আবেগঘন যাত্রায়...
বিদ্যা সিনহা মিম
অনিন্দ্য মামুন
প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
চলচ্চিত্রের মানুষের জীবনকে দূর থেকে দেখলে মনে হয়, তাদের দিনগুলো যেন আলোয় মোড়া। ক্যামেরার ঝলকানি, লালগালিচা, করতালি আর সাফল্যের গল্পে ভরা এক রঙিন পৃথিবী। সেই পৃথিবীর একজন বিদ্যা সিনহা মিম। একসময় নিয়মিত সিনেমায় দেখা গেলেও এখন আর বছরে একাধিক ছবিতে অভিনয় করছেন না। কারণ সংখ্যার চেয়ে মানকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে জানালেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী এই অভিনেত্রী। গেল ঈদুল আজহায় মুক্তি পাওয়া ‘মালিক’ এবং সম্প্রতি ওটিটিতে মুক্তি পাওয়া ওয়েব ফিল্ম ‘লাইফলাইন’ দারুণভাবে ফের চর্চায় এনে দিয়েছে এই নায়িকাকে। এই চর্চার রেশ ধরে কথা হয় অভিনেত্রীর সঙ্গে। জানালেন নতুন সিনেমা নিয়ে তাঁর ভাবনা, ব্যক্তিজীবন ও অভিনয়-দর্শন। সব মিলিয়ে যেন নতুন এক মিমকেই জানা গেল, যে মিম আরও পরিণত, আরও সচেতন, আরও গতিময়।
মিম আপাতত নিজের শিল্পীসত্তাকে বড় করে দেখছেন। তাই অপেক্ষা করেন এমন এমন গল্পের, যা তাঁকে একজন অভিনেত্রী হিসেবে নতুন করে চ্যালেঞ্জ জানাবে। যদিও এই অপেক্ষা সহজ নয়। কারণ দর্শকের প্রত্যাশা, প্রযোজকের হিসাব, সময়ের চাপ–সবকিছুর মাঝেও নিজের অবস্থানে অটল থাকা কঠিন। কিন্তু মিম সেই কঠিন পথটিই বেছে নিয়েছেন। কারণ, তাঁর কাছে অভিনয় শুধু পেশা নয়, দায়িত্বও।
একসময় বড়পর্দার নিয়মিত মুখ ছিলেন তিনি। এরপর ধীরে ধীরে সিনেমার সংখ্যা কমাতে থাকেন। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, কেন ‘পরাণ’-এর সেই মুগ্ধ করা অভিনেত্রীকে নিয়মিত দেখা যাবে না?
মিম অবশ্য এসব প্রশ্নকে কখনও এড়িয়ে যাননি। বরং শান্ত কণ্ঠেই নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর কথায়, জনপ্রিয় থাকার জন্য কাজ করার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন ভালো কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার।
সেই ভালো কাজের তালিকায় সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে ওটিটির ‘লাইফলাইন’। বাবা-মেয়ের সম্পর্ক, দায়িত্ববোধ, ভালোবাসা আর জীবনের অনিবার্য বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্র মুক্তির পর থেকেই দর্শকের প্রশংসা কুড়িয়েছে। সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন চলচ্চিত্র-আড্ডায় আলোচনায় এসেছে ছবিটির গল্প এবং অভিনয়।
