'বাবার বুকে কত রক্ত'
প্রতীকী ছবি
বিচারপতি ওবায়দুল হাসান
প্রকাশ: ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৪:২১
যুদ্ধক্ষেত্রেও বিপক্ষের চিকিৎসকরা বিশেষ মর্যাদা পান। যত বর্বর বাহিনীই হোক না কেন, চিকিৎসক পরিচয় পেলে হত্যা করে না। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা বর্বরতার সেই সীমাও লঙ্ঘন করেছিল একাত্তরে। তারা এদেশের খ্যাতিমান চিকিৎসকদের বাসা থেকে ধরে এনে হত্যা করেছে।
শহীদ চিকিৎসকদের মধ্যে ডা. ফজলে রাব্বীর অপহরণ ও হত্যা মামলায় ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন তাঁর কন্যা ড. নুসরাত রাব্বী। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। ১৯৭১ সালে তাঁর বয়স ছিল ৮-৯ বছর। যৌক্তিক কারণে এই সাক্ষীকে তাঁর সাক্ষ্য অসমাপ্ত রেখে ফিরে যেতে হয়েছিল আমেরিকায়।
'আমার বাবা শহীদ ডাক্তার ফজলে রাব্বীকে ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে আনুমানিক বিকেল ৩টার সময় আলবদর বাহিনীর সদস্যরা বাসা থেকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। ১৮ ডিসেম্বর এক সাংবাদিকের মাধ্যমে জানতে পারি, আমার বাবাকে অপহরণকারীরা রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। ... ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ আনুমানিক ৩টার দিকে আলবদররা আমাদের বাসা ঘেরাও করে ফেলে এবং বাসার সামনে একটি কাদা মাখানো মাইক্রোবাস এসে থামে। পরে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত চৌধুরী মঈনুদ্দীন এবং আশরাফুজ্জামান খানের ছবি দেখে বুঝতে পেরেছিলাম, এরাই ১৩ ডিসেম্বর আমাদের বাসায় এসেছিল এবং তারাই ১৫ ডিসেম্বর বাবাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়।'
শহীদ ডাক্তার মর্তুজার স্ত্রীর ভাই ওমর হায়াতের সাক্ষ্যের অংশ :'১৪ ও ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ ঢাকা শহরে কারফিউ চলছিল। ১৬ ডিসেম্বর আমার বোনের কাছ থেকে খবর পাই, তার মেয়ের শাড়ি দিয়ে তার স্বামী ডাক্তার মর্তুজাকে অপহরণকারীরা চোখ বেঁধে নিয়ে কাদামাখা একটি বাসে ওঠায়। এর পর তিনি আর ফিরে আসেননি। সামাদ নামে একজন পুলিশ অফিসার মফিজ নামে একজন ড্রাইভারকে সঙ্গে নিয়ে এসে বেশ কয়েক দিন পর আমার বোনকে জানান, মিরপুর মাজারের পেছনে একটি জায়গায় কিছু মৃতদেহ পড়ে আছে। আমি ৪ জানুয়ারি ১৯৭২ আমার বোনের বাসায় উপস্থিত হই। সেখান থেকে মিত্রবাহিনীর একজন মেজর, পুলিশ কর্মকর্তা সামাদ, ড. সিরাজুল হক খানের ছেলে এনামুল হক খান এবং ড্রাইভার মফিজসহ আমরা মাজার শরিফের পেছনে একটি জায়গায় যাই। ড্রাইভার মফিজের দেখানো মতে, একটি জায়গায় মাটি সরিয়ে বেশ কিছু লাশ দেখতে পাওয়া যায়। ডাক্তার মর্তুজার চোখ তাঁর মেয়ের শাড়ি দিয়ে বাধা ছিল এবং এক পায়ে পাম্পশু পরা ছিল। ড্রাইভার মফিজের মুখেই শুনতে পাই, জনৈক মঈনুদ্দীন এই অপহরণের ঘটনায় জড়িত ছিল এবং জনৈক আশরাফুজ্জামান ব্রাশফায়ার করে বুদ্ধিজীবীদের এখানেই হত্যা করে।
