বুদ্ধিজীবী হত্যা-৩
মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী বললেন, 'মঈনুদ্দীন তুমি!'
বিচারপতি ওবায়দুল হাসান
প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৪:২০
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বজনশ্রদ্ধেয় অধ্যাপকরা ষাটের দশক থেকেই স্বাধিকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামের বুদ্ধিবৃত্তিক পটভূমি তৈরি করেছেন। তাই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তার দোসররা মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই তাদের নিশানা করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগটি প্রমাণ করার জন্য ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিনের ভাগ্নি মাছুদা বানু রত্না। তিনি বলেন:'১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল ১৭ বছর। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে প্রথম বর্ষ সম্মান শ্রেণির ছাত্রী ছিলাম। ওই সময় আমি আমার মামা শহীদ অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন আহমদের নীলক্ষেতস্থ বাসায় থেকে লেখাপড়া করতাম। আমার মামা শহীদ গিয়াস উদ্দিন আহমদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ছিলেন; পাশাপাশি হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের হাউস টিউটর ছিলেন। ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১ মুহসীন হলে সাপ্লাইয়ের কোনো পানি ছিল না- এ খবর পেয়ে সকাল সাড়ে ৭টা বা পৌনে ৮টার দিকে আমার মামা অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন স্লিপিং স্যুটের শার্ট এবং লুঙ্গি পরে মুহসীন হলে পানির পাম্পের কাছে যান। আনুমানিক সকাল ৮টার দিকে ইপিআরটিসির একটি মিনিবাস বাসার সামনে এসে থামে। সেই বাস থেকে দু'জন নেমে দোতলায় উঠে আসে যেখানে আমার মামা ও আমরা থাকতাম। তারা দোতলায় এসে দরজায় কড়া নাড়ে। যে দু'জন আমার মামার বাসায় সশস্ত্র অবস্থায় মামাকে খুঁজতে গিয়েছিল এবং পরে মুহসীন হল এলাকা থেকে তাকে চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে যায়, এরা হলো আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মঈনুদ্দীন। এরা দু'জনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতা ছিল। যেহেতু আমি ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম, সে কারণে এদেরকে চিনতাম। এরা দু'জনই মুহসীন হলের আবাসিক ছাত্র ছিল।
১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসের ৫ তারিখে আমার বড় খালু আবদুল মোমেন খান (সাবেক খাদ্য সচিব, খাদ্যমন্ত্রী) খবর পেয়ে মিরপুরের বধ্যভূমিতে যান এবং আমার মামার পরিধেয় বস্ত্রাদি দেখে মামার গলিত লাশ শনাক্ত করেন। পরিধেয় বস্ত্রাদিসহ গলিত বিকৃত লাশ ওখান থেকে তুলে এনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে অন্যান্য বুদ্ধিজীবীর কবরের পাশে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাফন করা হয়।' এই সাক্ষীর সাক্ষ্য বলে দেয়, কুখ্যাত আলবদর আশরাফুজ্জামান ও মঈনুদ্দীন ছিল বুদ্ধিজীবী নিধন মিশনের মূল কারিগর।
শহীদ ড. সিরাজুল হক খানের ছেলে ড. এনামুল হক খানের সাক্ষ্যের অংশ :'আমি বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর সকাল আনুমানিক সাড়ে ৮টা কি পৌনে ৯টা; তখন একটি ইপিআরটিসির কাদামাখা মিনিবাস আমাদের বাসার সামনে এসে থামে। ওই মিনিবাস থেকে সশস্ত্র ৫-৭ জন নেমে এসে আমাদের চারতলার ফ্ল্যাটের কলিংবেল টেপে। আওয়াজ পেয়ে আমার ছোট চাচা দরজা খুলে দিলেন; আমি তার পেছনেই ছিলাম। একজন জানতে চেয়েছিল, আমার পিতা ড. সিরাজুল হক খান কোথায় বা এটি তার বাসা কি-না। আমি পেছন থেকে লক্ষ্য করছিলাম। আমার ছোট চাচা একটু কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে জানিয়েছিলেন, আমার বাবা নিচতলায় অধ্যাপক ইসমাইলের বাসায় গেছেন। আগন্তুকরা নিচতলায় অধ্যাপক ইসমাইলের বাসায় যায় (১৬ নং বিল্ডিংয়ের পশ্চিম পাশে)। বারান্দা থেকে আমি, আমার চাচা দাঁড়িয়ে দেখছিলাম আমার বাবাকে ইসমাইলের বাসা থেকে আগন্তুকরা বের করে আনে। আমার বাবার পকেটে রুমাল ছিল। সেই রুমাল দিয়ে তার চোখ বেঁধে ইপিআরটিসির মিনিবাসে উঠিয়ে নিয়ে যেতে দেখেছি।
