ফুটবল ক্লাবে ক্যাসিনোর কারবার!
মহিউদ্দিন খান মোহন
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০১৯ | ১৪:৫৩
একসময় বাংলাদেশে ফুটবল খেলার অবস্থা ছিল রমরমা। সেই পাকিস্তান আমল থেকে ঢাকা প্রথম বিভাগ ফুটবল লীগ ছিল এ দেশের ক্রীড়ামোদীদের বিনোদনের অন্যতম উৎস। দল বেঁধে সবাই খেলা দেখতে হাজির হতেন আজকের বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। তখন ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, দিলকুশা স্পোর্টিং, ওয়ারী, আজাদ স্পোর্টিং ছিল খেলার মাঠের আলোচিত নাম। সে সময় মোহামেডান-ওয়ান্ডারার্স ছিল দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। প্রথম বিভাগ ফুটবল লীগের শিরোপা এ দুটি ক্লাবের দখলেই থাকত। স্বাধীনতার পর ক্রীড়াঙ্গনে অভ্যুদয় ঘটে আবাহনী ক্রীড়া চক্রের। এই ক্লাবটিকে ভাষ্যকাররা অভিহিত করতেন আধুনিক ফুটবলের ধারক বলে। আর মোহামেডানকে বলা হতো ঐতিহ্যবাহী ক্লাব। আবাহনী মাঠে আসার পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। মোহামেডানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে তারা। শুধু তাই নয়; শিরোপা ছিনিয়ে নিয়ে তারা তাদের শক্তিমত্তার প্রমাণও দেয়। এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর খেলার দিন স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে তিলধারণের জায়গা থাকত না। একই সময়ে বাংলাদেশের ক্রীড়াজগতে তৃতীয় শক্তির আবির্ভাব ঘটে ব্রাদার্স ইউনিয়নের পদচারণার মাধ্যমে। তারুণ্যনির্ভর এ ক্লাবটিরও সমর্থক গড়ে ওঠে সারাদেশে। তা ছাড়া রহমতগঞ্জ, ওয়ারী ক্লাবও মাঠে পা রাখত শক্তভাবেই। ওয়ারী তো ১৯৭৮ সালে ঢাকা সিনিয়র ডিভিশন ফুটবল লীগে পরপর দু'বার আবাহনীকে হারিয়ে 'জায়ান্ট কিলার' তকমা বাগিয়ে নিয়েছিল। সে সময় মোহামেডানের সমর্থকরা আবাহনীর সমর্থকদের 'ওয়ারী আইলো' বলে টিজ করত।
ফুটবল তখন এমনই জনপ্রিয় ছিল যে, ক্লাবগুলোর সমর্থক ছিল ঘরে ঘরে। পাড়া-মহল্লায় গড়ে উঠেছিল 'মোহামেডান ফ্যানস ক্লাব', 'আবাহনী সমর্থক গোষ্ঠী', 'ব্রাদার্স ইউনিয়ন সমর্থক গোষ্ঠী' নামে সংগঠন। সমর্থকরা স্ব-স্ব ক্লাবের খেলার দিন বাড়ির ছাদ কিংবা গাছের মাথায় উড়িয়ে দিত ক্লাবের পতাকা। ঢাকা শহরের আকাশ ছেয়ে থাকত সাদা আর আকাশি রঙের পতাকায়। আজ আর সেদিন নেই! ঢাকাই ফুটবলের কথা যেন সবাই বিস্মৃত হয়েছেন। এখন আর আকাশে উড়তে দেখা যায় না আবাহনী কিংবা মোহামেডানের পতাকা। দল বেঁধে কেউ আর স্টেডিয়ামে ভিড় করে না খেলা দেখতে। কেন এমন ফুটবলবিমুখতা? ক্রীড়াবিশারদদের মতে, ফুটবল আমাদের আর আকর্ষণ করতে পারছে না। কেন পারছে না? ফুটবলের যারা অভিভাবক, তারা এর আধুনিকায়ন বা নতুন খেলোয়াড় তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
