ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

নগর পরিবেশ

ব্যাবিলন থেকে ঢাকা অথবা ছাদের ফরাসি সৌরভ

ব্যাবিলন থেকে ঢাকা অথবা ছাদের ফরাসি সৌরভ
×
×

আশফাক সফল

আশফাক সফল

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান সত্যিই ছিল কিনা– ইতিহাস তার নিশ্চিত উত্তর দিতে পারেনি। কিন্তু সেই উদ্যান মানুষের কল্পনায় যে জায়গা করে নিয়েছে, তার একটি কারণ খুব সাধারণ। পাথরের নগরের মধ্যেও মানুষ সবুজকে হারিয়ে ফেলতে চায়নি। মাটি যেখানে ছিল না, সেখানে সে বাগানকে তুলে নিয়েছিল ওপরে।     

হাজার হাজার বছর পর ঢাকার দিকে তাকালে গল্পটি অদ্ভুতভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। আমাদের মাঠ কমেছে, গাছ কমেছে, জলাশয় কমেছে। বেড়েছে ভবন। ভবনের সঙ্গে বেড়েছে ছাদ। নিচে মানুষের বসতি, ওপরে কংক্রিটের বিস্তার– মাঝখানে কোথাও যেন হারিয়ে গেছে শহরের সবুজ।

তবু ছাদগুলো রয়ে গেছে। ছাদগুলো কি তাহলে শুধু ভবনের শেষ সীমানা? নাকি, সংকুচিত হতে থাকা এই শহরে ছাদই আমাদের সবুজের শেষ অবশিষ্ট সম্ভাবনাগুলোর একটি?
প্রশ্নটা শুধু ছাদবাগান করা যায় কিনা, তা নয়। প্রশ্ন হলো, যে শহর তার মাটির সবুজ হারিয়েছে, সে কি তার ছাদে সবুজের জন্য নতুন মাটি তৈরি করতে পারে?

ঢাকার জন্য প্রশ্নটি এখন আর কেবল সৌন্দর্যের নয়। শহরের বায়ুদূষণ, কংক্রিটের বিস্তার এবং নগর তাপমাত্রা নিয়ে আলোচনা যত বাড়ছে, শহরের সবুজ নিয়েও তত বেশি ভাবতে হচ্ছে। নগর তাপদ্বীপ (হিট আইল্যান্ড) নিয়ে ঢাকাকে ঘিরেও গবেষণা হয়েছে। সেখানে ছাদবাগান, আনুভূমিক সবুজ দেয়াল এবং অন্যান্য গ্রিন স্পেস নগরের উষ্ণতা কমাতে কী ভূমিকা রাখতে পারে, তা পরীক্ষা হচ্ছে। 
ছাদবাগানকে শুধু ফুলের টব হিসেবে না দেখে যাপিত নগর জীবনের ফুসফুস হিসেবে দেখার সময় হয়েছে। 

ছাদে গাছ লাগালেই শহর ঠান্ডা হবে না। বায়ুদূষণের সমস্যাও কয়েকটি গাছে মিটবে না। নগরের পরিবেশ একটি সমষ্টিগত বাস্তবতা, যেখানে ছোট ছোট সবুজ পরিসরও বৃহত্তর ব্যবস্থার অংশ হতে পারে। ছাদ হতে পারে সেই অতিরিক্ত সবুজ পরিসরের একটি জায়গা। এর সঙ্গে আছে খাদ্যের প্রশ্নও।

জমি কমছে, নগর বাড়ছে। অথচ শহরের মধ্যেই কিছু শাকসবজি, ফল বা মসলা উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করা যায়। বাংলাদেশের জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নীতিতেও ছাদবাগান ও ক্ষুদ্র বাগানকে উৎসাহিত করা হয়েছে। প্রণোদনা দেওয়ার কথাও সেখানে আছে। তাহলে বাংলাদেশে ছাদবাগানের সমস্যা কোথায়? সমস্যা আর যারই হোক, অন্তত গাছের না। সমস্যা হয়তো আমাদের নীতি ও ব্যবস্থাপনার জায়গায়।

ছাদবাগান করতে মানুষকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণের মাধ্যমে পরামর্শ ও সহায়তার ব্যবস্থাও আছে। নীতিপত্রে ছাদবাগানের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগকে এক জায়গায় এনে ভবন, পরিবেশ, কৃষি, কর ও নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করার মতো একটি সুস্পষ্ট কাঠামো কোথায়?

এর সঙ্গে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত কিছু প্রশ্নও চলে আসে। ছাদবাগান কি ভবনের নকশার অংশ? ভবনটি কতটুকু অতিরিক্ত ভার নিতে পারবে, সেটি কি ভবন অনুমোদনের সময় বিবেচনায় নেওয়া হবে? ছাদে সেচের পানি যাবে কোথায়? বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাই বা কী? পানিরোধী ব্যবস্থা নষ্ট হলে দায় কার?
ছাদবাগান শেষ পর্যন্ত শুধু গাছ লাগানোর বিষয় নয়। একটি ভবনের ওপর মাটি, পানি ও উদ্ভিদের নতুন ব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে। সেখানে সৌন্দর্যের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে কাঠামোগত নিরাপত্তা, পানি নিষ্কাশন, রক্ষণাবেক্ষণ ও ভবনের স্থায়িত্বের প্রশ্ন।