১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ বিকেলে পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের পর আমি বন্ধুবান্ধব ও বাবার সহকর্মীদের নিয়ে বাবা ও তার অপহৃত সহকর্মীদের খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করি। ১৬ ডিসেম্বর থেকে প্রায় দুই সপ্তাহ ঢাকার আশপাশের সব বধ্যভূমিতে বাবার লাশ খুঁজি। নদীতে ভেসে যাওয়া লাশের মধ্যেও আমার বাবার লাশ খোঁজার চেষ্ট করি। কিন্তু কোথাও পাইনি। আমি নিজ হাতে অগণিত গলিত, বিকৃত লাশ নেড়েছি। হাতে মৃত মানুষের গন্ধ লেগে থাকত। কিন্তু আমার মনে হতো, এই গন্ধটি আমার বাবার লাশের গন্ধ (আবেগাপ্লুত সাক্ষী তার কান্না সংবরণের চেষ্টা করেন)। এক পর্যায়ে ১৯৭২-এর জানুয়ারির প্রথম দিকে এনএসআই কর্মকর্তা সামাদ তালুকদারের সহায়তায় যে মিনিবাসে আমার বাবা ও অন্যদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেই মিনিবাসের ড্রাইভার মফিজ উদ্দিনকে আমাদের বাসায় আনা হয় তার কাছ থেকে শোনার জন্য আমার বাবাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমার বাবা ও অন্যদের মিরপুর মাজার রোড দিয়ে নিয়ে (বর্তমানে যেখানে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে) তাদেরকে আশরাফুজ্জামান খান নিজ হাতে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে বলে মফিজ উদ্দিন আমাদের জানিয়েছিল। এর পর সম্ভবত ৪ জানুয়ারি, ১৯৭২ সামাদ তালুকদার, তৎকালীন ওসি মিরপুর থানা, একজন ভারতীয় সামরিক কর্মকর্তা, কিছু সিপাহি, একজন ম্যাজিস্ট্রেটের তত্ত্বাবধানে মফিজ ড্রাইভারের দেখানো মতে আমার বাবা ও অন্যদের গলিত কঙ্কালসার লাশ গর্ত থেকে তোলা হয়। এ সময় আমি, অন্যান্য শহীদ পরিবারের সদস্য সেখানে ছিলাম। আমি আমার বাবার কোমরের বেল্ট, পরিহিত গ্যাবার্ডিনের প্যান্ট, পকেটে থাকা পরিচয়পত্র দেখে তার লাশ শনাক্ত করি।'
ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানের সাক্ষ্যের অংশ :"আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক। ১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল ভারতের আগরতলা এবং ১৫ মে এখান থেকে সপরিবারে কলকাতায় গিয়ে পৌঁছি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কলকাতা থাকা অবস্থায় ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর তারিখে বুদ্ধিজীবী হত্যার বিষয়ে সংবাদপত্রের মাধ্যমে প্রথমে জানতে পারি। ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি আমি সপরিবারে ঢাকায় ফিরে আসি। ৯ জানুয়ারি আমার দু'জন শহীদ শিক্ষক মুনীর চৌধুরী ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর পরিবারের সঙ্গে তাদের বাড়িতে গিয়ে সাক্ষাৎ করি। সেই সময় শহীদ অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর স্ত্রী সৈয়দা মনোয়ারা চৌধুরী আমাকে বলেন, 'আপনাদের ছাত্ররাই আপনার স্যারকে (মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী) নিয়ে গেছে।' আমি শহীদ অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর ছোট ভাই অধ্যাপক লুৎফুল হায়দার চৌধুরীর কাছ থেকে জানতে পারি, ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর তাঁর (অধ্যাপক লুৎফুল হায়দার চৌধুরী) বাসা থেকে অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকে মুখে রুমাল বাঁধা অবস্থায় কয়েকজন যুবক ধরে নিয়ে যায়। এই যুবকদের মধ্যে যে সামনে ছিল, এক পর্যায়ে তার মুখের রুমাল খুলে যায়। তখন মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী তাকে বলেন, 'মঈনুদ্দীন তুমি!' সে আবার মুখে রুমাল বাঁধতে বাঁধতে বলে, 'জি, আপনি আমার সঙ্গে যাবেন; কোনো ভয় নেই।' এই মঈনুদ্দীন তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের ছাত্র এবং দৈনিক পূর্বদেশে কর্মরত স্টাফ রিপোর্টার 'চৌধুরী মঈনুদ্দীন'। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে আমিও তাকে ১৯৬৯ সালে অল্প দিনের জন্য ছাত্র হিসেবে পেয়েছিলাম। চৌধুরী মঈনুদ্দীন এবং তার সঙ্গীরা অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকে নিয়ে যাবার পর তিনি আর ফিরে আসেননি।