ডাক্তার মর্তুজার লাশসহ অন্যান্য বুদ্ধিজীবীর লাশ গর্ত থেকে উত্তোলনের পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকে তাদের লাশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে এনে জানাজা পড়ানো হয় এবং মসজিদের পাশের গোরস্তানে তাদেরকে সমাহিত করা হয়। আমার বোন সায়িদা মর্তুজা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ছেলের সঙ্গে অবস্থান করছেন।'

ডা. আলীম চৌধুরীর অপহরণ ও হত্যা মামলার অভিযোগ প্রমাণ করতে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য প্রদান করেন তার কন্যা ডা. ফারজানা চৌধুরী নীপা। তিনি পেশায় একজন চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ। ১৯৭১ সালে তাঁর বয়স ছিল ৩ বছর। ডা. ফারজানা চৌধুরী নীপা বলেন, "আমার পিতা শহীদ ডা. আলীম চৌধুরী পেশায় ছিলেন চক্ষু বিশেষজ্ঞ। তিনি ছাত্রাবস্থা থেকেই ভাষা আন্দোলনসহ প্রগতিশীল সব আন্দোলন এবং দেশের স্বাধিকার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯৭১ সালে আমার বাবা আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য শহীদ ডা. ফজলে রাব্বীসহ অন্য চিকিৎসকদের নিয়ে একটি গোপন হাসপাতাল পরিচালনা করতেন এবং তারা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ওষুধ সরবরাহ করতেন; আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যার্থে আর্থিক সহায়তা প্রদান করতেন। ১৯৭১ সালে আমরা পুরানা পল্টনের একটি ভাড়া বাসায় থাকতাম। সেখানে আমি আমার মা-বাবা এবং ছোট বোন ডাক্তার নুজহাত চৌধুরী সম্পাসহ বসবাস করতাম। আমি তখন ৩ বছরের শিশু; আমার ছোট বোনের বয়স ছিল তখন ২ বছর। আমার মা ছাড়াও নানি ও বাবার দুই সহকারী হাকিম ভাই ও মোমিন ভাই আমার পিতার অপহরণের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তাদের কাছ থেকে আমি বাবাকে অপহরণের ঘটনার বিস্তারিত শুনেছি। যা জেনেছি তা হলো, ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ বিকেল আনুমানিক ৪টায় আমার বাবা দোতলার বারান্দায় বসে ছিলেন। মা-ও কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ঠিক এই সময় বাড়ির সামনে একটি কাদা মাখানো মাইক্রোবাস এসে থামে। সেই মাইক্রোবাস থেকে দুইজন সশস্ত্র ঘাতক আমাদের বাড়ির নিচতলায় আসে, যেখানে থাকতেন আলবদর অর্গানাইজার তথাকথিত মাওলানা আবদুল মান্নান (পরে মন্ত্রী)। সেখানে ঘাতকরা ২০-৩০ মিনিট থাকার পর দোতলায় এসে আমাদের দরজায় সজোরে লাথি দিয়ে দরজা খোলার জন্য হাঁকডাক করতে থাকে।
দোতলা থেকে নিচতলায় নামার জন্য ভেতর দিক থেকে একটি সিঁড়ি ছিল। সেই সিঁড়ি দিয়ে আমার বাবা নিচতলায় নেমে মাওলানা মান্নানের বাসার দরজায় কড়া নাড়েন। মাওলানা মান্নান দরজা খোলেননি। ভেতর থেকেই তিনি বলেছিলেন, 'আমি আছি, আপনি যান।' ওপরে চলে এসে তিনি দেখেন, ঘাতকরা বাসার ভেতরে ঢুকে গেছে। বাবাকে দেখেই ঘাতকরা পরিস্কার বাংলায় বলে, 'আপনাকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।' বাবা জিজ্ঞেস করেন, কোথায় যেতে হবে। প্রত্যুত্তরে তারা বলে, গেলেই জানতে পারবেন। ঘাতকরা বাবাকে চোখ, হাত বেঁধে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে নিয়ে যায়।
