জ্বালানি
ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট সমাচার
আবু তাহের খান
আবু তাহের খান
প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:০৭
বাংলাদেশের রাষ্ট্র সংস্কৃতির দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্যের একটি হচ্ছে কোনো বিষয়ে বড় ধরনের সংকটে না পড়া পর্যন্ত নির্লিপ্ত থাকা; আর যুক্তিকে প্রাধান্য না দিয়ে আগের সরকারের ভালো সিদ্ধান্তকেও বাতিল করে দেওয়া। বিদ্যমান জ্বালানি সংকটে প্রথম বৈশিষ্ট্যের লক্ষণগুলো ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
আমলা-রাজনীতিক সবাই মিলে এখন তেল খুঁজে বেড়াচ্ছেন। অথচ ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আক্রমণ শুরুর আগ পর্যন্ত এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় দপ্তরগুলো নির্লিপ্ত সময়ই পার করছিল। সে নির্লিপ্ততার প্রমাণ এই– দেশের একমাত্র জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) সম্প্রসারণ তথা দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনকল্পে ২০১২ সালে যে ডিপিপি (ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল) প্রণীত হয়েছিল, আজও এর বাস্তবায়ন কাজ শুরু হয়নি।
তবে সরকার এখন প্রকল্পটি সম্পন্ন করে ২০২৯ সাল নাগাদ তাকে উৎপাদনে নিতে চাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে– এক. ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের মোটামুটি বিশাল এই প্রযুক্তিঘন ও উচ্চ কারিগরি বিষয়যুক্ত প্রকল্পের বাস্তবায়ন মাত্র তিন বছরে সম্পন্ন করা সম্ভব কিনা; দুই. তাড়াহুড়া করে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কাজের যথাযথ গুণগত মান রক্ষা করা সম্ভব হবে কিনা; তিন. সম্পদের সীমাবদ্ধতা মোকাবিলায় ব্যয় হ্রাস করতে গিয়ে প্রকল্পের কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাদ পড়ে যাচ্ছে কিনা কিংবা জোড়াতালি দিয়ে সেগুলো সমন্বয়ের চেষ্টা করা হচ্ছে কিনা; চার. স্বল্প সময়ের কারণে দরপত্র-দলিল প্রণয়ন ও বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কোনো ত্রুটি ও দুর্বলতা থেকে যাচ্ছে কিনা; পাঁচ. স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রকল্পকে উৎপাদনে নিয়ে যাওয়ার স্বার্থে দরপত্র জমাদানের সময় কমিয়ে আনার কারণে খ্যাতিমান বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রস্তাব না পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে কিনা; ছয়. তাড়াহুড়া করে অর্থ জোগানদাতা প্রতিষ্ঠান বাছাই করতে গিয়ে ভুল প্রতিষ্ঠানকে বাছাই করা হচ্ছে কিনা; সাত. সম্পূর্ণ ঋণভিত্তিক বৈদেশিক সহায়তাপুষ্ট এ প্রকল্পের লাভজনকতা সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করে দেখা হয়েছে কিনা।
উত্থাপিত প্রশ্নগুলোকে এবার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার আলোকে খতিয়ে দেখা যাক। অভিজ্ঞতা বলে, কোনো প্রকল্পের মানসম্পন্ন বাস্তবায়নের জন্য যেসব চাহিদা ও শর্তের পরিপূরণ অত্যন্ত জরুরি, তাড়াহুড়া করে কৃত্রিমভাবে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় কমিয়ে আনতে গেলে খুব স্বাভাবিকভাবেই সে কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তার অনিবার্য ফল হিসেবে এর গুণগত মানও ব্যাহত হয় এবং পরে মাঝপথে নিরুপায় হয়ে প্রকল্প সংশোধন করতে হয়। আর মাঝপথে এরূপ সংশোধনের কারণে শেষ পর্যন্ত এর যে ব্যয় ও মেয়াদকাল দাঁড়ায়, সেটি গোড়াতেই করা হলে ব্যয় ও সময় উভয়েরই হয়তো সাশ্রয় হতো। তদুপরি চাপে পড়ে বাধ্যতামূলক ব্যয় ও সময় কমাতে যাওয়ার কারণে প্রকল্পের গোড়াতেই এর মানের ক্ষেত্রে তুলনামূলক একটি নিম্নতর স্ট্যান্ডার্ড দাঁড়িয়ে যায়। ফলে পরে ব্যয় ও সময় বাড়ানো হলেও কাম্য উচ্চতর মান কিছুতেই আর পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয় না, যদিও শেষ পর্যন্ত অর্থ ও সময় দুই-ই ব্যয় হয়ে যায়।
