ইতিহাস বিকৃতি থেকে সরে আসুক বিএনপি
মইনুল ইসলাম
প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:১২
জাতি গত ১৬ ডিসেম্বর ৪৮তম বিজয় দিবস পালন করেছে। ইন্টারনেটে বাংলাদেশের
পত্রপত্রিকা পড়তে গিয়ে দেখলাম, বিএনপি এখন দাবি করছে- ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ
চট্টগ্রাম বেতার থেকে মেজর জিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। আর
কতদিন এই মিথ্যাচার চালিয়ে যাবেন? ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল ভারতের একটি রেডিও
স্টেশন থেকে তাজউদ্দীন আহমদের কণ্ঠে প্রচারিত 'বাংলাদেশের স্বাধীনতার
ঘোষণাপত্রে' সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে ওই ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে (তখন
ঘোষণা নিয়ে বিতর্কের জন্মও হয়নি)। যেহেতু স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রই বাংলাদেশ
রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভিত্তি, তাই ওটাকে অস্বীকার করলে বিএনপি বাংলাদেশে
কীভাবে রাজনীতি করার অধিকার পাচ্ছে? ২৬ মার্চ দুপুরে এমএ হান্নান প্রথমবার
এবং সন্ধ্যায় আবুল কাশেম সন্দ্বীপ দু'দুবার বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি
চট্টগ্রাম রেডিও থেকে পাঠ করেছিলেন। ২৭ মার্চ ১৯৭১ তারিখের সন্ধ্যায় মেজর
জিয়ার ঘোষণা নিজের কানেই শুনেছি। তাই আমরা বিএনপির ২৬ মার্চ সংক্রান্ত এই
নির্জলা মিথ্যাকে আজীবন ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে যাব। এই বানোয়াট বয়ানটি
বিশেষভাবে ঘৃণ্য এ জন্য যে, জিয়া তার জীবদ্দশায় কখনও দাবি করেননি, তিনি ২৬
মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ চট্টগ্রামের ষোলশহর থেকে একটি আর্মি কনভয়সহ জিয়াউর
রহমানকে পাঠানো হয়েছিল চট্টগ্রাম বন্দরে অস্ত্রবাহী জাহাজ 'সোয়াত' থেকে
অস্ত্র খালাসে প্রতিরোধ সৃষ্টিকারী জনগণকে শায়েস্তা করার দায়িত্ব দিয়ে।
ঢাকার গণহত্যার খবর পেয়ে ওখান থেকে তার সহকর্মীরা তাকে ফিরিয়ে এনেছিলেন।
তারা ষোলশহরে ফিরে এসে অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের সব পাকিস্তানি অফিসারকে
হত্যার পর অস্ত্রশস্ত্র ও যানবাহনসহ পশ্চাদপসরণ করে ২৬ মার্চ সকালে
কালুরঘাট সেতু পার হয়ে বোয়ালখালীতে অবস্থান নেন। ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের
'স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রে'র সংগঠকদের অনুরোধে জিয়া
বেতারকেন্দ্রে এলেন কেন্দ্রের নিরাপত্তা বিধানের জন্য। বিকেলে বেতার
কেন্দ্রের সংগঠকরা তাকে রাজি করালেন একজন 'আর্মি মেজরের' কণ্ঠে বাংলাদেশের
স্বাধীনতার একটি ঘোষণা দেওয়ার জন্য, যাতে ইতোমধ্যেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে
বিচ্ছিন্নভাবে শুরু হয়ে যাওয়া মুক্তিযুদ্ধের সেনানীরা উদ্দীপ্ত ও ঐক্যবদ্ধ
হয়। ২৭ মার্চ ১৯৭১-এর সন্ধ্যায় জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণার পটভূমি ছিল এটাই।
