পার্বত্যাঞ্চল
অধিকার আন্দোলন কার্বারিনির্ভর হওয়ার বিপদ
ফাইল ছবি
উশ্যে প্রু মারমা
প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৪ | ২৩:২৭
গত ১৪ জুন অনুষ্ঠিত সিএইচটি হেডম্যান নেটওয়ার্কের সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা। প্রধান বক্তা ছিলেন চাকমা রাজা দেবাশীষ রায়। উদ্বোধন করেন মং রাজা সাচিংপ্রু চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন কংজরি চৌধুরী।
সম্মেলনের প্রধান ইস্যু ছিল ১৯০০ সালের রেজুলেশন বহাল রাখার দাবি। সেখানে সন্তু লারমা বলেছেন, হেডম্যান কার্বারিরা যেন এ আন্দোলনে এগিয়ে আসেন। রাজা দেবাশীষ রায় বলেন, ১৯০০ সালের আইনে আঘাত এলে সেটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। একই সঙ্গে তিনি পাহাড়িদের বিয়ে নথিভুক্ত করার তাগিদ দিয়ে বলেছেন, এই ক্ষমতা সমাজের কাছে রয়েছে। গতবার সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, হেডম্যানরা বিয়ে সনদ দেবেন। এবার বললেন, বিয়ে সনদ দেওয়ার ক্ষমতা সমাজের। পাহাড়ের লোকজন তাহলে কোনটা অনুসরণ করবে? গতবারের বক্তব্যের পর সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা হয়েছিল; এবার বাড়বে বিভ্রান্তি।
আমি মাঠ পর্যায়ে গিয়ে, পাড়ায় পাড়ায় মানুষের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, অনেক গ্রামের নাম কার্বারিদের নামে নামকরণ হয়েছে। হয়তো কোনো কার্বারি গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় বলে ওই পাড়ার নামটি কার্বারির নামে নামকরণ হলো। অথবা প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে হয়েছে। কিন্তু গ্রামটি কার্বারির নামে হলেও গ্রামগুলোর উন্নয়ন হয়েছে, বলা যাবে না। বরং অনেক কার্বারি পরিবার চায় না; আর কেউ বড় হয়ে তাদের প্রভাব খর্ব করুক। ফলে পাড়ার আর্থসামাজিক পরিবর্তন হয় না।
যতটুকু উন্নয়ন, সেটা প্রজাদের নিজস্ব চেষ্টা ফলে।
কোনো কোনো পাড়ায় দেখা যাচ্ছে, বিচার-সালিশ পদ্ধতির কারণে জনগণের সঙ্গে কার্বারিদের দ্বন্দ্ব লেগেই থাকছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয়ভাবে সমতলের লোকজনকে ভূমি বন্দোবস্ত দেওয়ার পর কোনো কোনো হেডম্যান জমি-সংক্রান্ত লেনদেনের সঙ্গেও জড়িত হয়ে পড়ছেন। এখন এমন কার্বারি কতজন পাওয়া যাবে, যিনি জনসাধারণকে মাথার ওপর রেখে পাড়া পরিচালনা করেছেন? বরং বিচার-সালিশের নামে হুমকি-ধমকি ও হুকুম জারি করতেই উৎসাহী বেশির ভাগ; সামন্তীয় চর্চাতেই তারা বেশি আগ্রহী। ফলে পাহাড়ে পাড়াভিত্তিক যে গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ছিল, সেটা ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে।
পাড়াভিত্তিক ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক করে তোলার ক্ষেত্রে সরকার, প্রশাসন বা রাজনৈতিক দলগুলোও আগ্রহী নয়। বরং হেডম্যান বা কার্বারিদের তোষণেই বেশি আগ্রহী। মানুষের মধ্যেও পরিবর্তনের চেতনা নেই। আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বদলে পাহাড়ি সমাজ সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এমনকি জেলা পরিষদ, আঞ্চলিক পরিষদের মতো প্রতিষ্ঠান অনির্বাচিত ব্যক্তি দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। সরকার, জাতীয়ভিত্তিক রাজনৈতিক দল, আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল– পাহাড়ে নির্বাচন নিয়ে কেউ কথা বলছে না।
আমি মনে করি, এই কার্বারি হেডম্যান পদ্ধতিকে আজীবন জমিদারিত্ব হিসেবে থাকার বদলে পরিবর্তনযোগ্য ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে উঠুক। সমাজে কোনো গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকলে রাজনীতিতে কি গণতন্ত্রচর্চা করা সম্ভব?
আমরা দেখছি, হেডম্যান বা কার্বারিরা সরকারের যে কোনো সুবিধা নিতে আগ্রহী; কিন্তু নিজেদের সমাজে রাজনৈতিক সংঘাত বন্ধে কোনো ভূমিকা নিতে চান না। সমাজের ঐক্যও দিন দিন ভেঙে পড়ছে। অশান্তিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করে জনসাধারণ যেন প্রতিবাদের ভাষাও ভুলে গেছে। সবাই যেন অর্থ ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এ রকম সংঘাতময় পরিস্থিতিতে কার্বারি বা হেডম্যানের নেতৃত্বে অধিকার আন্দোলন গড়ে তোলা কি সম্ভব?
বাস্তবতা হলো, পাহাড়ে দুর্নীতি, অপশাসন, বিভেদের রাজনীতির বিরুদ্ধে কথা না বলে কার্বারিরা তাদের বেতন-ভাতা নিয়ে চিন্তিত। অবশ্য মাত্র ৫০০ টাকা ভাতা নিয়ে গ্রামের দায়িত্ব কীভাবে পালন করা যায়? তার মানে, ক্ষমতার অন্য কোনো মধু রয়েছে?
সন্তু লারমা বলেছেন, অধিকার আন্দোলনে হেডম্যান বা কার্বারিরা এগিয়ে আসুন। অথচ তিনি জানেন, পাহাড়ের জনসাধারণ ব্রিটিশবিরোধী ছিল বলে তখনকার রাজাও এই কর আদায় করতে দেননি। ১৭৫৭ থেকে ১৮৬০ সাল পর্যন্ত এখানে ১০০ বছর ব্রিটিশ শাসক এ অঞ্চলে প্রবেশ করতে পারেনি। পার্বত্য জনগণের ব্রিটিশ-বিরোধিতা তীব্র হওয়ার কারণে ১৯০০ সালে রেজুলেশন আইন হয়েছে। ওই আইনে পার্বত্যাঞ্চলকে বিশেষ ও ট্রাইবেল এরিয়া হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তাই এটা বলা যায়, তখনকার পার্বত্য জনগণের প্রতিরোধের কারণে ১৯০০ সালে আইন হলো এবং এর ভিত্তিতেই ’৯৭ সালে চুক্তি হয়েছে। ফলে জনতাই মূল শক্তি।
সরকার যদি ১৯০০ সাল আইন বাতিল করে; কার্বারি সমাজ কি আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে? তারা কি হরতাল-অবরোধ দিতে পারবে? তখন প্রশাসনের চাপ সহ্য করার মতো ধৈর্য আছে? এমনকি এটাও বড় প্রশ্ন, হেডম্যান কার্বারিদের ডাকে কি পাহাড়িরা রাজপথে নেমে আসবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে। জনবিচ্ছিন্ন এবং অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দিয়ে আর যাই হোক, অধিকার আন্দোলন গড়ে তোলা যায় না।
উশ্যে প্রু মারামা: অধিকারকর্মী
- বিষয় :
- পার্বত্যাঞ্চল