মাইক্রোবাস ছেড়ে যাওয়ার আগেই মা বিচলিত অবস্থায় নিচতলায় মাওলানা মান্নানের বাসার দরজায় গিয়ে জানতে চান- আমার বাবাকে কারা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। মাওলানা মান্নান বাসার ভেতর থেকে বলেন, 'ঘাবড়াবেন না; আমার আলবদরের ছাত্ররা তাকে নিয়ে যাচ্ছে।' তিনি আরও বলেন, ওরা তো ডা. রাব্বীকেও নিয়ে গেছে। মা তখন জানতে চান, কোথায় নেওয়া হচ্ছে, কেনই-বা নেওয়া হচ্ছে। উত্তরে মাওলানা মান্নান বলেন, যুদ্ধাহতদের চিকিৎসার জন্য তাকে সিএমএইচে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এর পর থেকে বাবার আর কোনো খোঁজ আমরা পাইনি।
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সকাল থেকেই চারদিকে জয় বাংলা স্লোগান হচ্ছিল। মা অপেক্ষা করছিলেন বাবা ফিরে এলে নামিয়ে ফেলা বাংলাদেশের পতাকাটি আবারও ওড়াবেন। মায়ের সে অপেক্ষা আর শেষ হয়নি। ১৬ ডিসেম্বর সকাল ১০-১১টার দিকে একজন মুক্তিযোদ্ধা আমাদের বাসায় এসে বাসার সবাইকে লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করছিলেন, 'সেই শয়তানটা কোথায়, যে আলীম ভাইকে মেরেছে?' তখনই বাসার সবাই বুঝতে পারে, আমার বাবাকে হত্যা করা হয়েছে। ১৮ ডিসেম্বর বেলা ১১-১২টার দিকে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে বাবার ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া যায় (সাক্ষী এ সময় অঝোরে কাঁদছিলেন)।
বাবার লাশ উদ্ধারের পর দেখা যায়, তার মাথায়, বুকে এবং শরীরের অন্যান্য জায়গায় বেয়নেটের আঘাতের চিহ্ন ছিল। আমি একটু বড় ছিলাম বিধায় আমাকে লাশ দেখানো হয়নি। আমার ছোট বোন তখন বাবার লাশ দেখে আধো আধোভাবে বলেছিল, 'বাবার বুকে কত রক্ত! বাবা আর আসবে না।' ১৮ ডিসেম্বর সম্ভবত বিকেলবেলা আজিমপুর পুরনো কবরস্থানে আমার বাবাকে দাফন করা হয়।"
শহীদের সন্তান ফারজানা চৌধুরী নিপার সাক্ষ্য থেকে উঠে আসে, মাওলানা মান্নান তাদের নিচতলার বাসিন্দা ছিলেন। তিনি জানতেন ডা. আলীম চৌধুরীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাটি। তিনি জুগিয়েছিলেন সমর্থন। জাতির দুর্ভাগ্য ও চরম লজ্জার যে, এই লোকটিকে পরে মন্ত্রী করা হয়েছিল। শহীদ ডা. আলীম চৌধুরী তাঁর পেশাগত জ্ঞান ও আদর্শ মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এবং সর্বোপরি দেশমাতৃকার জন্য উৎসর্গ করেছেন। এই সাক্ষী ও তাঁর ছোট বোন শুধু একজন পিতাকে হারাননি। তাঁরা হারিয়েছেন পিতার স্নেহ ও আদর। তাদের নিরন্তর কান্না মানবতাকেও করে শোকাচ্ছন্ন। জাতি শহীদ ডা. আলীম চৌধুরী ও তাঁর পরিবারের জন্য গর্ব করে। শত প্রতিকূলতায় তাঁরা নিজেদের পিতৃআদর্শে গড়ে তুলেছেন।
