক স্বাধীনতাও শর্তাধীন থেকে যায়। ন্যায়বিচারকে যদি সত্যিকার অর্থে নাগরিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তবে বিচার বিভাগকে প্রয়োজনীয় আর্থিক স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। কারণ স্বাধীন বিচার বিভাগ ছাড়া গণতন্ত্র একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামো মাত্র; আর্থিক স্বাধীনতা ছাড়া বিচারিক স্বাধীনতাও পূর্ণতা পায় না।
অপ্রতুলতা বিষয়ে নিবন্ধের সূচনায় বিচারপতির যে অনুযোগ, তা আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দে দূরীভূত হোক বঞ্চনা। এর মাধ্যমেই নিশ্চিত হতে পারে প্রকৃত জনক্ষমতায়ন। 

এম এম খালেকুজ্জামান: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট 
[email protected]

আরও পড়ুন

×