পরিবর্তনের হাওয়া অন্তঃসারশূন্যতার দিকে
জয়া ফারহানা
প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:৫৯
এক প্রজন্মের আকর্ষণ-বিকর্ষণ, প্রীতি-বিদ্বেষের সঙ্গে অন্য প্রজন্মের ব্যবধান থাকেই। আশির দশকে যারা কৈশোর কাটিয়েছেন তারা খুব ভালো জানেন, নব্বইয়ের দশকের কৈশোরের সঙ্গে তাদের যাপিত কৈশোরের ব্যবধান। আবার নব্বইয়ে যিনি কৈশোর কাটিয়েছেন, তার পক্ষে এখনকার কিশোরদের অনেক কিছুই অসঙ্গত মনে হয়। খুব সূক্ষ্ণ কিছু পরিবর্তনও একটু একটু করে জমে একটি দশককে বদলে দেয়; তৈরি হয় জেনারেশন গ্যাপ। জীববিজ্ঞানী জে গুল্ডের ধারণায়, পরিবর্তনই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সত্য বলে মানুষ হিসেবে আমরা এখনও দাঁড়িয়ে আছি। কেননা, অন্য যে কোনো জীবের মতো মানুষেরও প্রধান বৈশিষ্ট্য অভিযোজন ক্ষমতা। তার এ ধারণাকে সমর্থন করার জন্য ডারউইনের বিবর্তনবাদ তো আছেই। সেটা অনেক বড় পরিসরের আলোচনা। আপাতত পরিবর্তনবাদের সংস্কৃতি নিয়ে একটু বলি, যা আমাদের আটপৌরে অভিজ্ঞতার ঝুলিতে যোগ করে দু'চারটি নস্টালজিক স্মৃতি।
দুই
বিশ্বে ফেসবুক ব্যবহারে বাংলাদেশ দ্বিতীয়। এই ফেসবুককে কেউ কেউ বলেন, ডিজিটাল কোকেন। অথচ টিনএজারদের কাছে এটাই আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় ঢোকার গেটওয়ে। কিন্তু এই গেটওয়ে দিয়ে সে কতদূর পর্যন্ত যাবে এবং সেই পথ বিপৎসংকুল, না মসৃণ; তার জন্য কোনো ছাঁকুনির ব্যবস্থা নেই। ভাবা দরকার। উপরন্তু মার্ক জাকারবার্গ দিয়েছেন ফ্রি বেসিস নামে এক পরিষেবা, যার সাহায্যে টেলিফোন কোম্পানি প্রদত্ত ডেটা ব্যবহার না করেও মামুলি স্মার্টফোনে নাগাল পাওয়া যাচ্ছে ফেসবুকের। আম-আদমির ফেসবুক আর কি। নব্বইয়ের দশকে বাসে বা ট্রেনে উঠলে দেখেছি সহযাত্রী জানালায় চোখ রেখে বাইরে দিয়ে প্রকৃতি দেখছেন, নয়তো বই পড়ছেন। এখন সব সহযাত্রীর চোখ দেখি মোবাইলের পর্দায়। আমরা কৈশোরে একটি শিঙাড়া বা ডালের কচুরি পেলে বর্তে গেছি। এখনকার কিশোররা সপ্তাহজুড়ে নামি ব্র্যান্ডের দামি পিৎজা খেয়েও খুশি নয়। সারাক্ষণ নম্বরের পেছনে ছোটা আর সফল হওয়ার স্ট্রেস নিতে নিতেই কি খুশি হতে ভুলে যাচ্ছে তারা? এ জন্য কৈশোর দায়ী নয় অবশ্য। বাবা-মায়ের ইচ্ছা পূরণে অপারগ ছেলেমেয়েদের কপালে যে পরিমাণ ভর্ৎসনা জোটে, তাতে স্ট্রেস রিলিভার হিসেবে তাদের সামনে যত মূল্যবান সামগ্রী হাজির করা হোক না কেন, তারা তো আর উপভোগ করতে পারে না কৈশোরের স্বতঃস্ম্ফূর্ত ও শাশ্বত মাধুর্য। আজকের কৈশোরের একটি শ্রেণি অঢেল প্রাচুর্যের মধ্যে বড় হচ্ছে, না চাইতেই বৈষয়িক সামগ্রী সব পাচ্ছে। আরেকটি শ্রেণি তাদেরকে দেখেছে এবং তাদের মতো ভোগের সামগ্রী না পেয়ে হতাশাতেও ভুগছে। মনোবিজ্ঞানীর পরিভাষায় এই কিশোররা ভুগছে বর্ডার লাইন পারসোনালিটি ডিজঅর্ডারের মতো ডিপ্রেশনে। এই ডিপ্রেশনকে পুঁজি করেই আবার ফিলিপ বুঁদেকিনের মতো প্রযুক্তিবিদ তৈরি করছে ব্লু হোয়েল, মুমু, কিকি নামে ভার্চুয়াল গেম। এমন মরণঘাতী ভার্চুয়াল গেমের উদ্ভাবক ২১ বছরের রুশ তরুণ ফিলিপ বুঁদেকিন বেশ উদ্ধত স্বরে বলেছেন, তিনি সোসাইটি ক্লিনজিংয়ের কাজ করছেন। বলেছেন, পৃথিবীকে যারা ভালোবাসে না, পৃথিবীর প্রতি তাদের কী অবদান থাকবে? এসব বায়োলজিক্যাল ওয়েস্ট বা মার্কামারা লুজার আসলে পৃথিবীর আবর্জনা। এদের পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়াই ভালো।
