ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬

আন্তর্জাতিক

স্টারমারের বিদায়ে ব্রিটেন বদলাবে?

স্টারমারের বিদায়ে ব্রিটেন বদলাবে?
×

আখতার সোবহান মাসরুর

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাজ্যের শাসক দল লেবার পার্টির প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার পদত্যাগের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়েছেন। দলের নতুন নেতা নির্বাচিত হলে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব ছাড়বেন। গত মে মাসের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রায় এক হাজার ৫০০ কাউন্সিলর পদ হারানো এবং ৩৮টি কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর তাঁর বিদায় কার্যত অনিবার্য হয়ে ওঠে।

এর আগেই পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ ঘিরে স্টারমার তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে ম্যান্ডেলসনের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক তাঁর নেতৃত্বকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে। তবে স্টারমারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল রাজনৈতিক; তিনি কখনোই নিজস্ব কোনো ন্যারেটিভ বা আদর্শিক অবস্থান গড়ে তুলতে পারেননি। নীরব ও সতর্ক রাজনীতির কৌশল তাঁকে জনগণের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। কারণ নেতৃত্ব শুধু দক্ষ প্রশাসক নয়; মানুষের সঙ্গে সংযোগ গড়ে তোলা, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও কল্পনাকে স্পর্শ করারও নাম। সেই পরীক্ষায় স্টারমার ব্যর্থ হয়েছেন।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কট্টর ‍ডানপন্থি অভিবাসনবিরোধী নাইজেল ফারাজের ইউকে রিফর্ম, লিবারেল ডেমোক্র্যাট ও মধ্যপন্থি পরিবেশবাদী গ্রিন পার্টি বিপুলসংখ্যক আসন কনজারভেটিভ ও লেবার দলের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে। এই ভরাডুবির পর লেবারের শাসনকালের মধ্যভাগে এসে দলের প্রধান খেলোয়াড় বদল হচ্ছে। ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহামকে নামানো হচ্ছে ময়দানে। কিন্তু সমস্যা নেতার অদলবদলে নয়। সংকট আরও গভীরে।

যুক্তরাজ্য বহুমাত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সম্পদের কেন্দ্রীভবন, ব্রেক্সিট-পরবর্তী অর্থনৈতিক ধীরগতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী, ব্যাংকে বাড়ির বন্ধকি ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি, সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি, সেবা ও স্বাস্থ্য খাতের ওপর চাপ, অভিবাসন ইত্যাদি অভ্যন্তরীণ সংকটের সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিকে আরও সমস্যায় ফেলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুরোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি মানুষের অনাস্থা। 

২০২২ সালের পর থেকে যুক্তরাজ্যে মুদ্রাস্ফীতি একাধিকবার ১০-১১ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। এর প্রধান কারণ ছিল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট। অনুমান করা হয়, ২০২২-২৫ সময়ে পরিবারকে গড়ে দুই থেকে তিন হাজার পাউন্ড অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের পরিবার। খাদ্য ও জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়েছে। বিল ও জীবনযাত্রার খরচ বেড়েছে অনেক। অথচ ‍মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যুক্তরাজ্যে মজুরি ও বেতন বাড়েনি। সব মিলিয়ে এই অস্থিরতা জনতুষ্টিবাদী অভিবাসনবিরোধী কট্টর ডানপন্থি রাজনীতির উত্থানের দিকে দেশকে ঠেলে দিচ্ছে। রাজনীতিতে দলগুলো নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে অভিবাসীদেরই দায়ী করে থাকে। পশ্চিমা দুনিয়ার রাজনীতিতে অভিবাসী যেন তুরুপের তাস।

ইউক্রেন যুদ্ধ ও ন্যাটোর চাপের কারণে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। বার্ষিক প্রতিরক্ষা ব্যয় ৮৫-৯০ বিলিয়ন পাউন্ড, যা জিডিপির প্রায় ২.৪ শতাংশ। ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে মোট ১৫-২২ বিলিয়ন পাউন্ড (২০২২-২৫)। এই ব্যয়ের ফলে অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের মধ্যে একটি টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে– একদিকে জাতীয় নিরাপত্তা, অন্যদিকে সামাজিক কল্যাণ। ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে সরাসরি সহায়তা বৃদ্ধি করায় প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ায় স্বাস্থ্য ও জনকল্যাণ বাজেটে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে।

ব্রেক্সিটের কারণে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি কিছুটা সমস্যায় পড়েছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপের প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে কট্টর ডানপন্থি অভিবাসনবিরোধী রিফর্ম ইউকের মতো দল জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। অভিবাসন যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে একটি বড় বিষয়। এ নিয়ে নেটিভদের মধ্যে অনেক উদ্বেগ রয়েছে। যুক্তরাজ্যের বর্তমান সংকট কেবল রাজনৈতিক নয়। এটি অর্থনৈতিক ও কাঠামোগতও, যার কোনো সহজ ও দ্রুত সমাধান নেই। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিশ্ব পুঁজিবাদের সংকট। ফলে দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথও অনিশ্চিত ও বহুস্তরীয়। নেতৃত্বের পরিবর্তন লেবার পার্টিকে কতটা পুনর্গঠিত করতে পারবে, বিশেষ করে অ্যান্ডি বার্নহাম কী ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটাতে পারেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়। সময়ই এর উত্তর দেবে। অন্যদিকে কনজারভেটিভ পার্টির দুর্বলতা ও জনঅসন্তোষের পরিপ্রেক্ষিতে অভিবাসনবিরোধী জনতুষ্টিবাদী শক্তির উত্থানও সম্ভাব্য। যেখানে রিফর্ম ইউকে বা অনুরূপ দল রাজনৈতিকভাবে আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে পরিবেশবাদী গ্রিন পার্টি এবং বামপন্থি রাজনৈতিক ধারাগুলোরও সীমিত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতির সুযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে ব্রিটেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ একক কোনো ধারায় নয়, বরং বহুধাবিভক্ত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এক অনিশ্চিত পরিসরে প্রবেশ করছে।

ড. আখতার সোবহান মাসরুর: লেখক ও গবেষক

আরও পড়ুন

×