ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬

শ্রদ্ধা

বহুমাত্রিক শিল্পের কোলাজ মুস্তাফা মনোয়ার

বহুমাত্রিক শিল্পের কোলাজ মুস্তাফা মনোয়ার
×

মুস্তাফা মনোয়ার (১৯৩৫-২০২৬)

কাওসার চৌধুরী

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ‘প্রাণ তরঙ্গ’ নামে একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা ছিল আমার টেলিভিশনে কাজের শুরু। সেই অনুষ্ঠানটির পরিকল্পক ও শিল্প নির্দেশক ছিলেন শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার। পালা করে অনুষ্ঠানটি পরিচালনা (টিভির ভাষায় প্রযোজনা) করতেন বেলাল বেগ ও আলী ইমাম। আলী ইমামই একদিন পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন প্রাণ তরঙ্গের পরিকল্পক, বিশাল মাপের এই মানুষ মুস্তাফা মনোয়ারের সঙ্গে। ১৯৭৮ সালে ঢাকার মঞ্চে নাটক শুরুর পরপরই শুরু হয়েছিল আমার বাংলাদেশ টেলিভিশনে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা ও অভিনয়জীবন। অর্থাৎ মুস্তাফা মনোয়ারের সঙ্গে আমার পরিচয় চার যুগ আগে। তবে তাঁর নামটি জেনেছিলাম আরও আগে; সত্তর দশকের গোড়ায়। 

একটি ‘সাইক্লোরামা’কে (থিয়েটার, স্টুডিওতে ব্যবহারের বাঁকানো দেয়াল বা পর্দা) ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে পারফরম্যান্সগুলো দৃশ্যায়িত হতো সেই ‘প্রাণ তরঙ্গ’ অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানের মুড অনুযায়ী কোনো প্রাণী কিংবা প্রাকৃতিক দৃশ্যের ‘কাট আউট’-এর ওপরে বিপরীত দিক থেকে আলো ফেলে এক ধরনের ‘মায়া’ বা বিভ্রম তৈরি করা হতো সাইক্লোরামায়। সেই পর্দাকে পেছনে রেখে আমরা পারফর্ম করতাম ক্যামেরার সামনে। সত্তর দশকের সেই অনগ্রসর সময়ে বিষয়টি বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল বৈ কি। তার ওপরে পাশ্চাত্যের প্রযুক্তিনির্ভরতা ‘এড়িয়ে’ নিজ দেশের সহজলভ্য উপাদান এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করেও যে অনুষ্ঠানের মান নিশ্চিত করা যায়– সেটা প্রমাণ করেছিলেন মুস্তাফা মানোয়ার। দর্শকও বিস্ময় নিয়ে উপভোগ করতেন মুস্তাফা মনোয়ারের সৃষ্টিশীলতা। এখানেই ছিল তাঁর বিশেষত্ব।        

সীমাহীন সৃষ্টিশীল এই মানুষটার উদ্বোধনী শক্তি ছিল অবিশ্বাস্য। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে বাংলাদেশে যে কয়েকটি ক্ষেত্রে ‘নবজাগরণ’ হয়, এর মধ্যে মঞ্চ ও টেলিভিশনের নাটক উল্লেখযোগ্য। মঞ্চ নাটকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মুস্তাফা মনোয়ার টিভি নাটক পরিবেশনে নতুন নতুন ধারা এবং গতি আনার চেষ্টা করেন সফলতার সঙ্গে। সদ্যপ্রয়াত মঞ্চসারথি আতাউর রহমানের কাছে জেনেছি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মুক্তধারা’ নাটকটি করতে গিয়ে মুস্তাফা মনোয়ার নাকি নতুন এক ধারার জন্ম দিয়েছিলেন। ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে খোলা মঞ্চে নাটকটি পরিবেশিত হয়েছিল। আতাউর রহমান বলেছিলেন, দর্শকের সামনে ‘মুক্তধারা’র প্রবাহ প্রাণবন্ত করার জন্য মুস্তাফা মনোয়ার নাকি দমকল বাহিনীর ছয়টি গাড়ির পানি ছেড়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নদীর প্রবাহ তৈরি করেছিলেন; সেই বাহাত্তরেই! বাহ! অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি। 

