পথচলায় নতুন বাঁক
মাসুমা রহমান নাবিলা
অনিন্দ্য মামুন
প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩২ | আপডেট: ০২ জুলাই ২০২৬ | ১৫:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
এক সময় তাঁকে সবাই চিনত ‘আয়নাবাজির নাবিলা’ নামে। এরপর দীর্ঘ বিরতি। অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো আর বড়পর্দায় দেখা যাবে না তাঁকে। তিনি ফিরলেন এমন এক সিনেমা দিয়ে, যা দেশের সিনেমা ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত বাণিজ্যিক ছবিতে পরিণত হলো। সেটি ‘তুফান’। এখন তিনি পরিচিত সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদের চলচ্চিত্র ‘বনলতা সেন’ দিয়ে। এই তিনটি সিনেমা যেন মাসুমা রহমান নাবিলার অভিনয়জীবনের তিনটি আলাদা অধ্যায়। ফলে তিনটি ভিন্ন সময়ের ভিন্ন চরিত্র এবং ভিন্ন অভিজ্ঞতার গল্প জমা হয়েছে তাঁর ঝুলিতে।
মজার বিষয় হলো, দীর্ঘ ক্যারিয়ারে নাবিলার চলচ্চিত্রের সংখ্যা হাতেগোনা। সেই অল্প কাজই তাঁকে এনে দিয়েছে স্থায়ী পরিচিতি। সংখ্যার চেয়ে মানের ওপর বিশ্বাস রাখা এই অভিনেত্রী এখন মনে করেন, তাঁর ভাগ্যটাই হয়তো এমন ছিল।
সম্প্রতি এক আলাপচারিতায় নাবিলা বলেন, এখন ফিরে তাকালে তাঁর মনে হয়, কম কাজ করলেও তিনি খুবই ভাগ্যবান। কারণ, তাঁর করা তিনটি সিনেমার কোনোটিই এমন হয়নি যে মুক্তি পেয়েই হারিয়ে গেছে; বরং প্রতিটি সিনেমাই দর্শকের মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। তাঁর বিশ্বাস, বাংলা সিনেমার উল্লেখযোগ্য কাজের তালিকা যখনই তৈরি হবে, সেখানে ‘আয়নাবাজি’, ‘তুফান’ ও ‘বনলতা সেন’-এর নাম উচ্চারিত হবে। একজন অভিনয়শিল্পীর জন্য এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে!
তবে এই পথটা সবসময় মসৃণ ছিল না। ক্যারিয়ারের নানা সময়ে তাঁর কাছেও এসেছে হতাশা। অনেক সিনেমা হয়েছে, যেগুলোতে কাজ করার সুযোগ পেলে হয়তো তালিকাটা আরও দীর্ঘ হতো। অন্যের অভিনীত কিছু সিনেমা দেখে তাঁরও মনে হয়েছে, এই গল্পের অংশ যদি তিনি হতে পারতেন! সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আক্ষেপকে জায়গা ছেড়ে দিয়েছে বাস্তবতা। এখন তিনি বিশ্বাস করেন, প্রত্যেক শিল্পীর জন্য নির্দিষ্ট কিছু কাজই অপেক্ষা করে। যেটুকু ভাগ্যে লেখা, সেটুকুই শেষ পর্যন্ত নিজের হয়ে আসে।
একসময় তাঁর মনে হয়েছিল, হয়তো তিনি দর্শকের চোখের আড়ালে চলে যাচ্ছেন। দীর্ঘ বিরতির কারণে মানুষ তাঁকে ভুলে যেতে বসেছে। শোবিজে একটি প্রচলিত কথা আছে–‘আউট অব সাইট, আউট অব মাইন্ড’। সেই আশঙ্কা তাঁকেও তাড়া করেছিল। ‘তুফান’ এবং এখন ‘বনলতা সেন’ যেন সেই ভয়কে মিথ্যা প্রমাণ করেছে। নতুন কাজ দিয়েই আবার দর্শকের আলোচনায় ফিরে এসেছেন তিনি। তাই এখন আর অতিরিক্ত প্রত্যাশা করেন না। কারণ তাঁর ভাষায়, বেশি প্রত্যাশা থেকেই বেশি হতাশার জন্ম হয়।
গেল ঈদুল আজহায় নাবিলা প্রেক্ষাগৃহে এসেছিলেন ‘বনলতা সেন’ নিয়ে। পুরোদস্তুর কমার্শিয়াল সিনেমা তুফানের পর এমন সিনেমা নিয়ে আসাটা ছিল চমকানো বিষয়। এতে অভিনয়ের অভিজ্ঞতাও ছিল একেবারেই আলাদা। ছবিটিতে একসঙ্গে একাধিক চরিত্রকে ধারণ করতে হয়েছে তাঁকে। এমন চ্যালেঞ্জিং কাজের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুতি নিয়েছে পুরো দল। প্রতিটি দৃশ্যের মহড়া হয়েছে কস্টিউম, প্রপস ও পূর্ণ পরিকল্পনা নিয়ে। দিনের পর দিন সংলাপ বলতে বলতে ধীরে ধীরে চরিত্রগুলোর মনস্তত্ত্বের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিলেন তারা।
নাবিলার ভাষ্য, পরিচালক উজ্জ্বল খুবই পারফেকশনিস্ট। শুটিং ফ্লোরে যাওয়ার আগে তিনি কোনো ধরনের দ্বিধা বা অপ্রস্তুতি রাখতে চান না। সেই কারণেই মহড়ার ওপর এত জোর দেওয়া হয়েছিল। প্রস্তুতি এতটাই নিখুঁত ছিল যে, শুটিংয়ে এনজি শটের প্রয়োজনই পড়েনি। একজন অভিনেত্রীর জন্য এমন অভিজ্ঞতা যেমন বিরল, তেমনি স্বস্তিদায়কও।
