বিদায়, সহপাঠী ও বন্ধু
কামাল লোহানী
প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৪:৫৫
সৃজনশীল প্রতিভার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে ফজলে হাসান আবেদ তৃণমূলের মানুষের চিন্তায় এক অনন্যসাধারণ স্বপ্নের পৃথিবী গড়ে গেছেন। কয়েকটি সংগঠনের সুসংগঠিত রূপ দিয়ে তিনি চিরতরে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তার স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান 'বাংলাদেশ রুরাল অ্যাডভান্সমেন্ট কমিটি' অর্থাৎ ব্র্যাক। তার কীর্তিধন্য এ সংগঠনটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অথবা এনজিওর রূপ নিয়ে আজ বিশ্বে বৃহত্তম প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে- এ তারই সপ্রতিভ নেতৃত্বের সুফলা ফসল। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্যার ফজলে হাসান আবেদ গ্রামীণ জনপদের তৃণমূলে পৌঁছে মানুষকে আপন প্রতিভায় বিকশিত করার নান্দনিক রূপকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। দুর্যোগে দুর্ভোগে মানুষের পাশে দাঁড়াবার সৃজনশীল মন নিয়ে গ্রামীণ জনপদে পৌঁছে গেছেন ফজলে হাসান আবেদ। আর শিক্ষাবিস্তার, স্বাস্থ্যসেবা, নারীর সমানাধিকার- এসব বিষয় তার প্রাজ্ঞ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এবং ছড়িয়ে গিয়েছিল সর্বত্র। ফজলে হাসান আবেদ নামে যে মানুষটি নিজে স্বপ্ন দেখেছিলেন, অন্যকে সৎ মানুষের জীবন গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, তিনি বহুদূরে চলে গেলেও তার প্রিয় অনুষদ বিরাট কর্মীবাহিনী তার সৃষ্ট 'স্বপ্নিল' পৃথিবীকে তার আদর্শ অনুসরণ করেই পরিচালনা করার চেষ্টা করবেন, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
বাংলাদেশের অনন্য প্রতিভা স্যার ফজলে হাসান আবেদ ২০ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখ, শুক্রবার ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুতে তার ভয় ছিল না, তাই তিরাশি বছর বয়সে হাসপাতালে শুয়ে নিজের বুদ্ধিমত্তার বিচারে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র হয়তো গ্রহণ করেছেন, কিন্তু তিনি তার শেষযাত্রার সময়টাকে দীর্ঘায়িত করতে চাননি। তিনি ভেবেছিলেন- আসুক মৃত্যু, তাকে তো আলিঙ্গন করতেই হবে, আজ না হোক কাল। এমনই এক সাহসী মানুষ ফজলে হাসান আবেদ তার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করেছেন। নেতৃত্বে তিনি থাকলেও তার পরীক্ষিত সেনাদল তারই হাতে গড়া কর্মীরা। ব্র্যাকে যারা 'চাকরি' করতেন, সবাই শুনেছি তার ভক্ত। আর সে কারণেই তারা তাদের কাজের প্রতি অনুগত। সুবিশাল এই 'মানুষের পৃথিবী' গড়ে তোলার কারিগর হিসেবে সবাইকে সিদ্ধহস্ত কর্মীতে পরিণত করেছিলেন ফজলে হাসান আবেদ তার গুণাবলি দিয়েই।
পঞ্চাশের দশকে ফজলে হাসান আবেদ পাবনা জেলা স্কুলের ছাত্র ছিলেন, আর আমি ছিলাম তার সহপাঠী। তার জীবন অবসানে আমি আমার স্কুল জীবনের শেষ বন্ধুটিকেও হারালাম। কিন্তু বড় কষ্টের, তাকে শেষবারের মতো দেখতে যেতে পারলাম না নিজের অসুস্থতার কারণে। এই তো ক'দিন আগে তার ব্যক্তিগত সহকারীকে টেলিফোন করে আবেদের শারীরিক অবস্থার কথা জিজ্ঞেস করে জেনেছিলাম, দীর্ঘদিনের অসুস্থ এই মহৎপ্রাণ ব্যক্তিটি প্রায় নিষ্প্রভ। কথা বলে বুঝলাম আদতেই তার চলে যাওয়ার সময় এসেছে। চোখের সামনে ভেসে উঠছে নিরাভরণ অথচ ধোপদুরস্ত চেহারাটা। মনে