ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬

জনস্বাস্থ্য

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রস্তুতি ত্রুটিপূর্ণ

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রস্তুতি ত্রুটিপূর্ণ
×

মুশতাক হোসেন

মুশতাক হোসেন

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩৫ | আপডেট: ০২ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি আর কেবল একটি নির্দিষ্ট মৌসুমের বা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের সাময়িক বিপর্যয় নয়। এটি এখন সারাবছরের স্থায়ী স্বাস্থ্য সংকট। এটি আবহাওয়ার পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সামগ্রিক বর্জ্য ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার বড় ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতার ফল।

বর্ষাকালে ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ রূপ নিলেও বছরের অন্যান্য সময়ে রোগটি পুরোপুরি নির্মূল হচ্ছে না। থেমে থেমে বৃষ্টি, এর পরপরই কড়া রোদ বা গুমোট গরম পড়া এডিস মশার প্রজননের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত পরিবেশ। একটানা প্রবল বৃষ্টি হলে মশার ডিম বা লার্ভা ধুয়েমুছে যায়। কিন্তু ক্ষণিক বৃষ্টির পর রোদ উঠলে পরিবেশ যে আর্দ্র ও উষ্ণ রূপ নেয়, তা এডিসের বংশবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে বহুগুণ। এই প্রাকৃতিক কারণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমাদের চারপাশের পরিবেশ।

আধুনিক জীবনযাত্রার বর্জ্য যেমন প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ব্যাগ, পরিত্যক্ত গাড়ি ও টায়ার, ওয়ান টাইম কাপ বা বাটি, বহুতল ভবনের ছাদ বা কার্নিশে জমে থাকা পরিষ্কার পানি এডিস মশার প্রধান প্রজনন ক্ষেত্র। এর ওপর দেশের শহর, উপশহর ও গ্রামগুলোর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় মশার ঘনত্ব এত বেশি, সেখানে রোগ ছড়ানোর হার স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি থাকে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রথম এবং প্রধান করণীয় সার্বিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান। ব্যক্তির পাশাপাশি সমাজ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানকে যৌথভাবে বর্জ্য অপসারণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার দিকে নজর দিতে হবে। শিশুদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সুরক্ষার অংশ হিসেবে লম্বা পোশাক পরানো,  মশা তাড়ানোর বিশ্বস্ত ক্রিম বা রিপেলেন্ট ব্যবহার এবং ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি। তবে ব্যক্তিগত এই সচেতনতা তখনই শতভাগ কাজে আসবে, যখন সামাজিক উদ্যোগে পুরো এলাকা, খেলার মাঠ, পার্ক, সরকারি-বেসরকারি ভবনের চারপাশ নিয়মিত পরিষ্কার রাখার একটি স্থায়ী সংস্কৃতি গড়ে তোলা যাবে।

মশার প্রজাতি, ঘনত্ব ও প্রজনন স্থান বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট রোগবাহী মশাকে ধ্বংস করতে হবে, যাকে লক্ষ্যভিত্তিক মশা নিয়ন্ত্রণ বলা হয়। নির্বিচারে সব মশা না মেরে কেবল রোগ ছড়ানো মশাকে লক্ষ্য করায় এটি অত্যন্ত পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী পদ্ধতি।

এই কৌশলের মূল ভিত্তি হলো নজরদারি ও আধুনিক প্রযুক্তি। প্রথমে আক্রান্ত এলাকায় বিশেষ ফাঁদ পেতে মশা সংগ্রহ করা হয়। এরপর ল্যাবরেটরিতে ডিএনএ পরীক্ষা বা আণুবীক্ষণিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় মশাটি ডেঙ্গুর বাহক, নাকি ম্যালেরিয়ার। পাশাপাশি জিআইএস ম্যাপিংয়ের সাহায্যে মশার সুনির্দিষ্ট প্রজনন কেন্দ্র (যেমন পরিষ্কার জমা পানি বা ডোবা) চিহ্নিত করা হয়। শনাক্তকরণের পর শুরু হয় সুনির্দিষ্ট দমন অভিযান। ঢালাওভাবে রাসায়নিক স্প্রে করার বদলে শুধু চিহ্নিত স্থানে লার্ভা ধ্বংসকারী ব্যাকটেরিয়া বা লার্ভাখেকো গাপ্পি মাছ ছাড়া হয়। এ ছাড়া আধুনিক ওলবাকিয়া প্রযুক্তির মাধ্যমে মশার প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট করে দেওয়া হয়।

দুর্ভাগ্যবশত, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমাদের বর্তমান রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ এবং এটি মূলত চিকিৎসাকেন্দ্রিক। সরকার বড় বড় হাসপাতালে আইসিইউ বেড বাড়ানো, অতিরিক্ত বেড তৈরি কিংবা সেন্ট্রাল অক্সিজেন সাপ্লাই নিশ্চিত করার মতো শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। এটি হলো রোগীর একদম চূড়ান্ত বা সংকটাপন্ন অবস্থার ব্যবস্থাপনা। যখন একজন রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে যায়, কেবল তখনই সে এই ব্যবস্থার সুবিধা পায়। রোগীকে এই জটিল অবস্থায় পৌঁছানোর আগেই যদি প্রতিরোধ করা না যায়, তবে ক্রিটিক্যাল রোগীর সংখ্যা আমাদের চিকিৎসা সক্ষমতার বাইরে চলে যাবে এবং চোখের সামনেই অসংখ্য প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু দেখতে হবে।

