সুশাসন
সব হত্যাকাণ্ডের বিচার হতে হবে
আনু মুহাম্মদ
আনু মুহাম্মদ
প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৬ | ১০:৪৭
সেদিন ছিল ২০১৩ সালের ৬ মার্চ। আওয়ামী লীগ শাসনামলে নারায়ণগঞ্জের সুধীজন পাঠাগারে যাওয়ার পথ থেকে কিশোর ত্বকীকে তুলে অঞ্চলের খুনি মাফিয়া হিসেবে পরিচিত ওসমান পরিবারের এক ছেলের নেতৃত্বে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তাদের টর্চার সেলে নিয়ে যায়। বহুজন মিলে এই কিশোরের ওপর যে তাণ্ডব চালায় তার বর্ণনা একজন সুস্থ মানুষের পক্ষে সহ্য করা কঠিন। ভয়ংকর নির্যাতনে এক সময়ে ছেলেটি নিহত হলে খুনিরা তাকে ভাসিয়ে দেয় শীতলক্ষ্যা নদীতে। ওর লাশ উদ্ধার হয় ৮ মার্চ।
এই কিশোরের অপরাধ কী ছিল? ও গল্প লিখত, কবিতা লিখত, ছবি আঁকত আর প্রচুর পড়তে ভালোবাসত। ঘরে বাবা-মার অনেক বইপত্র ছিল। সেগুলো পড়ার পর আরও পড়ার জন্য নিয়মিত পাঠাগারে যেত। পরীক্ষার ফলও সবার চাইতে ভালো করত।
ত্বকীর আগে-পরে শীতলক্ষ্যা নদীতে এই খুনিদের হাতে নিহত আরও বেশ কয়েকজনের লাশ পড়েছে। এই দুর্বৃত্তরা অবিরাম নৃশংস অপরাধ করেছে; জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের বরাবর রক্ষা করেছে। ত্বকীর বাবা শিল্পী সংগঠক রফিউর রাব্বি এগুলোর বিরুদ্ধে বরাবর সরব থেকেছেন, জনগণকে সংগঠিত করেছেন। সরকারি ক্ষমতার জোরে যে দুর্বৃত্তরা যা খুশি তা-ই করত, তাদের কাছে এই প্রতিবাদ ছিল অসহ্য। তাই তারা উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য রাব্বির সন্তানকে নির্মমভাবে হত্যা করে। না। এর পরও থামেননি রাব্বি এবং তাঁর সহযোদ্ধা নারায়ণগঞ্জের লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী, বাম রাজনৈতিক কর্মীরা। শত ভয়ভীতি, আক্রমণ উপেক্ষা করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা মাফিয়াদের তৎপরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ অব্যাহত রেখেছেন। তাদের অসাধারণ ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধে গড়ে উঠেছে ‘সন্ত্রাসবিরোধী ত্বকী মঞ্চ’। এই মঞ্চ ত্বকী হত্যাসহ আগে-পরের সব সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব আর লুটপাটের বিরুদ্ধে এত বছর ধরে সরব থেকেছে এবং সারাদেশের মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে।
জনগণের শক্তিশালী আন্দোলন ও জনমতের কারণে ত্বকী হত্যার এক বছরের মাথায় মামলার তদন্তকারী সংস্থা কেন, কখন, কোথায়, কারা এবং কীভাবে ত্বকীকে হত্যা করেছে, তা বিস্তারিত সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ করেছিল। কিন্তু খুনি শনাক্ত হওয়ার পরপরই সবকিছু আটকে যায়। সংসদে দাঁড়িয়ে যেদিন তৎকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্ট করে বললেন, এই খুনি দখলদার চাঁদাবাজ লুণ্ঠনকারী ‘ওসমান পরিবারের পাশে তিনি সবসময়ই আছেন’; তার পর থেকে আর এই বিচারকাজ এক বিন্দুও অগ্রসর হয়নি। এ রকম অপরাধের পাহাড় জমতে জমতে শেখ হাসিনার সঙ্গে সঙ্গে এই দুর্বৃত্তরাও গণঅভ্যুত্থানে ভেসে গেছে। কিন্তু তারা নিরাপদে বিদেশে আছে। তাদের বিচার এখনও হয়নি। 
শুধু ত্বকী হত্যা নয়; এর আগে-পরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আরও অসংখ্য খুন এবং গুম হয়েছে, যার কোনো বিচার হয়নি। এই জুলুমবাজ সরকারের পতন হওয়ার পর সবার মধ্যেই এই প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল–অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসন, থানা, আদালত এসব বিচার কাজে যথাযথ ভূমিকা পালন করবে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় প্রতিশ্রুতিও ছিল– ত্বকী, তনু, সাগর-রুনির মতো আলোচিত হত্যা মামলাগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শেষ করা হবে। কিন্তু না। তাদের দেড় বছরে কোনোই অগ্রগতি হয়নি। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার ১৪ বছর পার হয়েছে; বারবার আদালত তারিখ পিছিয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও এই ধারা অব্যাহত ছিল। কুমিল্লায় সোহাগী জাহান তনু ধর্ষণ ও হত্যার পরও ১০ বছর পার হয়েছে। এগুলোর সাধারণ তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। মুনিয়া ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড, যার জন্য অভিযুক্ত বিপুল প্রতাপশালী, স্বৈরশাসনের অন্যতম সুবিধাভোগী বসুন্ধরা গ্রুপের মালিক আনভীর। এ বিষয়ে মামলার কোনো অগ্রগতি নেই। উল্টো কোনো শুনানি ছাড়া অভিযুক্তকে নিরপরাধ প্রতিষ্ঠার সংগঠিত চেষ্টা দেখা গেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সহিংসতা বিশেষত তরুণ সংগঠকদের খুনের বহু ঘটনা আছে। এগুলো নিয়ে তদন্ত আর বিচারের কথা আগেও তেমন শোনা যায়নি, এখনও যায় না।
বাংলাদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করেছিল পাকিস্তান থেকে গুণগতভাবে ভিন্ন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য। কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশ পাকিস্তান মডেলেই চলেছে। পাকিস্তান আমলে যেমন ২২ পরিবার নামক ক্ষুদ্র-বৃহৎ ব্যবসায়িক গোষ্ঠী আর তার সঙ্গে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র দেশ নিয়ন্ত্রণ করত; বাংলাদেশেও সেই ব্যবস্থা চলেছে। হাসিনা সরকারের আমলে স্বৈরশাসনের ক্ষমতা দিয়ে গণতান্ত্রিক সব ব্যবস্থাকে অচল করা হয়েছে, সব প্রতিষ্ঠান দুমড়েমুচড়ে ফেলা হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি। দেশে এ রকম ব্যবস্থা দরকার হয় ক্ষমতা আর সম্পদের কেন্দ্রীভবনের জন্য। তাই স্বৈরশাসন টিকিয়ে রাখার জন্য বিশ্বজোট হয়েছিল। উন্নয়নের নামে সুন্দরবন থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রামপাল-পায়রা-মাতারবাড়ীসহ প্রাণবিনাশী নানা প্রকল্প হয়েছে; আদানিসহ এমন সব চুক্তি হয়েছে যা দেশকে দীর্ঘদিনের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বিভিন্ন ‘উন্নয়ন’ প্রকল্পের জন্য বা দখল-দূষণে দেশের বহু নদী মরণদশায় পৌঁছেছে। বায়ুদূষণে মানুষ দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থ জাতিতে পরিণত হচ্ছে, খেলার মাঠ, পার্কগুলোও চলে গেছে মুনাফাখোরদের হাতে, সড়ক অব্যবস্থায় কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে মানুষ প্রতিদিন। দরকার পরিবর্তনের পথ তৈরি করা। অন্তর্বর্তী সরকার সে পথে হাঁটেনি, বরং আরও ক্ষতিকর চুক্তির পথ ধরেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ত্বকী, সাগর-রুনি, তনু, মুনিয়া হত্যাকাণ্ডের বিচার একদিকে যেমন ঝুলে গেছে, অন্যদিকে দাগি আসামি, দণ্ডপ্রাপ্ত খুনি রহস্যজনকভাবে ছাড়া পেয়েছে। গত বছর গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি তাই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এক বিবৃতিতে বলেছিল, ‘...সারাদেশে খুন, ধর্ষণ, মব সহিংসতা, হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক তৎপরতা বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে, নারীর চলাফেরা, খেলা ইত্যাদির ওপর আক্রমণ আসছে। এমনকি প্রকাশ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন লেখক-শিক্ষককে হত্যার হুমকি দিয়ে তা ব্যাপক প্রচার করার পরও হুমকিদাতার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।...কক্সবাজারে সমিতিপাড়ায় নিরস্ত্র জনগণের ওপর বিমানবাহিনীর সদস্যের গুলিবর্ষণের ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। নিহত হয়েছেন স্থানীয় যুবক শিহাব কবির নাহিদ।... পোস্টমর্টেম নিয়ে ইতোমধ্যে রহস্যজনক আচরণ করা হচ্ছে।... জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর যেখানে জনগণের রাজনৈতিক, গণতান্ত্রিক, নাগরিক অধিকার সুরক্ষিত হওয়ার কথা, সেখানে প্রতিনিয়ত জানমালের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ছে।... যৌথ বাহিনীর একের পর এক অভিযান জনগণের নিরাপত্তার বদলে হয়রানি ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বৃদ্ধি করেছে।’ বিভিন্ন স্থানে জোরজবরদস্তি মব হামলা-মামলা দেশে আতঙ্ক ও হতাশা তৈরি করছিল। অসংখ্য মানুষের কথা ছিল এটাই যে, এই দেশকে ‘মবের মুল্লুক’ বানানোর জন্য মানুষ বারবার জীবন দেয়নি।
১৩ বছর ত্বকী হত্যার বিচার হয়নি, আরও বহু অবিচার যোগ হয়েছে। এখন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায়। তারা আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েই দায়িত্ব নিয়েছে। আমরা তাই এখন আশা করতে চাই, বছর বছর বিচার ঝুলিয়ে রেখে খুনি-দুর্বৃত্তদের সবুজ নিশান দেখানো বন্ধ হবে এবং দ্রুত ত্বকী, তনু, সাগর-রুনি-মুনিয়া হত্যাকাণ্ডের বিচারের মাধ্যমে নতুন সরকার তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ; সাবেক অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- সুশাসন