অভিনয়ের পাশাপাশি উপস্থাপনা নাবিলার আরেকটি শক্তিশালী পরিচয়। প্রায় দুই দশকের ক্যারিয়ারে অসংখ্য অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করলেও এখানেও তিনি সংখ্যার চেয়ে গুণগত মানকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, এমন অনুষ্ঠানই করা উচিত, যেটি নিয়ে দর্শকের মধ্যে আলোচনা তৈরি হয় এবং দীর্ঘদিন মনে থাকে।
ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হিসেবে কিছু বাণিজ্যিক কাজ করতেই হয়। তবে সেসবের বাইরে অনুষ্ঠান নির্বাচন করেন খুব সচেতনভাবে। ফলে অন্য অনেক উপস্থাপকের তুলনায় তাঁর কাজের সংখ্যা কম হলেও মানের দিক থেকে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছেন বলে বিশ্বাস করেন তিনি।
বর্তমান সময়ের কনটেন্ট সংস্কৃতি নিয়েও খোলামেলা কথা বলেছেন নাবিলা। তাঁর পর্যবেক্ষণ, এখন ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতায় অনেক অনুষ্ঠানই মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে যাচ্ছে। বিশেষ করে সিনেমা মুক্তির সময় শিল্পীদের একের পর এক সাক্ষাৎকার দিতে হয়। কিন্তু অধিকাংশ জায়গায় একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি ঘটে। একই উত্তর বারবার দিতে দিতে শিল্পীদের কাছেও বিষয়টি একঘেয়ে হয়ে ওঠে।
আরও একটি বিষয় তাঁকে ভাবায়। অনেক উপস্থাপক স্ক্রিপ্টের বাইরে যেতে চান না। ফলে অতিথির ব্যক্তিত্ব, অভিজ্ঞতা বা নতুন কোনো দিক উঠে আসে না। অথচ একটু প্রস্তুতি নিলেই একজন মানুষকে নতুনভাবে আবিষ্কার করা সম্ভব। নাবিলা মনে করেন, একজন ভালো উপস্থাপকের কাজ শুধু প্রশ্ন করা নয়; বরং অতিথির ভেতরের অজানা গল্পগুলো দর্শকের সামনে তুলে আনা।
ভাইরাল সংস্কৃতি প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য আরও স্পষ্ট। এখন অনেক অনুষ্ঠানেই ইচ্ছাকৃতভাবে এমন প্রশ্ন রাখা হয়, যা অতিথিকে বিব্রত করতে পারে। বিতর্ক তৈরি করাই যেন লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ মানসম্মত আলোচনা, গবেষণাভিত্তিক প্রশ্ন কিংবা শিল্পীকে নতুনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা খুব কম দেখা যায়। নাবিলার মতে, ইউটিউব বা পডকাস্টের সংখ্যা যত বেড়েছে, সেই অনুপাতে মানসম্পন্ন অনুষ্ঠানের সংখ্যা বাড়েনি।
নাবিলার পুরো ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে–তিনি কখনোই নিজেকে কাজের সংখ্যার প্রতিযোগিতায় নামাননি; বরং অপেক্ষা করেছেন এমন চরিত্রের জন্য, যা তাঁকে নতুনভাবে আবিষ্কার করবে। হয়তো সে কারণেই ‘আয়নাবাজি’র হৃদি, ‘তুফান’-এর চমক কিংবা ‘বনলতা সেন’-এর বহুমাত্রিক চরিত্র–প্রতিটি কাজই তাঁর অভিনয়জীবনে আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এমন অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী আছেন, যাদের ঝুলিতে অসংখ্য সিনেমা। কিন্তু খুব কম শিল্পীর পক্ষেই বলা সম্ভব, তাদের প্রায় প্রতিটি কাজই দর্শকের স্মৃতিতে রয়ে গেছে। নাবিলা সেই ব্যতিক্রমী দলের একজন। সময়ের ব্যবধানে তাঁর চলচ্চিত্রের সংখ্যা হয়তো খুব বেশি নয়, তবে প্রতিটি সিনেমাই তাঁর পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।
সম্ভবত এ কারণেই এখন আর নতুন কাজের সংখ্যা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন শিল্পীর সাফল্য শেষ পর্যন্ত মাপা হয় না কতগুলো সিনেমা করেছেন, তা দিয়ে; বরং কতগুলো চরিত্র দর্শকের হৃদয়ে বেঁচে আছে, তা দিয়েই। সেই হিসাব করলে, মাসুমা রহমান নাবিলার পথচলা নিঃসন্দেহে অনেকটাই আলাদা–ধীর, সংযত, কিন্তু স্মরণীয়।
