দেশের টাকা কোথায় যায়
মামুনুর রশীদ
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০১৯ | ১৩:২২
সাম্প্রতিককালে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ক্যাসিনো। ক্যাসিনো কেলেঙ্কারিতে অনেক বড় বড় তথ্য বেরিয়ে এসেছে। তথ্যগুলো নতুন নয়, কিন্তু প্রশ্নগুলো অনেক পুরনো। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে টাকা পাঠানো খুবই সহজ। দেশে মানি লন্ডারিং আইন থাকা সত্ত্বেও প্রতিদিন শত শত কোটি টাকা অবলীলায় বিদেশে চলে যাচ্ছে। ১৯৭৫ সালের পর এই টাকার বিদেশ যাত্রা অব্যাহতভাবে চলে আসছে। বাংলাদেশের অবৈধ অর্থে মালয়েশিয়াতে সেকেন্ড হোম গড়ে উঠেছে। অস্ট্রেলিয়াতে ঘরবাড়ি ছাড়াও বড় বড় খামার তৈরি হচ্ছে। থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, কানাডা, আমেরিকাতে বাংলাদেশ কলোনি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইংল্যান্ডে বহু আগে থেকেই বৈধ ও অবৈধ উপায়ে বাংলাদেশিরা বসতির একটা বড় ধরনের রাজনীতিক প্রভাব সৃষ্টি করেছে। ওইসব দেশে নিশ্চয়ই বৈদেশিক মুদ্রার ক্ষেত্রে কঠিন কঠিন আইন রয়েছে। কিন্তু তারাও বোঝেন, সম্পদ যদি আসে তাহলে ক্ষতি কি? সে জন্য দ্বিতীয় বিশ্বের দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য অর্থের বিনিময়ে স্থায়ীভাবে বসবাস ও নাগরিকত্ব দেওয়ার বিধান তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন অন্য জায়গায়। যে বিপুলসংখ্যক ধনকুবের নিজ দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করে অন্য দেশকে সমৃদ্ধ করছে, তাদের মানসিকতাটা কেমন? আমরা বলে থাকি, লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। শুধু তাই নয়, পাকিস্তানের সীমাহীন শোষণ থেকে মুক্ত হয়েছি। এই শোষণমুক্তি ও স্বাধীনতা আমাদের একটি স্বাধীন অর্থনীতির জন্য সুযোগ এনে দিয়েছে। পাকিস্তান আমলে কতজনের ভাগ্যে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ মিলেছে? দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই সুযোগ অবারিত হয়েছে, বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে, বিদেশে উপার্জনলব্ধ টাকায় আমাদের বিশাল রিজার্ভ গড়ে উঠেছে। বিদেশে গিয়ে অমানুষিক পরিশ্রম করে বাংলাদেশের নাগরিকরা দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করেছে। কিন্তু বিশাল ধনকুবেররা বাংলাদেশটাকে কিছুতেই নিরাপদ ভাবছেন না। এই নিরাপত্তা সে চায়, অবৈধ অর্থ যেন নিরাপদ থাকে এবং তার সন্তান-সন্তনির ভবিষ্যৎও যেন নিরাপদ হয়। সেই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তারা এই দেশে শত শত ইংরেজি স্কুল গড়ে তুলেছে। এই ইংরেজি স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ূয়া ছাত্রছাত্রীরা এমন এক স্বপ্নের ঘোরে বসবাস করে যে, তারা আর এ দেশে থাকছে না। ধন-ধান্য পুষ্পভরা বাংলাদেশ তাদের দেশ নয়, তাদের গন্তব্য অন্যত্র। ইতিমধ্যে তাদের অভিভাবক ওইসব দেশে বাড়িঘর গড়ে তুলেছে। এখানকার স্কুলের পড়া শেষ করেই চলে যাচ্ছে সেই স্বপ্নের দেশে। সেই স্বপ্নের দেশ থেকে উপার্জিত অর্থ নয়, এই দরিদ্র দেশটির লুণ্ঠিত অর্থ নিয়ে যাচ্ছে সঙ্গে করে। যদি পরিসংখ্যান নেওয়া যেত, তাহলে প্রতি বছর বাংলাদেশের যে বিশাল বাজেট হয়, তার প্রায় সমমানের অর্থ অবলীলায় বিদেশে চলে যাচ্ছে। বহু বছর ধরে ঔপনিবেশিক মানসিকতার ফলে একটা বিদেশপ্রীতি গড়ে উঠেছিল। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর উপমহাদেশের দুটি দেশের মধ্যে ভারত সবচেয়ে বেশি সম্পদ অর্জন করেছিল। দুটি দেশের মধ্যে ভারত তার দূরদর্শী রাজনীতিকদের দ্বারা একটা জাতীয় সম্পদ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল।