একসময় কত কৃতী ফুটবলার তৈরি হয়েছিল আমাদের এই দেশে! কাজী সালাহউদ্দিন, আবদুস সালাম মুর্শেদী, বাদল রায়, আসলাম, কায়সার হামিদ, ফজলু, অমলেশ, আবুল, এনায়েত- এসব কীর্তিমান খেলোয়াড়ের নাম ছিল সবার মুখে মুখে। এখন কি এমন একজন খেলোয়াড় পাওয়া যাবে, যাকে সারাদেশের মানুষ একনামে চেনে? পাওয়া যাবে কীভাবে? নাম ছড়িয়ে যাওয়ার মতো খেলা কি কেউ উপহার দিতে পারছে? মোটেই না। একসময় আমাদের ফুটবল এতটাই উন্নতি করেছিল যে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে থাইল্যান্ডের রাজবীথি ক্লাব, মালয়েশিয়ার পেনাং ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন টিম, শ্রীলংকার টিম আমাদের ফুটবল টিমের কাছে হেরেছে। ক্লাবগুলো শিরোপা ধরে রাখার জন্য আমদানি করত বিদেশি নামিদামি খেলোয়াড়দের। এখন সে কথা কি কল্পনা করা যায়? ক্লাবগুলোর হর্তাকর্তারা খেলোয়াড় তৈরির বদলে বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত। আর সে বাণিজ্যের অন্যতম মাধ্যম ক্যাসিনোর মতো জুয়ার আসর।
ক্লাবগুলোতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে এটা স্পষ্ট- ওগুলোর কর্মকর্তারা খেলাধুলার উন্নয়ন বা খেলোয়াড় তৈরির পরিবর্তে অবৈধ আয়ের দিকেই বেশি মনোযোগী। তারা ক্লাবের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে ক্যাসিনো বসিয়ে জুয়া আর মাদকদ্রব্য বিক্রির করে বিত্ত গড়ার ধান্দায় ব্যস্ত ছিলেন। ফুটবল, ক্রিকেটসহ ক্রীড়াক্ষেত্রে আমাদের দৈন্যদশার পেছনে ক্লাবগুলোর স্থবিরতা যে সবচেয়ে বেশি দায়ী, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ক্রীড়াব্যক্তিত্বরা এ জন্য ক্লাবগুলোর উদাসীনতাকেই দায়ী করে থাকেন। প্রয়োজনীয় পরিচর্যা ও তত্ত্বাবধানের অভাবে ক্লাবগুলো কৃতী খেলোয়াড় তৈরি করতে পারছে না। ফলে ক্লাবগুলো নির্জীব হয়ে পড়েছে। এর যারা কর্মকর্তা তারা যে ক্রীড়ার পরিবর্তে অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, তা র্যাব-পুলিশের অভিযানের পরই মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়েছে। কল্পনা করা যায়, যে মোহামেডান ক্লাব ছিল আমাদের ক্রীড়াঙ্গনের আইডল, সে মোহামেডান আজ আক্রান্ত অবক্ষয়ের ভাইরাসে! সেখানে এখন ফুটবল-ক্রিকেট নিয়ে ভাবা হয় না। ভাবা হয় ক্যাসিনো ব্যবসা নিয়ে। আর এসব জুয়ার আড্ডা নিয়ন্ত্রণ করেন ক্লাবেরই কিছু কর্মকর্তা! মোহামেডানের একসময়ের অধিনায়ক গোলাম সারোয়ার টিপু গত ২২ সেপ্টেম্বর একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আরামবাগের এই ক্লাবপাড়া ছিল আমার সেকেন্ড হোম। প্রতিদিন এখানে না এলে একটা শূন্যতা অনুভব করতাম। আর আজ সে ক্লাবপাড়ার যে ছবি দেখলাম, তাতে আর কখনও সেখানে যাওয়ার ইচ্ছা হবে বলে মনে হয় না।

লায়নইজমে একটি কথা প্রচলিত- 'লায়ন্স ক্লাবে সম্পৃক্ত হতে হলে চিত্ত ও বিত্তের সমন্বয় থাকতে হবে।' অর্থাৎ শুধু বিত্ত থাকলেই হবে না, সেই সঙ্গে থাকতে হবে জনকল্যাণে সে বিত্ত ব্যয় করার মতো চিত্ত। আগে ক্রীড়া ক্লাবগুলোর কর্মকর্তা হতেন সমাজের সম্মানীয় ও বিত্তবান মানুষেরা। তারা এসব ক্লাবের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতেন ক্রীড়ার উন্নয়নে অবদান রাখার মানসে। তারা ক্লাব পরিচালনায় আসতেন কিছু দিতে; নিতে নয়। কিন্তু বর্তমানে আমরা কী দেখলাম? এমন সব ব্যক্তি ক্লাবগুলোর হর্তাকর্তা হয়ে বসেছে, সমাজে যাদের কোনো ইতিবাচক ভাবমূর্তি নেই। তাদের প্রধান লক্ষ্যই হলো এখান থেকে নিজের বিত্ত গড়ার পথ করে নেওয়া। হোক সেটা বৈধ, কি অবৈধ। আর এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের ক্যাডাররা আছেন প্রথম সারিতে।