অর্থাৎ ছাদবাগানের নীতি যদি সত্যিই করতে হয়, তাহলে শুধু কৃষির কথা বললে হবে না। ভবন নির্মাণ, প্রকৌশল, পরিবেশ এবং নগর ব্যবস্থাপনাকেও একই আলোচনায় আনতে হবে।
একই কারণে ছাদবাগানের প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত শুধু গাছ লাগানোর থাকে না। এটি ভবনের মালিকানা, নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও হয়ে ওঠে। একটি ভবনের ছাদে কে বাগান করবে; অন্য বাসিন্দাদের সম্মতি কীভাবে নেওয়া হবে; অতিরিক্ত ভার বা পানি নিষ্কাশনের সমস্যা হলে দায় কার– এসবের উত্তর ব্যক্তিগত উদ্যোগে পাওয়া সম্ভব নয়। সেখানেই ছাদবাগানকে নিছক ব্যক্তিগত শৌখিনতা থেকে বের করে নগর ব্যবস্থাপনার আলোচনায় আনার প্রয়োজন তৈরি হয়। বিশ্বের কিছু দেশ সেই পথেই এগিয়েছে। ফ্রান্সে নির্দিষ্ট ধরনের নতুন ভবন ও বড় সংস্কারকাজে ছাদের একটি অংশে সবুজায়ন অথবা নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা রাখার বিধান করা হয়েছে। তবে এটি সরাসরি ছাদবাগানের বাধ্যবাধকতা নয়; সবুজ ছাদের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থাও এর বিকল্প। সেখানে ছাদকে শুধু ভবনের ওপরের শেষ অংশ হিসেবে না দেখে পরিবেশ ও জ্বালানি ব্যবস্থার একটি অংশ হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।

ফ্রান্সের এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের বাস্তবতাকেও নতুন করে দেখতে সাহায্য করে। আমাদের এখানে ছাদবাগানের প্রয়োজনীয়তা নীতিপত্রে উৎসাহিত করা হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণের মাধ্যমে পরামর্শ ও সহায়তার ব্যবস্থাও রয়েছে। কিন্তু ভবন নির্মাণ, কাঠামোগত নিরাপত্তা, পানি নিষ্কাশন, পরিবেশ, কৃষি, কর প্রণোদনা, রক্ষণাবেক্ষণ– এসব বিষয়কে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে এনে ছাদবাগানকে নগর ব্যবস্থাপনার অংশ করার বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়। ফলে ‘ছাদবাগান করুন’– কথাটি যত সহজ, বাস্তবে বিষয়টি তত সহজ নয়। কোন ভবনে করা যাবে; কতটুকু করা যাবে; ভবনের কাঠামোগত ভার ধারণক্ষমতা কত; যৌথ মালিকানার ছাদের সিদ্ধান্ত নেবে কে– এসব প্রশ্নও তখন নীতির অংশ হয়ে ওঠে। শুধু গাছ লাগানোর পরামর্শ দিয়ে এই প্রশ্নগুলোর সমাধান হয় না।

তাহলে কি এর কোনো বাস্তব পথ নেই? হয়তো আছে, তবে তা এক লাফে কঠোর বাধ্যবাধকতার দিকে যাওয়ার পথ না-ও হতে পারে। নতুন ভবনের নকশায় নিরাপদ ছাদবাগানের সুযোগ রাখা; উপযুক্ত ভবনের জন্য কর প্রণোদনা দেওয়া; পুরোনো ভবনের ক্ষেত্রে কাঠামোগত নিরাপত্তা যাচাই করে ছাদবাগানে উৎসাহ দেওয়া– এ ধরনের উদ্যোগ ধাপে ধাপে নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে পানি নিষ্কাশন, জলরোধী ব্যবস্থা ও রক্ষণাবেক্ষণের ন্যূনতম মান নির্ধারণ করা যেতে পারে। ভবনের ধরন ও সক্ষমতা অনুযায়ী ধীরে ধীরে সবুজ ছাদের লক্ষ্য নির্ধারণের কথাও ভাবা যেতে পারে। তখন সাফল্যের মাপকাঠি শুধু কতটি ছাদে গাছ লাগানো হয়েছে, তা নয়; কতটি ছাদ নিরাপদ, টেকসই এবং কার্যকরভাবে সবুজ হয়ে উঠেছে, সেটিও বিবেচনায় আসবে। অর্থাৎ, ছাদবাগানকে একটি বিচ্ছিন্ন সৌন্দর্যচর্চা হিসেবে নয়, ভবন ও নগর পরিকল্পনার একটি ছোট কিন্তু বাস্তব অবকাঠামো হিসেবে দেখা শুরু করা যাবে।

ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান সত্যিই ছিল কিনা– সে বিতর্ক হয়তো চলতে থাকবে। কিন্তু নগর আর প্রকৃতির সম্পর্কের প্রশ্নটি যে নতুন নয়– সেটি নিশ্চিত। আজকের ঢাকা সেই পুরোনো প্রশ্নের সামনে আরও কঠিন বাস্তবতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাঠ, গাছ, জলাশয় কমেছে, কিন্তু ছাদগুলো এখনও আছে। তাই প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত শুধু গাছ লাগানোর নয়। ছাদকে আমরা কি ভবনের শেষ সীমানা হিসেবেই দেখব, নাকি নগরের সবুজ ভবিষ্যতের একটি অংশ হিসেবে ভাবব?

ব্যাবিলন আমাদের কল্পনায় একটি উদ্যান রেখে গেছে। ঢাকা আমাদের সামনে রেখে গেছে তার প্রয়োজন; আর ফ্রান্স দেখিয়েছে– কোনো প্রয়োজনকে চাইলে নীতির ভাষাতেও রূপ দেওয়া যায়। এখন প্রশ্ন হলো, ঢাকার ছাদগুলোর জন্য সেই ভাষা আমরা কবে তৈরি করব?

আশফাক সফল: ব্লগার ও তথ্যপ্রযুক্তিবিদ; বাংলাদেশ সিস্টেম অ্যাডমিনিস্ট্রেটরস ফোরামের
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক

আরও পড়ুন

×