যার ফলে কষ্ট হলেও বিভিন্ন কলকারখানা, ব্যাংক-বীমা ও খনিজসম্পদের প্রবল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে এবং জাতীয় পুঁজি গঠনের জন্য নাগরিকদের উৎসাহ দিয়েছে। একটা পর্যায় পর্যন্ত কষ্ট করতে হলেও আশির দশক থেকে ভারতে জাতীয় পুঁজি সিংহের মতো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে পাকিস্তান একেবারেই কোনো সুদূরপ্রসারী নীতি গ্রহণ না করে, বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল এবং তার আরেকটি অংশ পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করতে শুরু করল। পূর্ব বাংলার অর্থকরী ফসল আটকে যে অর্থ উপার্জন হতো, তার প্রায় সবটাই পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে ব্যয় করা হতো। কী পরিমাণ অর্থ তারা পূর্ব বাংলা থেকে লুণ্ঠন করেছে, তার প্রমাণ রাজধানী করাচি থেকে রাওয়ালপিন্ডি, সেখান থেকে ইসলামাবাদে স্থানান্তর এবং একটি বিশাল সেনাবাহিনী গঠন। এই সেনাবাহিনী ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কল্পকাহিনী প্রচার করলেও আসলে তা পূর্ব বাংলার মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার সুদূরপ্রসারী চিন্তারই ফসল। যদিও সেই সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মাটিতে এক শোচনীয় পরাজয় বরণ করে। দুর্ভাগ্য হচ্ছে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তানের সমর্থকদের রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র পঁচাত্তরের মধ্য আগস্টের পর সেনাবাহিনীর মাধ্যমে একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে যায়। পাকিস্তান যেন আবার ফিরে আসে। কোনো সুদূরপ্রসারী জাতীয় চিন্তা এই সেনাশাসকদের মধ্যে ছিল না। ফলে জাতীয় শিক্ষানীতির স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল। নতুন শিক্ষানীতি শিক্ষায় লগ্নি করার দ্বার খুলে দিল। শিক্ষা অধিকার রইল না, শিক্ষাকে সংকুচিত করা, শিক্ষাব্যবস্থাকে দেউলিয়া করে বেসরকারি ইংরেজি স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা সুলভ হয়ে উঠল। এর সঙ্গে সঙ্গে জবাবদিহিহীন শাসকদের অর্থ পাচার করাও সহজ হয়ে পড়ল। এই সহজ পথের সন্ধান পেয়ে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেল শত শত বাংলাদেশের নাগরিক। সেনাশাসনে আমলারা অনেক বেশি স্বাধীনতা এবং ক্ষমতা ভোগ করে। এই আমলাদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের দ্রুত একটা সংযোগ ঘটে যায়। একশ্রেণির দলছুট রাজনীতিবিদ মনে করেন, এই সুযোগে তারাও দেশের কাজ করবে। কিন্তু স্বৈরাচারের পতনের পর তাদের দেশে থাকাই দুস্কর হয়ে যায়। অর্থের পাচার এক দুর্বার গতিতে চলতে থাকে। এমনকি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরেও। সম্প্রতি ক্যাসিনো কেলেঙ্কারিতে কিছু ঘোরতর অনিয়ম