তবে মিম জানিয়েছেন, লাইফলাইনের চরিত্রটি যেন নিজের জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। বাস্তব জীবনে বাবা-মায়ের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যে দুশ্চিন্তা, ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধ তৈরি হয়েছে, সেটিই যেন পর্দায় আরও গভীরভাবে অনুভব করেছেন মিম। সেইসঙ্গে দর্শকের প্রশংসা। সবকিছু মিলিয়ে মিমকে এলোমেলো করে দিয়েছে এসব প্রাপ্তি। মিম বলেন, ‘এই গল্পটা আমার পার্সোনাল লাইফের সঙ্গে কানেক্টেড,’ কথাটা বলতে বলতেই থেমে যান তিনি। তারপর ধীরে ধীরে যোগ করেন, ‘আমার বাবা-মায়েরও বয়স হচ্ছে। তারাও মাঝেমধ্যে অসুস্থ হন। সবার জীবনেই এমন সময় আসে। অনন্যা চরিত্র করতে গিয়ে আমি সেই অনুভূতিগুলো খুব কাছ থেকে অনুভব করেছি। তাই চরিত্রের ভেতরে আলাদা করে ঢুকতে হয়নি।’
এই একটি বাক্যই যেন বুঝিয়ে দেয়, কেন ‘লাইফলাইন’ মিমের কাছে অন্যরকম। অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো এখানেই। যখন অভিনয় আর বাস্তবজীবনের সীমারেখা একসময় ঝাপসা হয়ে যায়। যখন সংলাপ মুখস্থ করতে হয় না, আবেগ তৈরি করতে হয় না; কারণ অনুভূতিগুলো জীবনেরই অংশ হয়ে ধরা দেয়। মিমের ক্ষেত্রেও ঠিক সেটিই ঘটেছে।
বাস্তব জীবনে বাবা-মায়ের বয়স বাড়ছে। সময়ের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে তাঁদের জীবন। ছোটবেলায় যাঁরা সন্তানকে আগলে রেখেছেন, একসময় তাঁদের হাতই ধরে রাখতে হয়। এই চিরন্তন সত্যই ‘লাইফলাইন’-এর গল্পের কেন্দ্রবিন্দু। সেই কারণেই চরিত্রটির সঙ্গে নিজের গভীর এক আত্মিক সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন মিম। মজার বিষয় হলো, দীর্ঘদিন ধরে দর্শকরা মিমকে রোমান্টিক, গ্ল্যামারাস কিংবা বাণিজ্যিক ছবির নায়িকা হিসেবেই বেশি দেখেছেন। ‘লাইফলাইন’-এ তিনি যেন অনেক বেশি সংযত, পরিণত এবং জীবনের কাছাকাছি নিজেকে দেখিয়েছেন। ফলে পরাণের অনন্যাকেই যেন ফিরে পেয়েছেন দর্শক।
গেল ঈদে মিম অভিনীত মালিক সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। সিনেমাটিতে দুই চরিত্রে দেখা গেছে মিমকে। এরপরই পরই জীবনঘনিষ্ঠ গল্পে মিম। এমন চরিত্রে মিম তো আরও অনেক কাজের সঙ্গেই যুক্ত হতে পারেন। কিন্তু হচ্ছেন না কেন? প্রশ্নটি নতুন নয়। ‘পরাণ’-এর বিপুল সাফল্যের পর থেকেই এটি তাঁর সবচেয়ে বেশি শোনা প্রশ্ন। উত্তরে মিমের কণ্ঠে শোনা যায় দৃঢ়তা, কোনো আক্ষেপ নয়। ‘সিনেমার প্রস্তাব অনেক আসে। মানসম্মত গল্প কয়টা পাই? যেগুলো পাই, সেগুলো যদি একের পর একটা করি, তখন দর্শকই বলবেন, মান ধরে রাখতে পারিনি। আমি সেটি চাই না। আমার কাছে বছরে ডজনখানেক নিম্নমানের সিনেমা করার চেয়ে কোনো সিনেমা না করা ভালো।’ এই সিদ্ধান্তই যেন বিদ্যা সিনহা মিমকে তাঁর সমসাময়িক অনেক অভিনেত্রীর থেকে আলাদা করে দিচ্ছে।
