ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অভিশংসন ও অবশিষ্ট বিশ্ব

অভিশংসন ও অবশিষ্ট বিশ্ব
×

কার্ল বিল্ট

প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:১১

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আরও একবার প্রেসিডেন্টের অভিশংসন কার্যধারা নামীয় সুগভীর নাটক মঞ্চায়ন হতে যাচ্ছে। তবে এ দফায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্য ঘটনাটির তাৎপর্য হতে পারে সুবিশাল, যেটি আগের কোনো অভিশংসনের বেলায় দেখা যায়নি।


এবারের অভিশংসন তদন্তটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক ডেমোক্র্যাট দলীয় তার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও তার ছেলের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত শুরুর ঘোষণা দিতে ইউক্রেন সরকারের ওপর প্রভাব খাটানোকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে। আধুনিক যুগে এর আগে দুই দফা অভিশংসন ঘটনাগুলো একটু ভেবে দেখুন। প্রথমটি ছিল- ডেমোক্র্যাট দলীয় জাতীয় কমিটির দপ্তরে ১৯৭২ সালের এক মধ্যরাতে অবৈধ অনুপ্রবেশের সূত্র ধরে ধীরলয়ে দানা বেঁধে ওঠা সংকট, যা দুই বছর ধরে মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে তোলপাড় করার পর ১৯৭৪ সালের আগস্টে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের পদত্যাগের চূড়ান্ত পরিণতিতে গিয়ে শেষ হয়। দ্বিতীয়টি ছিল- প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের বিরুদ্ধে বিশেষ প্রতিনিধির তদন্ত। এ ঘটনায় মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ ১৯৯৮ সালে প্রেসিডেন্টকে অভিশংসিত করে; কিন্তু ১৯৯৯ সালে সিনেট থেকে তিনি অব্যাহতি লাভ করেন।

উভয় ঘটনায় সমস্যার শিকড় অভ্যন্তরীণ প্রকৃতি ছিল। নিক্সন অভিযুক্ত হয়েছিলেন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের উদ্দেশ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং পরবর্তী তদন্ত কাজে বাধা সৃষ্টির কারণে। আর ক্লিনটনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, ব্যক্তিগত আচরণে শপথ ভঙ্গ ও অন্যান্য অনৈতিকতার। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি একেবারে আলাদা। এর কেন্দ্রে রয়েছে খোদ মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি।

ইউক্রেনের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক মোটেও গৌণ ব্যাপার নয়। ইউরোপীয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকারের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ইউক্রেন নীতির উৎস নিহিত রয়েছে। বস্তুত ২০১৪ সালে রাশিয়া কর্তৃক ক্রিমিয়াকে নিজের সঙ্গে সংযুক্তি এবং পূর্ব ইউক্রেনে ঢুকে পড়ার পর থেকে ইউক্রেনকে তার স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিরাপদ রাখতে সহায়তা করা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন- উভয়ের জন্য পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রীয় অংশ হয়ে উঠেছে।

উপরন্তু আগের দুই দফা ইমপিচমেন্ট সংকটের বিপরীতে এবারে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির যাবতীয় কাঠামো থমকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। ওয়াটারগেট সংকটকালে হেনরি কিসিঞ্জার একই সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদে থাকায় তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধ ও মার্কিন-সোভিয়েত সম্পর্ককে আলোচ্যসূচির ওপরদিকে স্থান দিয়ে ডুবুডুবু জাহাজ ভাসিয়ে রাখার সুযোগ নিতে পেরেছিলেন। একইভাবে ক্লিনটন নাটকের আগাগোড়া সময়টিতে, যা কিনা কসোভো যুদ্ধের নেপথ্যে কিন্তু একই সমান্তরালে ঘটছিল; মার্কিন কূটনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি বড় মাপের বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েনি।

স্পষ্টত ট্রাম্পের অভিশংসন তদন্তের ব্যাপারে একই রকম প্রেক্ষাপট বিদ্যমান আছে- এ কথা বলা যাচ্ছে না। চলমান প্রক্রিয়াটি ইতোমধ্যে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনাকারী মহল, যারা ইউক্রেন বিষয়ে ঘোষিত মার্কিন নীতিকে আরও উঁচুতে তুলে ধরতে চাইছেন আর মৌলিকভাবে ভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে অগ্রসরমান হোয়াইট হাউস এই দুই পক্ষের মধ্যে গভীর মতানৈক্য প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। মারাত্মক এই সংকটকে কূটনৈতিক মহল এখনও সামাল দেওয়ার সামর্থ্য রাখে কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়। হোয়াইট হাউসের পক্ষে বিচক্ষণ ব্যক্তিত্বের অনুপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর (যিনি নিজেও কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েছেন) পরিচালনায় ইতোমধ্যে হতোদ্যম হয়ে পড়া স্টেট ডিপার্টমেন্ট বৃহত্তর অভিশংসন লড়াইয়ে মূল যুদ্ধক্ষেত্রের রূপ নিয়েছে।