হচ্ছে জ্যোতির্ময় ওই চোখটা আমার দিকেই তাকিয়ে আছে, হয়তো অভিমানে। বলছে, 'কামাল, তুমি একবারও এলে না'। বন্ধু বিহনে বন্ধুর ব্যথা নীরবেই কেঁদে মরে। ১৯৫২-তে ম্যাট্রিক পরীক্ষা, তার দু'বছর আগে ফজলে হাসান আবেদ আমাদের অনেক সহপাঠীরই বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম আব্দুস সামাদ (সচিব, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়), ড. অধ্যাপক আবু হেনা মোস্তফা কামাল, কুতুব উদ্দীন আহমদ, জিয়া হায়দার প্রমুখ। আরও ছিলেন অনেকেই। তাদের মধ্যে অনেকেই আজ আর নেই। উইনস্টন চার্চিলের মতো আমারও লিখতে ইচ্ছে করছে, 'অ্যালোন ইন দি বিচ'।

স্কুলজীবন শেষে আবেদ কিছুদিন বাদেই পড়াশোনা করার জন্য লন্ডনে চলে গিয়েছিলেন। উচ্চশিক্ষা (চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি) শেষে দেশে ফিরে জীবনটাকে উৎসর্গ করলেন দুস্থ ও দরিদ্র মানুষের কল্যাণে। '৭০-এর ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত দক্ষিণাঞ্চলের দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ফজলে হাসান আবেদ। তখনই জীবন আচরণের কর্মযজ্ঞের সূচনা, সততা ও সহানুভূতির সঙ্গে। '৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধে তার সম্পৃক্ততাই শুধু নয়, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। শুনেছি লন্ডনে তার বাড়ি বিক্রি করে মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহার উপযোগী প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ করে তিনি পাঠিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে তিনি তার প্রজ্ঞা ও মেধার রূপায়ণ ঘটালেন ব্র্যাক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। দেশের বরেণ্য কবি বেগম সুফিয়া কামাল তার প্রথম সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন বেশ কয়েক বছর।
আবেদ স্কুলের বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও বিশেষ করে আমার সঙ্গে তার যোগাযোগটা একেবারেই ছিল না দীর্ঘদিন। কারণ তার আর আমার পথ ছিল ভিন্ন। আমি সাংবাদিকতা ও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হলাম, কিন্তু আবেদ থাকলেন রাজনীতিমুক্ত। তবে তার চিন্তায় ছিল তৃণমূল মানুষের জীবন পাল্টে দেওয়ার স্বপ্ন। রাজনীতি আর তার চিন্তার সঙ্গে খুব যে একটা ফারাক নেই, সে কথা নিয়ে আবেদের সঙ্গে কখনও অপ্রয়োজনীয় তর্কে জড়িয়ে পড়িনি। আবেদ ছিলেন উদারমনা এক সৎ মানুষ। স্বপ্ন বাস্তবায়নের চিন্তাতেই থাকতেন সবসময় আর নতুন নতুন স্বপ্ন দেখা এবং দেখানোর প্রয়াসে জীবনের সবটা সময়ই কাজে লাগিয়েছেন। তার শিক্ষা কর্মসূচি দৃষ্টান্তযোগ্য। মানুষকে গড়ে তোলার কাজে শিক্ষা যে মৌল উপাদান, তা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। শুধু কি তাই, নারীর ক্ষমতায়ন কিংবা জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন এসব বিষয় তাকে আচ্ছন্ন করে রাখত। এগুলো নিয়ে সবাই বলেছেন-লিখেছেন। সুতরাং তার এই মহৎ কর্মযজ্ঞের বিশাল সীমানা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা নতুন করে আর করতে চাই না। ৪৭ বছরে তার কর্মকাণ্ডের ব্যাপক বিস্তৃতি ও জনসম্পৃক্ততা সবাইকেই আকর্ষণ ও বিমুগ্ধ করেছে। কে না জানে তার কর্ম, কুশলী বাস্তবায়ন, দর্শন ও মানবগোষ্ঠীর জীবন উন্নয়নের প্রয়াসে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত বিশাল 'সাম্রাজ্যের' কথা।
