ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬

পাবলিক পরীক্ষা

স্বতন্ত্র পরীক্ষাকেন্দ্র নির্মাণ যে কারণে জরুরি

স্বতন্ত্র পরীক্ষাকেন্দ্র নির্মাণ যে কারণে জরুরি
×

পৃথক সরকারি পরীক্ষাকেন্দ্র নির্মাণে প্রাথমিক ব্যয় থাকলেও এটি শিক্ষার মানোন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ

 আজিজুল হক সরকার 

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬ | ১৮:২২

এ বছরের এসএসসি পরীক্ষা সমাপ্ত হয়ে এখন ফলের জন্য অপেক্ষা। ২ জুলাই থেকে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়েছে। স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসাগুলোতে পরীক্ষার কেন্দ্র হওয়ায় কেন্দ্রসংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আগে মাসের বেশি সময় বন্ধ থাকত। এমন পরিস্থিতিতে উপজেলা পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও পাবলিক পরীক্ষার স্বতন্ত্র কেন্দ্র স্থাপন এখন সময়ের দাবি।

পাবলিক পরীক্ষা ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বর্ষের পরীক্ষা এলেই দেশের অধিকাংশ মানসম্মত স্কুল-কলেজে দীর্ঘদিন পাঠদান ব্যাহত হয়। বিশেষ করে এসএসসি, এইচএসসি, ডিগ্রি, অনার্স কিংবা মাস্টার্স পরীক্ষার সময় বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মাসের পর মাস পরীক্ষাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ফলে নিয়মিত ক্লাস বন্ধ থাকে, শিক্ষার্থীদের সিলেবাস শেষ করা যায় না এবং সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। 
একটি শিক্ষাবর্ষে সরকারি ছুটি, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা কারণে ক্লাসের সংখ্যা এমনিতেই কমে যায়। এর সঙ্গে দীর্ঘ সময় পরীক্ষা চললে সিলেবাস সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পরীক্ষা প্রায় সারাবছর চলায় একই প্রতিষ্ঠান বারবার পরীক্ষাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে প্রতিটি উপজেলায় আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন স্বতন্ত্র সরকারি পরীক্ষাকেন্দ্র নির্মাণ প্রয়োজন। এতে পাবলিক, বিশ্ববিদ্যালয়, ভর্তি ও নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হবে এবং শিক্ষা কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন থাকবে।

স্থায়ী পরীক্ষাকেন্দ্র হলে পরীক্ষার নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বৃদ্ধি পাবে। সিসিটিভি ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র সংরক্ষণ আরও সুরক্ষিত হবে। শিক্ষক ও প্রশাসনের অতিরিক্ত দায়িত্ব কমবে। পৃথক প্রশাসনিক টিম পরীক্ষার কার্যক্রম পরিচালনা করলে শিক্ষকরা পাঠদানে বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। ক্লাস বন্ধ না থাকায় শেখার পরিবেশ স্বাভাবিক থাকবে এবং দুর্বল শিক্ষার্থীরাও পিছিয়ে পড়বে না।

পৃথক সরকারি পরীক্ষাকেন্দ্র নির্মাণে প্রাথমিক ব্যয় থাকলেও এটি শিক্ষার মানোন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান অব্যাহত থাকবে, শিক্ষার্থীদের সিলেবাস সম্পন্ন হবে এবং পরীক্ষার ব্যবস্থাপনা আরও আধুনিক ও কার্যকর হবে। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে উপজেলা পর্যায়ে স্থায়ী পরীক্ষাকেন্দ্র নির্মাণ একটি সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ।

উপজেলায় স্বতন্ত্র পরীক্ষাকেন্দ্র নির্মাণে বৈষম্য দূর হবে। একেক কেন্দ্রে একেক ধরনের নিয়ম বা কোথাও ঢিলেঢালা আবার কোথাও অতিরিক্ত কঠোরভাবে পরীক্ষা নেওয়ার যে বৈষম্য রয়েছে, পৃথক ও মানসম্মত সরকারি পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপন হলে সেটিও অনেকাংশে দূর হবে। সব কেন্দ্রে একই নীতিমালা, অভিন্ন পরিবেশ ও সমন্বিত তদারকি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। ফলে পরীক্ষার্থীরা সমান সুযোগ পাবে এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা আরও বৃদ্ধি পাবে।