অধিকন্তু ট্রাম্প নিজে চলমান অভিশংসন নাটককে বাদবাকি বিশ্বের জন্য আরও বেশি খারাপ করে তুলতে পারেন। ক্লিনটনের অভিশংসন প্রক্রিয়া চলাকালে হোয়াইট হাউস 'স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন' প্রচলিত নিয়মে অব্যাহত রাখার অলিখিত শপথ নিয়েছিল এবং বিবদপূর্ণ বিতর্কে কোনো পক্ষের হয়ে অংশগ্রহণ থেকে বিরত ছিল। ট্রাম্প এরই মধ্যে পুরোপুরি বিপরীত অবস্থান নিয়ে ইউক্রেনে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে আক্রমণের (টুইটার মারণাস্ত্রে) নিশানা করেছেন। তাও এমন সময়ে, যখন বেচারি রাষ্ট্রদূত হাউস ইনটেলিজেন্স কমিটির সামনে সাক্ষ্যদানে ব্যস্ত।

স্পষ্টত ট্রাম্প প্রক্রিয়াটির সব খুঁটিনাটি অংশের পর প্রাধান্য বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। টুইট ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ আর ফক্স নিউজ পর্যবেক্ষণে তিনি যখন ব্যস্ত সময় কাটাবেন, তখন ওভাল অফিসে থাকা বাকি সহকর্মীদের দায়িত্ব হবে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সব কাজ সামাল দেওয়া। এদিক থেকে দেখলে ট্রাম্প নাটকের সঙ্গে ওয়াটারগেটের মিল রয়েছে। নিক্সনের মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটতে ওয়াটারগেটের ভূমিকা কম ছিল না। কিন্তু ট্র্রাম্প যেহেতু সাংবিধানিক রীতিনীতি লঙ্ঘনের যেসব অভিযোগ তার বিরুদ্ধে তোলা হয়েছে, তার বাধ্যবাধকতা বেশি নয় বলে মনে করছেন (অথবা আদৌ সজাগ নন)। তাই তিনি প্রক্রিয়াটিকে লাইনচ্যুত করতে আরও বেহায়ার মতো চেষ্টা চালানোর সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে।

ট্রাম্পের আচরণ তাকে দায়িত্ব থেকে অপসারণের যোগ্য করে তুলেছে কিনা, তা নির্ধারণ করবে মার্কিন সিনেট। তবে যাই ঘটুক না কেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংকট এমন সময় সৃষ্টি হয়েছে, যখন বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা ক্রমবর্ধমান। একদিকে সংস্কারপন্থি রাশিয়া উদ্ভূত যে কোনো পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে লাভবান হতে মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, পাশাপাশি ক্রমেই ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠা চীন এশিয়া অঞ্চলে এবং বিশ্বমঞ্চে তার পেশির কসরত অব্যাহত রেখেছে।

ইত্যবসরে মধ্যপ্রাচ্যে গভীর অস্থিতিশীলতার আরেক পর্ব সূচিত হয়েছে, যেখানে সামান্য স্টম্ফুলিঙ্গ মুহূর্তে বিশাল অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হওয়া অসম্ভব নয়। উত্তর কোরিয়ার পরমাণু অস্ত্রধারী শাসকগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত উস্কানিমূলক নতুন পদক্ষেপ নিয়ে ভাবছে এবং উপর্যুপরি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে 'প্রথম ধাপের' চুক্তি সম্পাদনের সর্বশেষ ঘোষণা সত্ত্বেও বাণিজ্যিক উত্তেজনা বাড়ছে। গণপ্রতিবাদের ঢেউ বিশ্বের এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছড়িয়ে যাচ্ছে সান্টিয়াগো এবং কুইটোর পর এবার বৈরুত ও হংকংয়ে।

বর্তমান আন্তঃসম্পর্কযুক্ত পৃথিবীতে যে কোনো একটি স্থানীয় সংকট অতি দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের টেবিলে জায়গা করে নিতে পারে এবং বিপরীতে নীতিগত প্রতিক্রিয়া যেটি মিলবে (অথবা মিলবে না), তার তাৎপর্য হতে পারে বৈশ্বিক মাত্রার। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রন সম্প্রতি ন্যাটোর আসন্ন 'ব্রেইন ডেথে'র সতর্কবাণী উচ্চারণ করে খবরের শিরোনাম হয়েছেন। আটলান্টিক উপকূলবর্তী দেশগুলোর সম্পর্কের বিষয়ে এই বিমর্ষ ভবিষ্যদ্বাণী যদি চলতি মাসের প্রথমভাগের জন্য সঠিক বলে গণ্য হয়, তাহলে অভিশংসন নাটকে এই মুহূর্তে উত্তেজনা তুঙ্গে ওঠার প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে বৈকি।

পূর্ববর্তী অভিশংসন উপাখ্যানগুলো ঘটার সময় বিশ্বমঞ্চে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম কৌশলগত খেলোয়াড়ের ভূমিকায় ছিল। কিন্তু ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী ভাঙন সৃষ্টির কুশীলব হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছে। সর্বশেষ এই কেলেঙ্কারি কৌশলগত রাগের বহিঃপ্রকাশ নাকি কৌশলগত কর্মবিরতির পরিণতি লাভ করতে যাচ্ছে, তা দেখতে অপেক্ষায় থাকতে হবে। দুটি দৃশ্যপটের কোনোটি মেনে নেওয়ার সামর্থ্য বিশ্বের নেই।

প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে ভাষান্তর

আশরাফুল মকবুল



আরও পড়ুন

×