কিশোরদের দোষ দিয়ে কী লাভ? ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে না পারলে যে জীবন বৃথা- এ ধারণা অভিভাবকরাই ঢুকিয়েছেন তাদের মাথায়। ছেলেমেয়েদের ব্র্যান্ডেড স্কুলে ভর্তি করার জন্য প্রতি বছরের মতো এ বছরও অন্তত কয়েক হাজার বাবা-মাকে ভোররাত থেকে রাত ২টা-৩টা পর্যন্ত স্কুলের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাবে। কেউই একটি মাত্র স্কুলের ফরম এনে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন না। স্কুল শেষের পরীক্ষায় বিশাল নম্বর প্রাপ্তির জন্য কোনো নামজাদা কলেজে ভর্তির পথে উঁচু কাট অফ মার্কসের চৌকাঠে যেন হোঁচট খেতে না হয়, তার প্লে গ্রুপ পর্ব থেকেই এ ব্যবস্থা। দেখা যাচ্ছে, শুধু কৈশোর বদলায়নি, সবাই বদলেছেন। সবাই বদলেছেন বলেই বদলে গেছে নগর সংস্কৃতি। বদলেছে সপ্তাহান্তের ছুটিতেই নিত্যদিনের বাজার ধারণা। অনলাইন শপিং সাইট খোলা থাকছে সপ্তাহের সাত দিন, ২৪ ঘণ্টা। আড্ডার জন্য শারীরিক উপস্থিতিতে অনেকের অনীহা। হতে পারে জ্যামের কঠিন উজান ঠেলে শ্রান্ত-ক্লান্ত হয়ে ওঠাটাই এর কারণ। হয়তো সে কারণে অ্যাপস্ চ্যাটই এখন আড্ডার ভরসা। আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগে ব্যবসায়ীরা দেশের বাইরে যেতে চাইলে প্রথমেই খুঁজত ট্রাভেল এজেন্টকে। এখন ট্রাভেল এজেন্টদের প্রাথমিক দায়িত্ব নিয়েছে ইন্টারনেট। বাংলা, দর্শন, ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাস থেকে পাস করা একাডেমিশিয়ানদের চাকরির বাজার প্রায় শূন্য, যদি না তিনি বিসিএস উত্তীর্ণ হন। পরিবর্তে এসেছে ব্যাচেলর ইন টাউন প্ল্যানিং, হোটেল ম্যানেজমেন্ট, এয়ার এভিয়েশন, বিউটি ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কিত পাঠ্যক্রম। আগে মধ্যবিত্তের কাছে সুখের সংজ্ঞা ছিল গোলাভরা ধান, গলাভরা গান, গোয়ালভরা গরু, পুকুরভরা মাছ। বদলেছে সে ধারণাও। এখন মধ্যবিত্তের কাছে সুখের ধারণা স্মার্ট বেতনের চাকরি বা বড় ব্যবসা, বিশাল আয়তনের ফ্ল্যাট, নামি ব্র্যান্ডের গাড়ি, বনেদি ক্লাবের মেম্বারশিপ, বছরে অন্তত দু'বার বিদেশ ভ্রমণ, সন্তানদের কনভেন্ট স্কুলে ভর্তি, সঙ্গে সেন্স অব স্যাটিসফেকশন। আগে শুনেছি, স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে যত বেশি সময় কাটাবে, ততই তাদের বন্ধন মজবুত হবে। এখন শুনি, পরস্পরকে হেলদি স্পেস না দেওয়ার কারণেই নাকি ঘটে যাচ্ছে আকসার বিচ্ছেদ। নতুন প্রজন্মকে চেনা তো শুধু মানুষ হিসেবে চেনা নয়; সময়ের পারম্পর্যে গোটা সমাজের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠার প্রশ্নও। সেই সূত্রে বেশ কয়েকজন কিশোর-কিশোরীর সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, শারীরিক অন্তরঙ্গতা ছাড়া প্রেমকে তারা মানবিক বিকার বলে ভাবে। বদলে গেছে বাঙালিত্বের ধারণা। প্রণব বর্ধন 'স্মৃতিকন্ডূয়ন' প্রবন্ধে লিখেছেন, লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে আছি। এক লোক এসে জিজ্ঞেস করল, আপনি বাঙালি? আমি হ্যাঁ বলতেই সে বলল, কবে আইছেন ঢাকা থিইক্যা? বললাম, কলকাতার লোক আমি। বিস্মিত হয়ে সে বলল, তবে যে বললেন, বাঙালি! প্রণব বর্ধন লিখছেন, ছোটবেলায় শুনেছি, ও বাঙালি নয়; মুসলমান। ইতিহাস বোধহয় এখন আমাদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়া শুরু করেছে। চিঠি লেখার মতো একটি মাধুর্যময় শিল্প উঠেই গেল টেলিকমিউনিকেশনের প্রবল ধাক্কায়। সব বিবর্তনই কি ভালো?