এই সংকট সমাধানে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাঠামোকে অতিরিক্ত মাত্রায় কেন্দ্রীভূত না করে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো এর স্তর বা ধাপভিত্তিক ব্যবস্থাপনা। জ্বর হওয়ার পর প্রথম দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে ‘এনএসওয়ান’ পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ এই সময়ের পর ডেঙ্গু সহজে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষ হাসপাতালের দীর্ঘ লাইন এবং খরচের ভয়ে প্রাথমিক লক্ষণগুলোকে অবহেলা করেন। তারা ভাবেন, সাধারণ জ্বর; কয়েক দিন পর এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে। যখন রোগটি শরীরের ভেতরে গুরুতর রূপ নেয়, তখন তারা শেষ সম্বল বিক্রি করে বড় হাসপাতালে যান, যা অনেক সময় রোগীর জীবন বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট নয়। এই অবহেলা ও অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ঠেকাতে কমিউনিটি পর্যায়ে বা নিম্নআয়ের মানুষের বাসস্থানের কাছাকাছি নামমাত্র মূল্যে অথবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষার সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

একবার পরীক্ষা করে ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার দক্ষ নেতৃত্বে রোগীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যদি রোগীর বড় কোনো বিপদচিহ্ন না থাকে, তাকে বাড়িতে বা নিকটবর্তী প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রেখে মশারির ভেতরে চিকিৎসা দিতে হবে। অবস্থা সামান্য জটিল হলে তাকে উপজেলা-জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে। অবস্থা অতি ঝুঁকিপূর্ণ হলে তাকে টারশিয়ারি লেভেল বা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠাতে হবে। এই ত্রি-স্তরবিশিষ্ট চিকিৎসানীতি অনুসরণ করলে বড় হাসপাতালগুলোর ওপর থেকে রোগীর বাড়তি চাপ কমবে এবং চিকিৎসকরাও জটিল রোগীদের দিকে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারবেন।

পাশাপাশি মশা নিধনের সনাতন পদ্ধতি থেকে বের হতে হবে। কিছু রাসায়নিক ধোঁয়া (ফগিং) দেওয়া কিংবা মাঝেমধ্যে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ দীর্ঘমেয়াদি সুফল দিচ্ছে না এখন। মশার বিস্তার এখন গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভারসহ দেশের বিভিন্ন পৌরসভা, উপজেলা সদর, এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামের ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরেও ছড়িয়ে পড়েছে। মশা কোনো ভৌগোলিক সীমানা মানে না। তাই দেশজুড়ে একযোগে সমন্বিত অভিযান চালাতে হবে।

সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর একাংশের পক্ষে এই বিশাল কাজ অসম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা। সরকারি চাকরির জনবল দিয়ে বা বেতনভুক্ত কর্মচারী দিয়ে ঘরের ভেতরের বা অলিগলির মশার উৎস খুঁজে বের করা সম্ভব নয়। এখানে প্রয়োজন ‘ভলান্টিয়ারিজম’ বা এক দল নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী, যারা পাড়া-মহল্লায় গিয়ে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালাবে; আক্রান্ত রোগী অনুসন্ধান এবং সবাইকে সচেতন করবে। এটিকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে। 

সিটি করপোরেশন এবং স্বাস্থ্য বিভাগের নীতিনির্ধারকরা এই বাস্তবমুখী ও কমিউনিটিভিত্তিক মডেলের প্রয়োজনীয়তা বোঝেন এবং কিছু এলাকায় পরীক্ষামূলক (পাইলট প্রজেক্ট) এর সফল প্রয়োগও করেছেন। কিন্তু ডেঙ্গুর মতো মহামারি আকার ধারণ করা রোগ প্রতিহত করতে কেবল পরীক্ষামূলক কাজ যথেষ্ট নয়। একে জরুরি জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে ঘোষণা করে দেশব্যাপী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। এ জন্য সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রচুর বাজেট, লজিস্টিকস এবং দক্ষ জনবল বরাদ্দ করতে হবে।

পরিকল্পনাহীন ও গতানুগতিক কাজ চালিয়ে গেলে প্রতিবছর ডেঙ্গুর এই মরণকামড়ে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ তাদের কর্মক্ষমতা হারাবে। অসংখ্য পরিবার তাদের স্বজনদের হারিয়ে নিঃস্ব হবে। তৃণমূল পর্যায়ে চিকিৎসা ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ এবং সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার মাধ্যমেই কেবল এই মহামারি থেকে সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব।

ডা. মুশতাক হোসেন: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ 

আরও পড়ুন

×