সংবাদপত্র থেকে প্রকাশিত সূত্র থেকে এবং নানা সময়ে উদ্ধার হওয়া দলিলপত্র থেকে জানা যায়, ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক বুদ্ধিজীবীদের হত্যার একটি পরিকল্পনা করা হয়। ডিসেম্বর মাসে আলবদর বাহিনী এ পরিকল্পনা কার্যকর করতে শুরু করে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা এবং এইভাবে বংলাদেশকে মেধাশূন্য করা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, আইনজীবী আলবদর বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন।"
শহীদ ড. আবুল খায়েরের পুত্র সাক্ষী রাশেদুল ইসলামের সাক্ষ্যের অংশ :'১৯৭১ সালে আমার বয়স ছিল ৬ বছর। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর সকাল আনুমানিক ৯টায় আমার পিতা ড. আবুল খায়ের হাঁটার জন্য আমাদের বাড়ির বাইরে বের হন। তিনি যখন বাড়ির গেটের বাইরে হাঁটছিলেন তখন অজ্ঞাতনামা ৪-৫ যুবক আমার বাবাকে জিজ্ঞেস করে, আপনি কি ড. আবুল খায়ের? বাবা উত্তরে বলেছিলেন, আমি ড. আবুল খায়ের। এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে আগত যুবকরা বাবাকে তাঁর গায়ে থাকা চাদর দিয়ে চোখ বেঁধে ফেলে এবং গেটের বাইরে অবস্থানরত কাদামাখা মিনিবাসে জোর করে উঠিয়ে নেয়। ওই সময় আমি আমাদের বাড়ির বারান্দায় খেলছিলাম। এই অপহরণের ঘটনাটি আমি বারান্দা থেকে প্রত্যক্ষ করি। বাবাকে জোর করে গাড়িতে তোলার ঘটনাটি দেখে আমি দৌড়ে মায়ের কাছে এসে ঘটনাটি বলি। আমার মা তৎক্ষণাৎ ছুটে এসে বাবাকে ওই যুবকদের কাছ থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে যুবকরা অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি করার ভয় দেখায় এবং আমার বাবাকে তারা গাড়িতে নিয়ে চলে যায়। তখন আমার মা কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় গেটের সামনে দাঁড়িয়ে এই চলে যাওয়ার দৃশ্যটি দেখছিলেন। ১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি কাদামাখা যে মিনিবাসে আমার বাবাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তার ড্রাইভারকে আমাদের বাসায় ধরে নিয়ে আসা হয়। ওই ড্রাইভারের নাম মফিজ। মফিজ জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছিল, মিরপুর বধ্যভূমিতে বেশ কিছু বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করে লাশ ফেলে রাখা হয়েছিল। এ খবরে আমার মামা ও চাচাত ভাই ওইদিনই মিরপুর বধ্যভূমিতে গিয়ে আমার বাবার লাশের সন্ধান করেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর গলিত-অর্ধগলিত অনেক লাশের মধ্যে আমার বাবার চাদর দেখে (যা দিয়ে বাবার চোখ বাঁধা ছিল) তাঁর বিকৃত লাশ শনাক্ত করা হয়। তারা আমার বাবার সেই গলিত লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে নিয়ে আসে। সেখান থেকে লাশের ময়নাতদন্ত শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে জানাজার পর কবরস্থানে দাফন করা হয়।'