এদিকে শুধু ঢাকা নয়; বগুড়া, চট্টগ্রাম, খুলনার ক্রীড়া ক্লাবগুলোতেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের খবর এসেছে। সবখানেই জুয়া খেলার প্রমাণ পাওয়া গেছে; উদ্ধার করা হয়েছে জুয়ার সামগ্রী। চট্টগ্রামে অভিযান চালানোর পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন জাতীয় সংসদে সরকারদলীয় হুইপ সামশুল হক চৌধুরী। বলেছেন, 'ক্লাবে তাস খেলা বন্ধ করলে ছেলেরা রাস্তায় ছিনতাই করবে। এখানে কোনো ক্যাসিনো নেই। ক্যাসিনো ধরেন। যেসব ক্লাবে ক্যাসিনো নেই সেগুলো ধরবেন না। প্রশাসন কি খেলোয়াড়দের পাঁচ টাকা বেতন দেয়? ওরা কীভাবে খেলে, টাকা কোত্থেকে আসে? এই ক্লাবগুলো তো পরিচালনা করতে হবে?' হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর মতে, তাস দিয়ে জুয়া খেলা কোনো অপরাধ নয়; জায়েজ। কিন্তু একজন আইন প্রণেতা হিসেবে তার তো জানা থাকার কথা, জুয়া সে তাসে হোক বা ক্যাসিনোতেই খেলা হোক; সবই বেআইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ। আর ক্লাবের খেলোয়াড়দের বেতন কোথা থেকে আসবে, কীভাবে ক্লাবগুলো চলবে, তা দেখার দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা প্রশাসনের নয়। ওটা ক্লাব ম্যানেজমেন্ট কমিটি দেখবে। অর্থের সংস্থান করতে গিয়ে অবৈধ পন্থা অবলম্বন নিশ্চয়ই সুবিবেচনাপ্রসূত কাজ নয়।
স্পোর্টিং ক্লাবগুলোতে ক্যাসিনোর মতো জুয়ার আসরের খবর দেশবাসীকে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে। বিশেষত যারা দেশের খেলাধুলা নিয়ে ভাবেন, তারা প্রকাশ করছেন চরম উদ্বেগ। খেলাধুলার মতো নির্মল আনন্দের জায়গায় জুয়ার মতো জঘন্য দুস্কর্মের জায়গা করে নেওয়া দেশের ক্রীড়ার জন্য অশনিসংকেত বলেই মনে করছেন তারা। এ ছাড়া নানা ফন্দি-ফিকিরে ক্লাবগুলোর ব্যবস্থাপনার কর্তৃত্ব সমাজের প্রশ্নবিদ্ধ লোকদের হাতে চলে যাওয়ার বিষয়টিও জনমনে দুশ্চিন্তার জন্ম দিয়েছে। যদি এভাবেই চলতে থাকে, তাহলে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে যে ভয়াবহ ধস নামবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
স্পোর্টিং ক্লাবগুলোতে ক্যাসিনোর সমারোহের খবর শুনে এক রসিকজন মন্তব্য করলেন, 'আরে ভাই, এ নিয়ে এত্তো হৈচৈ করার কী আছে? ক্যাসিনোও তো একটি খেলা। ক্লাবগুলোর কর্তাব্যক্তিরা হয়তো সে খেলাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তাতে ক্লাব বা খেলার কোনো উন্নতি না হোক, তাদের বিত্ত-বেসাত তো আকাশচুম্বী হয়েছে। এটাই-বা কম কিসে!
সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক
- বিষয় :
- ক্রীড়াজগৎ
- মহিউদ্দিন খান মোহন