অথচ দেখুন, বিএনপি কীভাবে ১৯৭১ সালের ২৫-২৬ মার্চের মুক্তিযুদ্ধের শুরুর
পর্বের মূল সত্যগুলোকে অস্বীকার করে যাচ্ছে। ২৫ মার্চ ১৯৭১ তারিখ সন্ধ্যায়
যখন বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন যে, রাতেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী আক্রমণ
চালাবে, তখন তিনি ও আওয়ামী লীগ হাইকমান্ড যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন,
যার অংশ হিসেবে ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধুর প্রতিবেশী পরবর্তীকালে বিএনপির
মন্ত্রী মোশাররফ হোসেনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম আর
সিদ্দিকীকে বঙ্গবন্ধু নির্দেশ পাঠিয়েছিলেন, চট্টগ্রাম শহরে যেন আওয়ামী লীগ
নেতাকর্মীরা স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছে মর্মে মাইকিং শুরু করে দেন। জনাব
মোশাররফ নিজের জবানিতে বঙ্গবন্ধুর ওই নির্দেশের কথা স্বীকার করেছেন
একাধিকবার। নির্দেশ পেয়ে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতারা রাত ৯টা থেকেই শহরে
ব্যাপক মাইকিং করেছিলেন। একই সঙ্গে নেতারা তদানীন্তন ইপিআরের ক্যাপ্টেন
রফিকের মাধ্যমে চট্টগ্রামের ইপিআর ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
ক্যাপ্টেন রফিক চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সব ইপিআর সীমান্ত চৌকিতে
ওয়্যারলেসে যোগাযোগ করে চৌকির নিয়ন্ত্রণ বাঙালি ইপিআর সেনাদের দখলে নেওয়ার
ব্যবস্থা করেন এবং শহরে আর্মি ক্যান্টনমেন্ট ও নেভাল বেইজ থেকে আক্রমণ
ঠেকানোর জন্য প্রতিরক্ষা অবস্থান নিয়ে ফেলেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ শেষ রাতে
চট্টগ্রামের শহরতলির সিলিমপুরে অবস্থিত ওয়্যারলেস স্টেশনের জনৈক অপারেটর
টেলিফোনে চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি জহুর আহমদ চৌধুরীকে বঙ্গবন্ধুর
স্বাধীনতার ঘোষণা সংক্রান্ত একটি ওয়্যারলেস মেসেজ দেওয়ার জন্য যোগাযোগ
করার চেষ্টা করলে তিনি বাসায় নেই জানতে পেরে ডা. নুরুন্নাহার জহুরকে ওই
মেসেজটি ডিকটেট করেন। ওই ডিকটেটেড মেসেজটি ডা. নুরুন্নাহার জহুর আওয়ামী লীগ
অফিসে পৌঁছে দেন। ওখানে সমবেত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মেসেজটি
সাইক্লোস্টাইল করে প্রচারের সিদ্ধান্ত নেন। ২৬ মার্চ ভোর থেকেই আওয়ামী
লীগের কর্মীরা ঘোষণাটি শহরে প্রচারের পাশাপাশি সড়কের পথচারীদের ওই লিফলেট
বিলি করেছেন। চট্টগ্রাম নগরীর আন্দরকিল্লার নজির আহমদ চৌধুরী রোডে সকাল
সাড়ে ৮টার দিকে আমাকেও ওই লিফলেটটি দেওয়া হয়েছে। ওই লিফলেটটি কি অকাট্য
প্রমাণ নয় যে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ শেষ রাতে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা
ওয়্যারলেস মেসেজ আকারে চট্টগ্রামে পৌঁছেছিল? অথচ বিএনপি এখনও বঙ্গবন্ধুর
২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণার অস্তিত্বই স্বীকার করছে না!