তিন
বিবর্তনের ভুল পরীক্ষাও আছে। লামার্ক নামে এক বিজ্ঞানী তার গবেষণায় দেখিয়েছিলেন, অভ্যাস ও অনুশীলনের মধ্য দিয়ে জীব যে বৈশিষ্ট্য আয়ত্ত করে; পরবর্তী প্রজন্মে তা প্রবাহিত হয়। জিরাফ নাকি ঘাড় উঁচু করে পাতা খাওয়ার চেষ্টা করতে করতে হরিণসদৃশ প্রাণী থেকে লম্বা গলার প্রাণীতে পরিণত হয়েছে। পরবর্তী সময়ের গবেষকরা লামার্কের এ ধারণাকে ক্রিয়েটিভ ইভ্যালুয়েশন নাম দিয়ে এর বৈজ্ঞানিক সত্যকে নাকচ করে দিয়েছেন। কিন্তু ডারউইনের গবেষণাকে এখনও নাকচ করা যায়নি বরং জিনতত্ত্ব আবিস্কারের পর ডারউইনতত্ত্ব আরও জোরদার হয়েছে। গবেষকরা দেখিয়েছেন, ডারউইনের বিবর্তনবাদকে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সমর্থন করে ভারতীয়রা। ৭৭ শতাংশ ভারতীয় বিবর্তনবাদের সমর্থক। কারণ কী? হতে পারে ভারতীয় পুরাণের অবতারবাদ।
একটি গ্রন্থ কীভাবে গোটা পৃথিবীকে ওলটপালট করে দিতে পারে, তার সবচেয়ে উদাহরণ বোধহয় 'অরিজিন অব স্পিসিস'। মানুষের জীবনকে আমূল বদলে দিয়েছে আরও যে দুই গ্রন্থ, তার মধ্যে আছে সিমোন দ্য বেভোয়্যার সেকেন্ড সেক্স এবং সাঁত্রর এগজিসটেন্টশিয়ালিজম। সাঁত্র ও বেভোয়্যারের কথা যখন উঠলই তখন লিভ টুগেদার নিয়ে দু'এক বাক্য বলা যাক। আজীবন বিবাহহীন দাম্পত্যের সবচেয়ে বড় সেলিব্রিটি এই দুই বুদ্ধিজীবী। প্রাচ্যে আছেন শিশির কুমার ভাদুড়ি ও কঙ্কাবতী। কেউ কাউকে বিয়ে করবেন না, কেউ কারও ওপর মালিকানা ফলাবেন না অথচ পরস্পরের সাহচর্যে এক ছাদের নিচেই থাকবেন এবং যুগলের কেউ দ্বিতীয়-তৃতীয় কারও সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেও কেউ কারও ওপর রাগ করবেন না- এই ছিল তাদের চুক্তি। আদতে এই ধারণা প্রাচ্যের উপযোগী কিনা, সে আলাপে আপাতত যাচ্ছি না। তবে এও সত্যি, নতুন প্রজন্ম সাংস্কৃতিক বিবর্তনের পথে যত দ্রুত ধাবমান, তাতে এই প্রথা থেকে তাদের মুখ ফেরানো মুশকিল হয়ে পড়বে। ভাববেন না, আধুনিকতার উজ্জ্বল অভিমুখটিকে মধ্যযুগের অন্ধকারের দিকে ফিরিয়ে নেওয়াই এ লেখার উদ্দেশ্য। বেশিসংখ্যক ডিভোর্স মোটেই নিন্দনীয় ব্যাপার নয়। বরং কম ডিভোর্সই সন্দেহজনক। কেননা, তা ভয়ংকর রকম পুরুষ শাসিত সমাজকে ইঙ্গিত করে। 'পতি পরমেশ্বর' পুরুষ বৃক্ষ, নারী সঞ্চারিণী পল্লবলতা; বৃক্ষকে অবলম্বন করে বাঁচাই তার নিয়তি- এসব ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করাই উচিত। নারীরা এখন মোটেও আর পরজীবী লতা নয়; দীপশিখা। তারপরও প্রশ্ন থেকেই যায়, এই সাংস্কৃতিক বিবর্তন এবং পরিবর্তন মেনে নেওয়ার জন্য সমাজ প্রস্তুত তো? পরিবর্তনের হাওয়ার সঙ্গে আসা ধুলোবালি এবং দূষণ রোধের ছাঁকনিটি যথেষ্ট মজবুত তো?
কলাম লেখক
- বিষয় :
- সমাজ
- জয়া ফারহানা