মুস্তাফা মনোয়ারের জন্ম, পারিবারিক পরিচয়, কর্মজীবন, পেশা, দেশ-বিদেশে প্রশংসা, পুরস্কার– এগুলো সম্পর্কে আমরা কমবেশি সবাই জানি। তবুও খুব সংক্ষেপে কিছু তথ্য দিয়ে রাখি। 
১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর বর্তমান মাগুরা জেলার শ্রীপুর থানার নাকোল গ্রামে মুস্তাফা মনোয়ার জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা বাংলাদেশের প্রথিতযশা কবি গোলাম মোস্তফা এবং মা জমিলা খাতুন। নারায়ণগঞ্জে বিদ্যালয়ভিত্তিক পড়াশোনা শেষে মুস্তাফা মনোয়ার কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৫৯ সালে ওই মহাবিদ্যালয় থেকে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। 

তিনি পেশাজীবন শুরু করেন পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে (বর্তমানে ঢাবির চারুকলা ইনস্টিটিউট), প্রভাষক পদে। স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে তিনি ঢাকা টেলিভিশনে অনুষ্ঠান প্রযোজক, স্বাধীনতা পরবর্তীকালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপমহাপরিচালক, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালকের পদসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। সৃষ্টিশীলতার পাশাপাশি প্রশাসনেও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। 

মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন মনে-প্রাণে সার্বক্ষণিক মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর দেশপ্রেমের তুলনা তিনি নিজেই। এ বিষয়ে একটি ঘটনার কথা বলি। বিটিভির প্রধান ফটকের পাশে স্থাপিত ‘আমার সোনার বাংলা’ ম্যুরালটি ১৯৮৯ সালে তৈরি করা হয়; বিটিভির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে। ওই সময়ে স্বৈরশাসক এরশাদের মৌখিক নির্দেশনা ছিল– বিটিভির ওই দেয়ালে তাঁর নিজের কোনো প্রতিকৃতি কিংবা তাঁর কোনো উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ঘিরে যেন একটি ম্যুরাল তৈরি করা হয়। কিন্তু অসম সাহসী মুক্তিযোদ্ধা-শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার এরশাদের কোনো প্রতিকৃতি কিংবা তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে ম্যুরাল বানাননি। তার বদলে সেখানে স্থাপিত করেন ‘আমার সোনার বাংলা’ ম্যুরাল। 

কোনো রকমের বিদেশি উপকরণ ব্যবহার না করে শুধু বালু আর সিমেন্ট দিয়ে অনন্যসাধারণ এই ম্যুরাল মুস্তাফা মনোয়ারের পরিকল্পনায় তাঁরই নেতৃত্বে অঙ্কিত/স্থাপিত। ম্যুরালটিতে বাংলাদেশের মানচিত্রের ওপরে আমাদের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা…’ পুরোটাই খোদাই করা হয়েছে। সংগীতের বাণীগুলোর দুই পাশে আছে চিরায়ত বাংলার লোকজ ‘মোটিফ’গুলো। ম্যুরালটি নির্মাণে মুস্তাফা মনোয়ারের শিল্পী-দলে আরও ছিলেন শিল্পী কেরামত মওলা, মহিউদ্দিন ফারুক, আব্দুল মান্নানসহ বিটিভিতে কর্মরত কয়েকজন শিল্পী (আঁকিয়ে)। 

বরেণ্য শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার কিন্তু সফল ‘পাপেট নির্মাতা’ হিসেবেই সমধিক পরিচিত। এটা তাঁর ‘সিগনেচার আইডেন্টিটি’ বলা যায়। পাপেটের ক্ষেত্রে তাঁর সৃষ্ট চরিত্র মীনা, পারুল, বাঘা, মেনি এবং শিল্পী ভাই– সারাদেশের পাপেটপ্রিয় মানুষের হৃদয়জুড়ে বিরাজ করছে। এই পাপেটগুলো তাঁর নিজেরই পরিকল্পনা, পরিচালনা ও উপস্থাপনায় নির্মিত। বহুমুখী প্রতিভার এই মানুষটা শিল্পপ্রেমীদের কাছে অমর থেকে যাবেন। 

শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের সঙ্গে আমার একটি মজার মিথস্ক্রিয়ার কথা দিয়ে স্মৃতিকথা শেষ করতে চাই। ১৯৮১ সালের কথা। তখন ‘বাংলাদেশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট অ্যান্ড আর্কাইভ’ কয়েকটি ফিল্ম কোর্স চালু করেছিল ঢাকায়। একদিন মুস্তাফা মনোয়ার এলেন ওখানে ক্লাস নিতে। তিনি আমাদের নন্দনতত্ত্ব, সৌন্দর্য ও শিল্পকলা বিষয়ে পড়াতেন। ওই দিন তিনি সেন্স অব প্রোপোরশন (মাত্রাবোধ) নিয়ে কথা বলছিলেন। এক পর্যায়ে বোর্ডে একটি গাভির ছবি এঁকে জিজ্ঞেস করলেন– এটা কী এঁকেছি, বলতে পার? আমি আগ বাড়িয়ে উত্তর দিই– স্যার, এটা গাভি। তিনি বললেন, এটার পাশে তুমি একটা ‘বাছুর’ আঁকতে পারবে? আমি বলি– স্যার, দেখি চেষ্টা করে। 

খুব কষ্টেসৃষ্টে বোর্ডে আঁকলাম বাছুর নামের কিছু একটা। এবারে তিনি ক্লাসের অন্য সবার কাছে জিজ্ঞেস করলেন– এখানে আকারে কোন প্রাণীটা বড়? গাভি, না বাছুর? সবাই বলল, বাছুরটা বড় (সবার হাসি)! মুস্তাফা মনোয়ার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, গাভির চাইতে বাছুর বড় হয়ে গেল কীভাবে (আবারও সবার হাসি)? আর বাঁশের খুঁটির মতো যা দেখা যাচ্ছে সেগুলো কি বাছুরের ঠ্যাং? লজ্জায় এক হাত দিয়ে মুখের একপাশ ঢেকে তর্ক দিই– স্যার, বাছুরটার বয়স বেড়ে গেছে তো ইতোমধ্যে। সে জন্যই বাছুরটা গাভির চাইতে একটু বড় হয়ে গিয়েছে! জীবনের তো একটা ‘গ্রোথ’ আছে স্যার, তাই না? মুস্তাফা মনোয়ার বললেন– হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। বাছুরটা একসময় বড় হতেই পারে। আর বড় হয়ে যাওয়ার পরে বাছুর আর বাছুর থাকে না; সেটা হয়ে যায় ষাঁড় কিংবা বলদ। আমি তো তোমাকে ষাঁড় আঁকতে বলিনি, বাছুর আঁকতে বলেছি (আবারও সম্মিলিত হাসি)। এবারে দুহাত দিয়ে মুখ ঢাকার পালা।  

সেই ঘটনার পর ৪৫ বছর চলে গেল। ২৯ জুন মুস্তাফা মনোয়ার বিদায় নিলেন আমাদের কাছ থেকে। তাঁর একজন সামান্য শিষ্য হিসেবে নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, আমার সেন্স অব প্রোপোরশন আগের চেয়ে কিছুটা উন্নত হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু আঁকার হাতটি আর এ জনমে তৈরি হলো না স্যার। 

আমরা সাধারণ মানুষ হারিয়ে যাব সময়ের স্রোতে; মানুষের স্মৃতিতে দাগ কাটতে পারিনি আমরা। মুস্তাফা মনোয়ার, আপনি বেঁচে থাকবেন শিল্পপ্রেমী মানুষের সুকুমারবৃত্তিতে। বেঁচে থাকবেন কত প্রজন্মের শৈশবের কোমল আলোয়! বাংলাদেশ ঋণী আপনার কাছে।

কাওসার চৌধুরী: 
প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও অভিনেতা

আরও পড়ুন

×