বর্তমানে বিভিন্ন পরীক্ষাকেন্দ্রে অবকাঠামোগত বৈষম্য শিক্ষার্থীদের জন্য বড় সমস্যা। কোথাও পর্যাপ্ত জায়গা ও ভালো বেঞ্চ থাকলেও কোথাও গাদাগাদি পরিবেশে পরীক্ষা দিতে হয়। অনেক কেন্দ্রে পরিচ্ছন্ন টয়লেট, বিশেষ করে ছাত্রীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধার অভাব রয়েছে। এ ছাড়া দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, অপর্যাপ্ত আলো-বাতাস ও বিদ্যুৎ সমস্যাও পরীক্ষার পরিবেশকে ব্যাহত করে।

পৃথক ও নির্ধারিত সরকারি পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করলে প্রশাসনের নজরদারি আরও সহজ ও কার্যকর হবে। বর্তমানে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে পরীক্ষা নেওয়ায় একাধিক কেন্দ্রে আলাদা তদারকি করতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। অনেক সময় জনবল সংকটের কারণে সব কেন্দ্র সমানভাবে মনিটরিংও সম্ভব হয় না।

উপজেলা পর্যায়ে নির্দিষ্ট আধুনিক পরীক্ষাকেন্দ্র থাকলে সীমিত সংখ্যক কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দিয়েই পুরো কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে তদারকি করা যাবে। একই স্থানে সিসিটিভি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলে অনিয়ম রোধ, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে।

অনেকে মনে করতে পারেন, প্রতিটি উপজেলায় আধুনিক সরকারি পরীক্ষাকেন্দ্র নির্মাণ সরকারের জন্য বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে। তবে বাস্তবে রাষ্ট্র প্রয়োজন ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগ করে থাকে। আশ্রয়ণ প্রকল্প, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বহুতল ভবন, মডেল মসজিদ ও প্রশাসনিক অবকাঠামো নির্মাণ তার উদাহরণ।

সেই বিবেচনায় শিক্ষাব্যবস্থার জন্য স্থায়ী পরীক্ষাকেন্দ্র নির্মাণও একটি যৌক্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। বর্তমানে পরীক্ষার কারণে স্কুল-কলেজে পাঠদান ব্যাহত হয় এবং শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অথচ একটি আধুনিক পরীক্ষাকেন্দ্র পাবলিক পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষা, চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ কার্যক্রমসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা সম্ভব।

এ ছাড়া স্থায়ী পরীক্ষাকেন্দ্র থাকলে প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা ব্যয় কমবে, সিসিটিভি ও কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরীক্ষার স্বচ্ছতাও বাড়বে। তাই এমন কেন্দ্র নির্মাণকে ব্যয় নয়, বরং শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, স্থিতিশীল ও বৈষম্যহীন করার রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত।

পৃথক ও স্থায়ী পরীক্ষাকেন্দ্র পরিচালনার জন্য একটি নির্দিষ্ট প্রশাসনিক টিম গঠন প্রয়োজন। বর্তমানে স্কুল-কলেজের শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ায় পাঠদান ব্যাহত হয় এবং সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়। আলাদা সরকারি টিম থাকলে তারা শুধু পরীক্ষা পরিচালনায় দায়িত্ব পালন করবে, ফলে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। এই টিম প্রশ্নপত্র সংরক্ষণ, নিরাপত্তা, নকল প্রতিরোধ, খাতা ব্যবস্থাপনা ও কেন্দ্র পরিচালনার কাজ দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে পারবে। পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি সহজ হবে এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা, কর্মচারী ও প্রযুক্তি সহকারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

উপজেলা পর্যায়ে একটি স্বতন্ত্র পরীক্ষাকেন্দ্র শুধু পরীক্ষার জন্য নয়; এটি ভর্তি পরীক্ষা, নিয়োগ পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ, সেমিনারসহ নানা সরকারি কার্যক্রমেও ব্যবহার করা সম্ভব। ফলে এটি হবে একটি বহুমুখী রাষ্ট্রীয় সম্পদ। তাই শিক্ষার মানোন্নয়ন, পরীক্ষার পরিবেশের সমতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে দেশের প্রতিটি উপজেলায় আধুনিক ও স্থায়ী সরকারি পরীক্ষাকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ সময়ের অপরিহার্য দাবি। স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে এটি হতে পারে একটি দূরদর্শী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

আজিজুল হক সরকার: সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ফুলবাড়ী মহিলা ডিগ্রি কলেজ, দিনাজপুর
[email protected] 

আরও পড়ুন

×