বিগত ১৪ বছরের মধ্যে প্রকল্পটির কাজের অঙ্গ ও ব্যয় বারবার পরিবর্তন করার ধরন দেখে এর কারিগরি ও আর্থিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজটি যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ পরিসরে হয়েছিল কিনা, সে বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। বর্তমান পর্যায়েও প্রকল্পটি মানসম্মত সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ভিত্তিতে প্রণীত হলো কিনা, সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়ে গেছে। সন্দেহের কারণটি বোঝার জন্য প্রকল্প ব্যয়-সংক্রান্ত সাম্প্রতিক তথ্যগুলো সামনে আনা যাক। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৫ হাজার কোটি টাকা। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এ প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়ায় ৪২ হাজার কোটি টাকা। আবার কয়েক মাসের মধ্যেই এটি এখন কমে দাঁড়াল ৩১ হাজার কোটি টাকায়। এখন কথা হচ্ছে, সরকার বদল হলেও প্রতিষ্ঠান ও তার কর্মীরা তো বদল হয়নি। তাহলে মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে বিশাল পার্থক্যযুক্ত এ তিন রকমের তথ্যের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কোনটি আসলে যৌক্তিক? একাধিক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ গণমাধ্যমকে (বিবিসি বাংলা) সরাসরি বলেছেন, প্রকল্পটির ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য কোনো সমীক্ষা নেই।
ইআরএল কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞেস করি, প্রকল্প ব্যয় অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে হঠাৎ কীসের ভিত্তিতে দ্বিগুণ হয়ে গেল এবং এখন আবার কোন যুক্তিতে সেটি এক-চতুর্থাংশ কমে গেল? বিষয়গুলো কেমন হাস্যকর হয়ে গেল না? ক্ষমতায় রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটার সঙ্গে সঙ্গে তথ্যের এরূপ বিসদৃশ ওঠানামাকে তারা কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? নাকি কোনোরূপ যুক্তি ও ভিত্তি ছাড়াই শুধু ওপরের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সহমত পোষণ করতে গিয়ে সবকিছুতেই তারা ‘হ্যাঁ’ বলছেন? শোনা যায়, প্রকল্পের অর্থায়নে দাতাদের কাছ থেকে উপযুক্ত সাড়া না পাওয়ার কারণেই প্রকল্প ব্যয় এ রূপ ব্যাপক হারে হ্রাস করা হয়েছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে দেশে জ্বালানি সংকট চরম আকার ধারণ করার কারণে সরকার তাড়াহুড়া করে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছে– এমনকি প্রকল্পটির প্রকৃত সমাপ্তিকাল ২০৩০ হলেও সরকার এটি ২০২৯-এ নামিয়ে আনতে চাচ্ছে।
বিরাজমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্প্রসারণ যত জরুরিই হোক; এর কারিগরি, প্রাযুক্তিক, আর্থিক ও বাণিজ্যিক লাভজনকতার দিকগুলো ভালোভাবে যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনা না করে এর বাস্তবায়ন কাজে হাত দেওয়া সমীচীন হবে কিনা, তা ভালো করে ভেবে দেখা প্রয়োজন (প্রকল্পের ত্বরিত বাস্তবায়নের বিপক্ষে বলা হচ্ছে না)। তা না হলে ভালো কিছুর পরিবর্তে উল্টো ফল সৃষ্টির আশঙ্কাই সর্বাধিক। দীর্ঘ মেয়াদে অধিকতর সুফল পাওয়ার জন্য যুক্তিসংগত বিলম্ব মেনে নেওয়াই এ ক্ষেত্রে উত্তম সিদ্ধান্ত হবে বলে মনে করি।
পরিশেষে বলব, দেশের প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইআরএল স্থাপনের পর ইতোমধ্যে ৫৮ বছর পেরিয়ে গেলেও দেশে দ্বিতীয় আরেকটি পরিশোধনাগার স্থাপিত না হওয়ার বিষয়টি দুর্ভাগ্যজনক। আবার দীর্ঘ ৬৩ বছরের ব্যর্থতা ঢাকতে গিয়ে ইআরএল যেন এর দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্তে নতুন করে কোনো ভুল না করে, সেটিই কাম্য।
আবু তাহের খান: সাবেক পরিচালক, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক), শিল্প মন্ত্রণালয়
- বিষয় :
- জ্বালানি তেল