আমাদের সামনে দৃশ্যমান হলেও এ হচ্ছে বিশাল অনিয়মের ক্ষুদ্র অংশমাত্র। এবার প্রশ্ন করি, বাংলাদেশে নানা অনিয়মের গলিপথ ধরে যে লোকগুলো দেশের অর্থ ও পরিবার নিয়ে বিদেশে গিয়ে আবাস গড়লেন, তাদের সন্তানদের মানসিকতায় বা ভাবনায় তার বাবা-মা ও দেশটা কোন জায়গায় অবস্থান করবে? অধিকাংশের কাছে বাবা-মা এবং বাংলাদেশ করুণার পাত্র হয়ে উঠবে। বাংলাদেশ থেকে লুণ্ঠিত অর্থের বিনিময়ে গড়ে তোলা বিদেশে জীবনযাপন একপর্যায়ে নরকে রূপান্তরিত হয়। ক্যাসিনো ঘটনায় হাজার কোটি টাকার একটা দৃশ্যমান ঘটনা দেখা যাচ্ছে; কিন্তু এর আড়ালে যেসব অনিয়ম ও অন্যায় ঘটেছে, তার মূল্য অর্থে নির্দিষ্ট করা যাবে না। হয়তো তা লাখ লাখ কোটি টাকা। যেসব ব্যক্তি এই ঘটনায় জড়িত, তারা তাদের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও অনুগ্রহ পাত্রদের কাছে এতদিন দেবতা হিসেবে গণ্য হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে তারা কেউ তাদের দায়ভার নেবে না। বরং তারা যে এ ঘটনার জন্য দায়ী নয়, তার জন্য নতুন নতুন কাহিনী রচনা করবে। এসব ঘটনায় সরকারের যে প্রতিষ্ঠানগুলো, যেমন- আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এবং আমলারা জড়িত থাকেন, তাদেরও খুঁজে বের করা প্রয়োজন। প্রয়োজন শুধু সাম্প্রতিক ঘটনার কারণে নয়, কীভাবে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, সেটাকেও খুঁজে বের করতে হবে। অর্থের এই বিশৃঙ্খলা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত স্পর্শ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় ছোট-বড় টেন্ডারবাজিতে ছাত্র সংগঠনও জড়িয়ে পড়েছে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক সব
অস্থিরতার মূলে হচ্ছে এই টাকা। দেশটাকে যারা নিরাপদ না ভেবে বিদেশে অর্থ
পাচার ও সপরিবারে অর্থ পাচার করে বসবাসের কথা ভাবেন এবং দেশেও বিপুল অর্থ
উপার্জনের মাধ্যমে নিরাপদ থাকতে চান, তাদের জন্য একটি কঠোর বার্তা হয়ে
উঠেছে। বার্তাটি কার্যকর করা যদিও কঠিন কাজ, তবুও এই কাজটি করার জন্য
প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানাতে চাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। বিশ্বাস করি,
যে পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে, তা যদি দেশে থাকত, তাহলে সত্যি সত্যিই
সোনার বাংলা হয়ে উঠত আমাদের প্রাণপ্রিয় স্বদেশ।
অর্থ উপার্জন নানা কৌশলে সহজলভ্য হওয়া এবং স্বচ্ছ আয়বহির্ভূত অর্থলাভ
রাষ্ট্রে যে অস্থিরতা তৈরি করে, তা আমরা গত কয়েক দশক ধরে দেখেছি। পৃথিবীর
সব রাষ্ট্রেই হয়তো আইনের কানাগলি আছে, অপরাধপ্রবণতা আছে, ঘুষ লেনদেনের
বিষয়গুলো আছে; কিন্তু সহজে পার পাওয়া সেখানে কঠিন বিষয়। যে কারণে জাপানের
প্রধানমন্ত্রীকেও সরে যেতে হয়েছিল। ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীও কোনো রকমের
ছাড় পাননি। কারণ সরকারের মধ্যে ব্যাপকসংখ্যক দেশপ্রেমিক মন্ত্রী-আমলা
থাকেন, যারা অত্যন্ত কঠোরভাবে রাষ্ট্রের সব বিষয় পর্যবেক্ষণ করেন। সুতরাং
দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহি থাকা প্রত্যেক নাগরিকের অবশ্য কর্তব্য।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
- বিষয় :
- ক্যাসিনো
- মামুনুর রশীদ