ফজলে হাসান আবেদ প্রচারবিমুখ মানুষ ছিলেন। প্রয়োজনে কাজের কাছে ছুটতেন তিনি নিজে, কিন্তু নিজেকে প্রকাশের জন্য কারও তেমন দ্বারস্থ হননি। তবে এ কথা ঠিক, তিনি প্রচারের কাজে অনেককেই উদারমনে ও খোলা হাতে সহযোগিতা এবং সহানুভূতি দেখিয়েছেন। আর এসব কারণে বেগম সুফিয়া কামাল কিংবা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মহানায়ক আবদুল মতিনের মতো আপসহীন চরিত্রের মানুষকে প্রচণ্ড শ্রদ্ধা করতেন আবেদ। এ কথা তো নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, ফজলে হাসান আবেদ জীবনের অঙ্ক মেলাতে ভুল করেননি। তাই তো আড়ং, বিকাশ, ব্র্যাক ব্যাংক সর্বোপরি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সৃজনশীল প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন। অবকাঠামোতে উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মনন ও মানসিকতা বিকাশের পদক্ষেপ গ্রহণ করে তিনি যথার্থ মহৎ প্রাণের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। স্বাপ্নিক হয়েও বাস্তববাদী মানসিকতা তাকে সমাজের ছিন্নমূল থেকে অভিজাত শ্রেণির সবার কাছে অন্যরকমভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল। শুধু কি তাই! এমন কর্মী মানুষের জীবনেও নান্দনিকতার ছোঁয়া প্রবল উচ্ছ্বাসে যে ছিল, তাও লক্ষ্য করেছি শাস্ত্রীয় সংগীতের উৎসবে উপস্থিতি এবং গভীর রাত পর্যন্ত সংগীত শ্রবণে মগ্ন থাকার মধ্য দিয়ে। এ ক্ষেত্রেও তার পৃষ্ঠপোষকতায় কার্পণ্য ছিল না। স্বদেশি শিল্পের প্রতি তার যে আগ্রহ এবং তৃণমূল পর্যায়ের নানা শিল্পকর্মীর প্রতি যে সহানুভূতি, তারই প্রকাশ দেখেছিলাম শিল্পকলা একাডেমিতে এক প্রদর্শনীতে।
আমি তখন একাডেমির দায়িত্বে। তিনি আমাকে টেলিফোন করে তাঁত শিল্প ও তাঁতিদের কর্মকাণ্ডের প্রদর্শনী আয়োজন করা যায় কি-না, এ বিষয়ে কথা বললেন। আমি সোৎসাহে আগ্রহ প্রকাশ করলাম এবং আবেদের স্ত্রী শীলুর সৌজন্যে তাঁতিরা কীভাবে কাপড় বোনেন তার প্রদর্শনীর আয়োজন করে, তাদের তৈরি বস্ত্রসামগ্রী কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তার রকমারি উপস্থাপনার মাধ্যমে এই শিল্পকে জনসমক্ষে নান্দনিকভাবে তুলে ধরলেন। এই প্রদর্শনীর নান্দনিক দিকনির্দেশনার জন্য লন্ডন থেকে একজন নারী বিশেষজ্ঞকে ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন। আমার যতদূর মনে পড়ে ১৯৯২-তে শিল্পকলায় অনুষ্ঠিত এই তাঁতশিল্প প্রদর্শনী দর্শকদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করেছিল এবং প্রশংসিত হয়েছিল। সহপাঠী ও বন্ধু স্বপ্নের ফেরিওয়ালা স্যার ফজলে হাসান আবেদ তার জীবনভর সুবিস্তৃত কর্মকাণ্ডের মূল্যায়নে ব্রিটিশরাজের কাছ থেকে ২০১০ সালে পেয়েছিলেন 'নাইটহুড' উপাধি। এমন ব্যক্তি বাংলাদেশে তিনি একজনই। সেটা বড় কথা নয়। এ দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সব শ্রেণির কর্মী এবং সামাজিক চেতনার নানা শ্রেণির প্রতিনিধিদের কাছ থেকে যে বরণমালা তিনি পেয়েছেন, তার চেয়ে বড় অর্জন আর কী হতে পারে! তাই মহান কর্মীপুরুষ, বিদগ্ধ চিন্তাধর ও দুঃখী মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র ফজলে হাসান আবেদকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।
প্রবীণ সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
- বিষয় :
- শ্রদ্ধাঞ্জলি
- কামাল লোহানী
