ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অনলাইন পেমেন্ট

দেশে পেপ্যালের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

দেশে পেপ্যালের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
×

মো. তৌফিকুল ইসলাম

প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬ | ১০:২১

বিশ্বের ডিজিটাল অর্থনীতি বর্তমানে দ্রুতগতিতে প্রসারিত হচ্ছে এবং এটি এখন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান যেমন ম্যাকিন্সি ও স্ট্যাটিস্টার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যে বৈশ্বিক ডিজিটাল পেমেন্ট লেনদেন ২৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই বিশাল বাজারের মধ্যে ক্রস-বর্ডার পেমেন্ট, অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং আয়, ই-কমার্স লেনদেন এবং ডিজিটাল সেবা অর্থনীতি দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু এই বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির ধারায় দক্ষিণ এশিয়া বিশেষ করে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল এবং আংশিকভাবে ভারত ও শ্রীলঙ্কা পেপ্যালের মতো আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম গ্রহণে এখনও তুলনামূলক পিছিয়ে রয়েছে। এর মূল কারণ প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা নয়, বরং নীতিগত কাঠামো, বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশের প্রতিনিধিত্ব করে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। এ অঞ্চলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা অত্যন্ত বড় এবং দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এত বড় ডিজিটাল জনসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও এ অঞ্চলে ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের হার এখনও ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

অর্থাৎ ডিজিটাল ব্যবহারকারী অনেক থাকলেও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংযোগ তুলনামূলক দুর্বল। এই দুর্বলতার সবচেয়ে বড় কারণ হলো বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ বলতে বোঝায় একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সরকার কতটা স্বাধীনভাবে বিদেশি মুদ্রা, বিশেষ করে ডলার, আয়, ব্যবহার এবং স্থানান্তর নিয়ন্ত্রণ করে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশই এ বিষয়ে তুলনামূলক কঠোর নীতি অনুসরণ করে।

উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করে এবং ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক পর্যায়ে বিদেশে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা, অনুমোদন এবং রিপোর্টিং ব্যবস্থা চালু রয়েছে। একইভাবে ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক (আরবিআই) এবং পাকিস্তানের স্টেট ব্যাংক, সেন্ট্রাল ব্যাংক অব শ্রীলঙ্কাও ক্যাপিটাল কন্ট্রোল এবং ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন কঠোরভাবে অনুসরণ করে। নেপালেও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়।

দক্ষিণ এশিয়ার বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ক্যাপিটাল আউটড্রো ম্যানেজমেন্ট। অনেক দেশই তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখার জন্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে।

উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সাধারণত ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করে ২০২৪-২৫ সময়ে এবং ২০২৬ সালে রিজার্ভ ৩৩ থেকে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে। এই সীমিত রিজার্ভের কারণে সরকার ডলার বাইরে যাওয়ার প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। কারণ যদি পেপ্যালের মতো একটি উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম সম্পূর্ণভাবে চালু করা হয়, তাহলে ব্যক্তি পর্যায়ে ছোট ছোট লেনদেনও দ্রুত বড় আকার ধারণ করতে পারে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

পেপ্যাল মূলত একটি ‘ফ্রি-ফ্লো ডিজিটাল কারেন্সি লেয়ার’, যেখানে ব্যবহারকারী দ্রুত আন্তর্জাতিক লেনদেন করতে, অর্থ ধরে রাখতে এবং বিভিন্ন দেশে স্থানান্তর করতে পারে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার নিয়ন্ত্রক কাঠামোতে প্রতিটি লেনদেন প্রায়ই মনিটরিং, অনুমোদন এবং রিপোর্টিংয়ের অধীনে থাকে। ফলে পেপ্যালের জন্য অপারেশনাল জটিলতা এবং কমপ্লায়েন্স খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়, যা কোম্পানির জন্য একটি বড় বাধা তৈরি করে। অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম অনেক বেশি সমন্বিত ও আধুনিক। সেখানে সুপার অ্যাপ যেমন গ্র্যাব এবং গোজেক একক প্ল্যাটফর্মে পেমেন্ট, পরিবহন, খাদ্য ডেলিভারি এবং ই-কমার্স সেবা একত্র করেছে। এ ধরনের সমন্বিত ইকোসিস্টেম পেপ্যালের জন্য সহজ ইন্টিগ্রেশন পরিবেশ তৈরি করে। এ ছাড়া আসিয়ান দেশগুলো আঞ্চলিক পর্যায়ে ক্রস-বর্ডার পেমেন্ট ইন্টারঅপারেবিলিটি বাড়ানোর জন্য ফিনটেক সহযোগিতা জোরদার করছে।

পেপ্যালের দৃষ্টিকোণ থেকে দক্ষিণ এশিয়া একটি ‘হাই রেগুলেশন-মিডিয়াম রিটার্ন’ বাজার। যদিও এখানে জনসংখ্যা বিশাল, তরুণ জনগোষ্ঠী বেশি এবং ফ্রিল্যান্সিং সেক্টর দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু প্রত্যেক ব্যবহারকারীর আন্তর্জাতিক লেনদেনের গড় মূল্য তুলনামূলক কম এবং বাজারটি অনেক বেশি বিচ্ছিন্ন। বিশ্বব্যাংক এবং বিভিন্ন ফিনটেক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল পেমেন্ট প্রবেশ হার এখনও ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যেখানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এটি ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।

তবে এই ইতিবাচক উদ্যোগের পাশাপাশি বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে পেপ্যাল চালু করা এখনও বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সীমিত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। একটি আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য খুব বেশি স্বস্তিদায়ক নয়। এই সীমিত রিজার্ভের কারণে সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার আউটড্রো বা বিদেশে অর্থ যাওয়ার প্রবাহ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে বাধ্য হয়। পাশাপাশি আরও কিছু বড় চ্যালেঞ্জ হলো ব্যাংকিং অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা। যদিও দেশে ডিজিটাল ব্যাংকিং দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে, তবুও আন্তর্জাতিক মানের রিয়েল-টাইম ক্রস-বর্ডার সেটেলমেন্ট এবং স্বয়ংক্রিয় বিরোধ নিষ্পত্তি এখনও পুরোপুরি উন্নত নয়। আরেকটি বড় বিষয় হলো, মানি লন্ডারিং এবং অবৈধ অর্থ স্থানান্তরের ঝুঁকি।

পেপ্যাল চালু হলে যদি পর্যাপ্ত মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে এটি অবৈধ লেনদেনের একটি মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। এ ছাড়া দেশের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি বড় হওয়ায় অনেক লেনদেন এখনও ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে ঘটে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মতো দেশে অনানুষ্ঠানিক খাত এখনও উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে রয়েছে। এই বাস্তবতায় সব লেনদেনকে স্বচ্ছ ও ট্র্যাকযোগ্য করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

মো. তৌফিকুল ইসলাম: ব্যাংকার; ডেটা অ্যানালিস্ট

আরও পড়ুন

×