মিম আরও বলেন, ‘দর্শক আমাকে ভালোবেসেছেন বলেই প্রত্যাশা করেন। আমি যদি সেই প্রত্যাশার মূল্য না দিই, তাহলে তো তাঁদের প্রতি সুবিচার করা হবে না। তাই সিনেমার ক্ষেত্রে আমি কখনোই আপস করতে চাই না। গল্প, চরিত্র, পরিচালক–সবকিছু আমার মন ছুঁয়ে যেতে হবে। তবেই আমি কাজ করি।’
তাঁর কথায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তিনি এখন আর শুধু একজন নায়িকা হয়ে থাকতে চান না; বরং এমন একজন অভিনেত্রী হতে চান, যাঁর প্রতিটি কাজ নিয়ে দর্শকের আগ্রহ থাকবে। যাঁর নতুন সিনেমার ঘোষণা মানেই নতুন প্রত্যাশা।
সিনেমার সংখ্যা কমলেও কাজের ব্যস্ততা অবশ্য কমেনি। দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ডের শুভেচ্ছাদূত এবং মডেল হিসেবে নিয়মিত কাজ করছেন তিনি। প্রায় প্রতি মাসেই নতুন কোনো বিজ্ঞাপনের শুটিং থাকে। ফলে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো তাঁর জন্য নতুন কিছু নয়। তবে বিজ্ঞাপনের ব্যস্ততা আর সিনেমার ব্যস্ততার মধ্যে পার্থক্য আছে। বিজ্ঞাপন তাঁকে দৃশ্যমান রাখে, কিন্তু একজন শিল্পী হিসেবে তৃপ্তি দেয় অভিনয়ই।
এই কারণেই ভালো গল্পের জন্য অপেক্ষা করতে তাঁর আপত্তি নেই। অভিনয়ের বাইরে বিদ্যা সিনহা মিমের আরেকটি পরিচয়ও রয়েছে, তিনি দুর্দান্ত পারিবারিক মানুষ। সামাজিক মাধ্যমে তাঁর ছবি দেখলে সহজেই বোঝা যায়, অবসর সময়ের সবচেয়ে বড় আনন্দ পরিবারকে ঘিরেই। কখনও স্বামী সনি পোদ্দারের সঙ্গে দেশের বাইরে, কখনও আবার বাবা-মাকে নিয়ে ছোট্ট কোনো ভ্রমণ–এই মুহূর্তগুলোই তাঁর সবচেয়ে প্রিয়।
নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খুব বেশি কথা বলতে পছন্দ করেন না তিনি। তবে পরিবারের প্রসঙ্গ উঠতেই কণ্ঠে অন্যরকম উষ্ণতা চলে আসে। মিম বলেন, ‘পারিবারিকভাবে আমি একজন সুখী মানুষ। কাজ না থাকলে আমি পরিবার নিয়ে আনন্দে মেতে থাকি। আমি ঘুরতে ভালোবাসি। সময় পেলেই আমি আর সনি বেরিয়ে পড়ি। অনেক সময় বাবা-মাকেও সঙ্গে নিয়ে যাই। সেই মুহূর্তগুলোর কিছু ছবি ফেসবুকে শেয়ার করি। ভালো লাগে।’
গেল মাসে ছোট বোন প্রজ্ঞা সিনহা মমিকে নিয়ে মালয়েশিয়া ঘুরে এলেন। সেই ছবিও সামাজিক মাধ্যমে দিয়েছেন মিম। বললেন, ‘আমার বোন কানাডায় পড়াশোনা করে। সে দেশে এসেছে। তাই পরিবার ও বোনকে নিয়ে মালয়েশিয়ায় দারুণ সময় কাটিয়ে এলাম।’
এই সরল স্বীকারোক্তিতেই যেন ধরা পড়ে তাঁর ব্যক্তিজীবনের দর্শন। চকচকে তারকাজীবনের বাইরে তিনি আসলে খুব সাধারণ কিছু সুখে বিশ্বাস করেন। পরিবার, ভ্রমণ, কাছের মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো–এসবই তাঁকে নতুন করে কাজের শক্তি জোগায়।
- বিষয় :
- বিনোদন