সাম্প্রতিক
বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানে জনগণকে সঙ্গে রাখুন
মোহাম্মদ গোলাম নবী
মোহাম্মদ গোলাম নবী
প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩২ | আপডেট: ০২ জুলাই ২০২৬ | ১৩:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
সাত জেলায় লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে বিক্ষোভের খবর আবারও মনে করিয়ে দিল বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সংকট শুধু উৎপাদনের নয়; জনগণের মনে জমে থাকা প্রশ্ন, সন্দেহ ও অসন্তোষের প্রতিফলন। বিদ্যুৎ নিয়ে অভিযোগ নতুন নয়। রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত কোথাও লোডশেডিং, কোথাও ভোল্টেজ সমস্যা, কোথাও সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ, কোথাও আবার অভিযোগ– নিজেদের এলাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়, কিন্তু সুবিধা পায় অন্যরা।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে বহু বছর ধরে একটি সহজ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। দেশের স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যদি প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হয় এবং গরমকালে সর্বোচ্চ চাহিদা যদি ১৮ হাজার মেগাওয়াটের আশপাশে হয়, তাহলে লোডশেডিং কেন হয়? এই পরিস্থিতির একটা ব্যাখ্যা পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যে পাওয়া যায়। বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেছেন, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ঘাটতি প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট।
ঘাটতি কেন– তার উত্তরও রয়েছে। যেমন সব বিদ্যুৎকেন্দ্র একসঙ্গে চালু থাকে না। কোনো কেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণে থাকে; কোনোটি জ্বালানির অভাবে পুরো সক্ষমতায় চলতে পারে না। কোথাও সঞ্চালন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা থাকে, কোথাও বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ– এই তিন স্তরের যে কোনো একটিতে সমস্যা তৈরি হলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের ঘরেই পৌঁছায়। কিন্তু সাধারণ নাগরিকরা বিদ্যুৎ পাওয়ার অধিকার থেকে কেন বঞ্চিত হয়– সেই উত্তর সবসময় জানতে পারে না। বিপত্তি ঘটে সেই কারণেই। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ নিয়ে নানান প্রশ্ন প্রতিনিয়ত শোনা যায়। এসব প্রশ্নের সব উত্তর পাওয়ার কোনো ব্যবস্থা মানুষের হাতে নেই।
আমরা জানি, বাংলাদেশে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে গণশুনানি হয়। সেখানে উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি ব্যয়, আমদানি ব্যয়, ভর্তুকি এবং আর্থিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ খাতের কর্মদক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নাগরিক সন্তুষ্টি নিয়ে একই ধরনের জাতীয় আলোচনা খুব কম দেখা যায়।
একজন সাধারণ নাগরিক সহজে জানতে পারেন না কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র বর্তমানে বন্ধ; কোনটি রক্ষণাবেক্ষণে রয়েছে; কোনটি জ্বালানির অভাবে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না; কোথায় সঞ্চালন সীমাবদ্ধতা রয়েছে; কোন অঞ্চলে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে বা কোন সমস্যার সমাধানে কত সময় লাগতে পারে। অথচ এসব তথ্য জনস্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
অনেকেই বলেন, বিদ্যুৎ খাত অত্যন্ত জটিল। কথাটি সত্য। কিন্তু জটিলতা কখনও স্বচ্ছতার বিকল্প হতে পারে না। বরং কোনো খাত যত বেশি জটিল এবং যত বেশি জনসম্পৃক্ত, সেখানে তথ্যের উন্মুক্ততা তত বেশি প্রয়োজন। কারণ তথ্যের অভাব শুধু বিভ্রান্তিই নয়; আস্থার সংকটও তৈরি করে। যখন মানুষ সমস্যার কারণ জানে না, তখন তারা নিজেরাই ব্যাখ্যা তৈরি করে। সেখান থেকেই জন্ম নেয় গুজব, সন্দেহ ও অসন্তোষ, যা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে লক্ষণীয়ভাবে দেখা যাচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিষয়টি অনেক আগেই উপলব্ধি করেছে। শ্রীলঙ্কা নিয়মিতভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সর্বোচ্চ চাহিদা এবং উৎপাদনের উৎসভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করে। আপনি তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন, বিদ্যুৎ সঞ্চালন এবং বিদ্যুৎ বিতরণ– এর যে কোনো ওয়েবসাইটে ঢুকলে দেখবেন তারা বিদ্যুতের গ্রাহকদের জন্য দরকারি সব তথ্য কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রতিদিন আপডেট করছে। এমনকি নেপালের বিদ্যুৎ বিভাগের ওয়েবসাইটে বিদ্যুৎ চাহিদা, সরবরাহ, আমদানি, রপ্তানি এবং সিস্টেম বিভ্রাটের তথ্য প্রতিদিন হালনাগাদ করা হয়। অন্যদিকে উন্নত দেশ অস্ট্রেলিয়ায় নাগরিকরা রিয়েল টাইম বিভ্রাট মানচিত্রের মাধ্যমে দেখতে পারে কোথায় বিদ্যুৎ নেই; কতজন গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত এবং কখন সেবা স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কাছের দেশ নেপাল ও শ্রীলঙ্কা কিংবা দূরের উন্নত দেশের কেউই নিখুঁত নয়। তাদেরও বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়; অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা থাকে এবং জ্বালানি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। নাগরিকদের অনুমান করে চলতে হয় না। তারা অন্তত জানে, সমস্যাটা কোথায় হচ্ছে; কখন সমাধান হবে। বাংলাদেশও উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছাতে চায়। কিন্তু উন্নত রাষ্ট্র হওয়া শুধু মাথাপিছু আয়, অবকাঠামো বা প্রযুক্তির প্রশ্ন নয়। এটি শাসন ব্যবস্থারও প্রশ্ন। উন্নত রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, নাগরিক সহজে জানতে পারে রাষ্ট্র কী করছে; কেন করছে এবং তার অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে।
বাংলাদেশে মোট ১৩টি সংস্থা বিদ্যুৎ নিয়ে কাজ করে। কিন্তু তাদের কারও ওয়েবসাইটে জনগণের চাহিদামতো তথ্য নেই। ওয়েবসাইটগুলো আপডেটও করা হয় না। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কমিশন বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণে গণশুনানির আয়োজন করে। কিন্তু একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ শুধু মূল্য নির্ধারণ নয়; গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা, তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং খাতটির প্রতি জনআস্থা তৈরি করাও। কারণ একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রকৃত শক্তি তার ক্ষমতায় নয়; তার বিশ্বাসযোগ্যতায়।
জনগণের অর্থ ব্যবস্থাপনা করাই জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান দায়িত্ব। বিদ্যুৎ খাতে ব্যবহৃত প্রতিটি টাকা শেষ পর্যন্ত জনগণেরই টাকা। তাই জনগণের কাছে তথ্য প্রকাশ করা কোনো অনুগ্রহ নয়। এটি রাষ্ট্রের জবাবদিহির স্বাভাবিক দায়িত্ব। নাগরিককে তথ্য দেওয়া মানে সমালোচনার সুযোগ সৃষ্টি করা নয়; বরং আস্থার ভিত্তি তৈরি করা। আমার মতে, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে গণশুনানির পাশাপাশি বছরে অন্তত একবার বিদ্যুৎ খাতের কর্মদক্ষতা নিয়ে জাতীয় গণশুনানি হওয়া উচিত। কারণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিক শুধু সেবাগ্রহীতা নয়; অংশীদারও।
মোহাম্মদ গোলাম নবী: কলাম লেখক; প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, রাইট টার্ন
- বিষয় :
- মোহাম্মদ গোলাম নবী