এখন
গবেষণায় প্রমাণিত যে, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অগোচরে কয়েকটি ওয়্যারলেস
মেসেজ নানা সূত্র থেকে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। ইপিআরের
ওয়্যারলেসের কাহিনি (সূত্র- শেখ হাসিনা), ওয়্যারলেস ইঞ্জিনিয়ার নুরুল হকের
কাহিনি (সূত্র- তাজউদ্দীনকন্যা শারমিন আহমদ ও বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী
হাজী গোলাম মোরশেদ), মগবাজার ওয়্যারলেস অফিসে মেসেজ পাঠানোর কাহিনি,
বুয়েটের আরেকজন ইঞ্জিনিয়ারের কাহিনি- এ রকম বেশ কয়েকটি প্রয়াসের সন্ধান
মিলেছে ইতোমধ্যে।
চট্টগ্রামের সাইক্লোস্টাইলে ছাপানো লিফলেটের বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ দুপুরে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার স্টেশন থেকে প্রথম
পাঠ করেছিলেন চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এমএ হান্নান। ২৬
মার্চ সন্ধ্যায় রেডিও থেকে আবুল কাশেম সন্দ্বীপ আরও দু'বার স্বাধীনতার
ঘোষণাটি পাঠ করেছিলেন, নিজের কানেই শুনেছি প্রতিবার। ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় যখন
মেজর জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছিলেন, সেটাও নিজের কানে শুনেছি।
প্রথমবার তিনি বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ঘোষণা না দেওয়ায় প্রবল প্রতিবাদের মুখে
ঘোষণাটি পরিবর্তন করে 'আওয়ার সুপ্রিম লিডার' বঙ্গবন্ধুর নামে সংশোধিত ঘোষণা
পাঠ করেছিলেন, সেটাও শুনেছি। এটাই তো সঠিক ইতিহাস। স্বীকার করতে দ্বিধা
নেই, মেজর জিয়ার ঘোষণার আগে হান্নান ও আবুল কাশেম সন্দ্বীপ ২৬ মার্চ
চট্টগ্রাম বেতার থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করলেও ২৭ মার্চের সন্ধ্যায় একজন
'আর্মি মেজরের' কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা শোনায় আমরা প্রবলভাবে উদ্দীপ্ত
হয়েছিলাম। কিন্তু ২৭ মার্চে দেওয়া ঘোষণাকে ২৬ মার্চে নিয়ে আসার এই
জ্ঞানপাপীসুলভ জবরদস্তি কেন? ২৭ মার্চ দেওয়া মেজর জিয়ার ঘোষণার গুরুত্বকে
কেউ লঘু করতে চাইলে সেটা সমীচীন হবে না; কিন্তু মেজর জিয়া নিজের জীবদ্দশায়
যেখানে ২৬ মার্চ ঘোষণা দিয়েছেন বলে কখনোই দাবি করেননি, সেখানে তার মৃত্যুর
পর খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারপারসন হয়ে এই বানোয়াট কাহিনির অবতারণা করলেন
কেন?
আর একটি ইতিহাস বিকৃতি একেবারেই ক্ষমার অযোগ্য। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে
বলা হয়েছিল, 'জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের' মাধ্যমে জাতিরাষ্ট্র
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৭৯ সালে জিয়ার আমলে গৃহীত সংবিধানের পঞ্চম
সংশোধনীতে এই মহাগুরুত্বপূর্ণ বাক্যাংশটি পরিবর্তন করে বলা হয়, 'জাতীয়
স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ
প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি।' এটা ভয়ংকর ইতিহাস-বিকৃতি। 'স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক
যুদ্ধ' বললে শুধু একাত্তর সালের ৯ মাসের যুদ্ধ বোঝায়; কিন্তু 'জাতীয়
মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রাম' বললে একাত্তরের ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধসহ
জাতীয় মুক্তির লক্ষ্যে অতীতের সব ঐতিহাসিক
আন্দোলন-সংগ্রাম-গণঅভ্যুত্থান-নির্বাচন-অসহযোগ আন্দোলনকে অন্তর্ভুক্ত করা
হয়।
বিএনপি জাতির মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের উল্লিখিত অধ্যায়গুলোকে যথাযোগ্য
মর্যাদায় এখনও পালন করে না; কিন্তু কেন? বিএনপির কাছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের
ভাষণের কোনো গুরুত্বই নেই। ওই ভাষণ ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত
রেডিও-টেলিভিশনে বাজানো পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল। সম্প্রতি জাতিসংঘের ইউনেস্কো
কর্তৃক ওই ভাষণকে মানব জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ঘোষণা ইতিহাস বিকৃতিকারীদের
এহেন ধৃষ্টতার প্রতি চরম চপেটাঘাত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাসের পাতা
থেকে মুছে ফেলার এই বিশ্ব ধিক্কৃত ধৃষ্টতা কি বিএনপি নেতাকর্মীরা এখনও
দেখিয়ে যাবেন? ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হতে না চাইলে স্বাধীনতার
ইতিহাস বিকৃতি থেকে বিএনপিকে সরে আসতেই হবে।
অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- রাজনীতি
- মইনুল ইসলাম

