পাঁচ রাডারের চারটাই অকেজো
আবহাওয়া অধিদপ্তর যেন নিধিরাম সর্দার
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
আবহাওয়া অধিদপ্তর যথাসময়ে যে রাডারের মাধ্যমে পূর্বাভাস দিয়া থাকে, সেই ব্যবস্থাপনায় দুর্দশা উদ্বেগজনক। বুধবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আবহাওয়া অধিদপ্তরের পাঁচ রাডারের মধ্যে চারটাই অকেজো। প্রশ্ন হইতেছে, তাহা হইলে দপ্তরটি পূর্বাভাস প্রদান করিতেছে কীরূপে? আমরা জানি, মৌসুমি বায়ু এখন দেশব্যাপী পূর্ণ শক্তিতে সক্রিয় এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারী হইতে অতিভারী বৃষ্টি, ঝড় ও দমকা হাওয়ার শঙ্কা অব্যাহত। এমন সময়ে আকাশের মতিগতি অনুধাবন, বৃষ্টির অবস্থান কিংবা বজ্রঝড়ের গতিপথ সম্পর্কে পূর্বেই নির্ভুল তথ্য প্রদান করিতে পারে রাডার। অথচ দেশের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এই প্রযুক্তি নেটওয়ার্ক এখন ভাঙিয়া পড়িয়াছে। বাংলাদেশের ন্যায় জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশে আবহাওয়ার আগাম সতর্কতা বেহাল কেন?
আবহাওয়ার সতর্কতা মানুষের জীবন ও সম্পদ সুরক্ষার প্রাথমিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। অথচ একটি মাত্র রাডারের উপর নির্ভর করিয়াই দেশের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ও পূর্বাভাসের গুরুত্বপূর্ণ কার্য পরিচালিত হইতেছে। আমরা মনে করি, ইহা কেবল প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা নহে; বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার গুরুতর অবহেলার প্রতিফলন। সত্য যে, স্যাটেলাইটের মাধ্যমেও আবহাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। ইহার তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হইলেও স্থানীয় পর্যায়ে তাৎক্ষণিক ও নির্ভুল তথ্য প্রদানে রাডারের বিকল্প নাই। বিশেষ করিয়া বিমান চলাচল, নৌপরিবহন, কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় রাডারের তথ্য অপরিহার্য।
আমরা বিস্মিত, বৎসরের পর বৎসর যন্ত্রপাতি অচল রহিয়াছে কীরূপে! সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের কেবল ঢাকার রাডারটি সচল। রংপুর, মৌলভীবাজার, কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর খেপুপাড়ারগুলি অচল। তন্মধ্যে রংপুরের নূতন রাডারটি ১৭ জুন হইতে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ। অবশিষ্ট তিনটা রাডারই কয়েক বৎসর ধরিয়া অকার্যকর। যেহেতু এই প্রযুক্তি নির্দিষ্ট এলাকাব্যাপী পর্যবেক্ষণ করিয়া থাকে, সেহেতু দেশের অধিকাংশ এলাকাই পর্যবেক্ষণের বাহিরে রহিয়াছে দীর্ঘসময় ধরিয়া। ইহা অত্যন্ত আশঙ্কার। আবহাওয়ার পূর্বাভাস না থাকিলে কী ঘটিতে পারে, সেই নমুনা দেখাইয়া গিয়াছিল ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড় গোর্কি উপকূলীয় এলাকায়, বিশেষত ভোলায়। গ্রামাঞ্চলের মানুষ পূর্বাভাস না পাইয়া প্রস্তুতিহীন ছিল।
এইদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অভিযোগ করিয়াছেন, নির্ভুল ও সময়োপযোগী আবহাওয়া তথ্যের অভাবে বিভিন্ন সময়ে কোটি কোটি টাকার ফসলহানি হইয়াছে। এমনকি অনেক কৃষক আগাম সতর্কতা না পাইয়া বোরো ধান, ভুট্টা, গম ও সবজি চাষে ক্ষতির মুখে পড়িয়াছে। অর্থাৎ সেই বাস্তবতা সাড়ে পাঁচ দশক পরও বিদ্যমান।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা রাডারের যন্ত্রাংশ মেরামত-সংক্রান্ত জটিলতার দাবি করিয়া দায় উপেক্ষা করিতে চাহিলেও উহা গ্রহণযোগ্য হইতে পারে না। এই ক্ষেত্রে তাহাদের দায়িত্বহীনতাই স্পষ্ট। যেই পূর্বাভাসের সহিত দেশের কৃষকের ফসল ও মানুষের বাঁচা-মরার সম্পর্ক, সেই রাডার যে কোনো মূল্যে সচল রাখাই সংস্থাটির অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এই ক্ষেত্রে আধুনিক রাডার স্থাপন, রাডারের দ্রুত মেরামত, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পৃথক তহবিল গঠন এবং দক্ষ প্রযুক্তিবিদ তৈরিতে বরাদ্দের প্রয়োজন হইলেও উহা নিশ্চিত করা জরুরি।
মনে রাখিতে হইবে, পাঁচটা রাডারের মধ্যে চারটাই অচল থাকিবার ঘটনা কোনো সাধারণ প্রশাসনিক ত্রুটি নহে। ইহা রাষ্ট্রের দুর্যোগের প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতাকেও সম্মুখে লইয়া আসিয়াছে। অথচ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। দেশের এই সাফল্যের ভিত্তিও দুর্বল হইয়া পড়িবে, যদি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের মৌলিক প্রযুক্তিই অচল থাকে। নির্ভুল তথ্য ব্যতীত কার্যকর পূর্বাভাস সম্ভব নহে। আর দুর্বল পূর্বাভাস দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি করিবে বহুগুণ– সন্দেহ নাই। তজ্জন্য ত্বরিত গতিতে অচল রাডার সচল করিতে হইবে। আবহাওয়া অধিদপ্তর ঢাল-তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দার থাকিতে পারে না। রাডারকাণ্ডে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করিয়া আবহাওয়া অধিদপ্তরের কাহারও দায়িত্বে অবহেলা থাকিলে উহাও বাহির করা প্রয়োজন। আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ন্যায় জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অবহেলা অমার্জনীয় অপরাধ।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়