আসিফ মুনিরের (শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর পুত্র) সাক্ষ্যের অংশ :"আমার নাম আসিফ মুনীর ওরফে তন্ময়, পিতা শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী। ১৯৭১ সালে আমি ৪ বছরের শিশু ছিলাম। আমার বড় ভাই ভাষণ মুক্তিযোদ্ধা। ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে ২০, সেন্ট্রাল রোড, ঢাকার বাসা থেকে আমার বাবা অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীকে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা ধরে নিয়ে যায়। বাবা তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। তিনি একাধারে নাট্যকার, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, ভাষাতত্ত্ববিদ ও শিক্ষক ছিলেন। তবে তিনি নাট্যকার হিসেবেই সমধিক পরিচিত। তাঁর সবচেয়ে বহুল প্রচারিত নাটক 'কবর', যা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত। এ ছাড়া তাঁর লেখা 'রক্তাক্ত প্রান্তর' কলেজ পর্যায়ে পাঠ্য ছিল। ভাষাতত্ত্ববিদ হিসেবে তাঁর অবদান বাংলা ব্যাকরণ বই রচনার ক্ষেত্রে এবং বাংলা টাইপ রাইটারের কি-বোর্ড মুনীর অপটিমা তৈরির ক্ষেত্রে অপরিসীম। ১৯৫০-এর দশক থেকেই আমার বাবা বাম রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে কাজ করার জন্য তাঁকে জেল খাটতে হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৫৩ সালে তিনি জেলে বসে 'কবর' নাটকটি রচনা করেছিলেন। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে আমার বাবার ধারণা হয়, দেশ স্বাধীন হতে চলেছে। এ বিষয়ে তিনি পরিবারের সবার সঙ্গে আলোচনা করতেন। পরিবার থেকে বিভিন্ন সময় আমার বাবাকে নিরাপত্তার স্বার্থে বাসা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার উপদেশ দেওয়া হলেও তিনি তার মাকে ছেড়ে যেতে না চাওয়ায় সেখানেই অবস্থান করেন। এক পর্যায়ে ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১ বেলা ১টার দিকে যখন আমার বাবা মধ্যাহ্নভোজের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, বাড়ির সদস্যরা লোহার গেটে ঝনঝনানির শব্দ পান। তখন দোতলা থেকে জানালার পর্দা সরিয়ে আমার মা একটি মিনিবাস দেখতে পান, যার জানালাতে কাদা লাগানো ছিল এবং ছাদটি গাছের ডালপালা দিয়ে ঢাকা ছিল। আমার মা ওই মিনিবাস থেকে ৩-৪ জন তরুণকে নামতে দেখেন। বাড়িতে অবস্থানরত আমার চাচা শমসের চৌধুরী ওরফে রুশো দোতলা থেকে নিচে নেমে গেটের দিকে এগিয়ে যান। তরুণদের মধ্য থেকে একজন তাকে জিজ্ঞেস করে, 'আপনি কি মুনীর চৌধুরী?' তখন রুশো কাকা উত্তরে বলেন, মুনীর চৌধুরী আমার বড় ভাই। তখন ওই তরুণরা আমার কাকাকে বলে, আপনি একটু মুনীর চৌধুরীকে ডেকে দিন। আমার কাকা বাসার দোতলায় গিয়ে বাবাকে খবর দিলে তিনি লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরিহিত অবস্থায় কাকাকে নিয়ে নিচে নেমে আসেন। আমার মেজো ভাই মিশুক মুনীর রুশো কাকার অনুরোধে গেটের তালার চাবিটি নিচে দিয়ে যায় এবং ওপরে গিয়ে বারান্দা থেকে লুকিয়ে পুরো দৃশ্যটি দেখে। মা আমার বাবাকে নিচে যেতে নিষেধ করেছিলেন। উত্তরে বাবা বলেছিলেন, যাই দেখি ওরা কী বলে। রুশো কাকা এবং বাবার পিছে পিছে আমার মা-ও নিচে নেমে আসেন।
কাকা গেটের তালা খুলে দেন। বাবা আগত ৩/৪ যুবককে জিজ্ঞাসা করেন, 'তোমরা কী চাও?' তারা বলে, 'স্যার, আপনাকে একটু আমাদের সাথে যেতে হবে।' তখন বাবা একটু উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, 'তোমাদের কাছে কি কোনো ওয়ারেন্ট আছে?' জবাবে একজন বলে, 'আছে'। তাদের একজন বাবার পেছনে এসে বন্দুক ধরে। তখন বাবা রুশো কাকার দিকে তাকিয়ে শুধু বলেছিলেন, 'রুশো, তাহলে যাই।' বাবা লক্ষ্য করেননি, পেছন থেকে আমার মা এসব দৃশ্য দেখছিলেন। ওই তরুণরা বাবাকে ঠেলে গাড়ির দিকে নিয়ে যায়। বাবাকে সেই আমাদের শেষ দেখা। আমি তখন শিশু। আমাকে তখন ঘরের ভেতরে রাখা হয়েছিল। সেই থেকে তাঁর কোনো সন্ধান পাইনি। ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১-এর পর আমরা শুনতে পেলাম, মিরপুর ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে অনেক বুদ্ধিজীবীর লাশ পড়ে আছে। তখন রুশো কাকা এবং আমার বড় কাকা অধ্যাপক কবীর চৌধুরী রায়েরবাজারে আমার বাবাকে খুঁজতে যান। সেখানে পড়ে থাকা বিকৃত, আধা-বিকৃত বুদ্ধিজীবীদের লাশের মধ্যে আমার বাবার লাশ শনাক্ত করতে পারেননি।"
