ঢাকা শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

প্রথম বিশ্বকাপ বিজয়

নতুন বাংলাদেশের বিচ্ছুরণ

নতুন বাংলাদেশের বিচ্ছুরণ
×

--

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৪:২৪

অনূর্ধ্ব উনিশ ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনালে রোববার বাংলাদেশ দল শুধু 'বিজয়ী' হয়েছে বললে সবটুকু বলা হয় না। আমরা নিশ্চয়ই বিশ্বকাপ শিরোপা ঘরে তুলেছি; কিন্তু এই দলকে কেবল 'চ্যাম্পিয়ন' আখ্যা দিয়ে সবটুকু বোঝানো যায় না। দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুমে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের এই বিজয় নানা অর্থেই 'ঐতিহাসিক'। সন্দেহ নেই, এর আগেও ক্রিকেটের শিরোপা এসেছে বাংলাদেশে। ২০১৮ সালে আমাদের নারী ক্রিকেট দল এশিয়া কাপ জয় করেছিল। তারও আগে ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ তৎকালীন অবস্থানে সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে জিতেছিল আইসিসি ট্রফি। কিন্তু তা ছিল মূল বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব এবং আইসিসির সহযোগী সদস্য হিসেবে তাতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম আমরা। বাড়তি পুরস্কার হিসেবে ওই বছরই পূর্ণাঙ্গ ওডিআই দলের মর্যাদা পেয়েছিল বাংলাদেশ। সমালোচকের মুখে ছাই দিয়ে তার বছর তিনেকের মাথায় আমরা পেয়েছিলাম টেস্ট দলের মর্যাদা। কিন্তু পরবর্তী দুই দশক যেন কেবলই আশা আর আশা ভঙ্গের ইতিহাস। আমাদের জাতীয় দল গত দুই দশকে একবারই বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল। আর এশিয়া কাপেও রানার্স আপ হয়েছিল অন্তত তিনবার। কিন্তু শিরোপা অধরাই রয়ে গিয়েছিল। হোক অনূর্ধ্ব ১৯ দল, বৈশ্বিক পর্যায়ে শিরোপার খরা তো তারাই কাটিয়ে দিলো! এটাই বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথম বিশ্বকাপ বিজয়।

সমকাল পরিবারের পক্ষে আমরা অনূর্ধ উনিশ বিশ্বকাপ বিজয়ী দলকে অভিনন্দন জানাই। বস্তুত রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর তাৎক্ষণিক অভিনন্দন বার্তার মধ্য দিয়ে গোটা জাতির উচ্ছ্বাসই প্রতিফলিত হয়েছে। 'জুনিয়র' ক্রিকেট দলের এই সাফল্য অভিনন্দিত হয়েছে জাতীয় সংসদেও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিক্রিয়ার মধ্যেও আমরা দেখতে পাই, গোটা জাতি কীভাবে এই সাফল্য উদযাপন করছে। সুদূর দক্ষিণ আফ্রিকার ওই মাঠে উপস্থিত বাংলাদেশি নাগরিক ও সমর্থকরা যেন গোটা জাতির আনন্দেরই প্রতিফলন ঘটিয়েছে। আমরা মনে করি, অনূর্ধ্ব উনিশ দলের প্রত্যেক খেলোয়াড় ছিল এক নতুন বাংলাদেশের প্রতিনিধি।

আমরা দেখেছি, রোববারের এই বিজয় সহজ ছিল না। বিশেষত ভারতের মতো ক্রিকেট পরাশক্তির বিরুদ্ধে এমন একটি জয় আনতে গিয়ে আমাদের দলের খেলোয়াড়দের যথেষ্ট লড়াই করতে হয়েছে। বিশেষত পারভেজ হোসেন ইমন যেভাবে পায়ের পেশিতে অসহ্য যন্ত্রণা নিয়েও দল ও দেশকে জেতাতে ব্যাট করে গেছেন, তার তুলনা খুব বেশি নেই। আমাদের দেশের মাশরাফি বিন মুর্তজা ও ভারতের শচীন টেন্ডুলকারের ক্ষেত্রেও আমরা এই চিত্র দেখেছিলাম। অনূর্ধ্ব উনিশ দলের অধিনায়ক আকবর আলী যেভাবে ঠান্ডা মাথায় দলকে ঐতিহাসিক জয় এনে দিয়েছেন, তা অনবদ্য। সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই 'পরামর্শ' অত্যুক্তি হতে পারে না যে, জাতীয় ক্রিকেট দলেরও শেখার রয়েছে কনিষ্ঠ দলটির কাছে। বস্তুত ওডিআই অধিনায়ক মাশরাফি নিজেই এই দলের কাছ থেকে শেখার স্বীকারোক্তি দিয়েছেন ফেসবুক পোস্টে। বিশ্বকাপ বিজয়ী দলের সব খেলোয়াড়, কোচ, কর্মকর্তা ও সহযোগী সবাইকে সাধুবাদ জানাই এই সামষ্টিক নৈপুণ্যের জন্য। আমরা প্রত্যাশা করি, অনূর্ধ্ব উনিশ বিশ্বকাপের বিজয় জাতীয় দলকেও অনুপ্রাণিত করবে মূল বিশ্বকাপ বিজয়ে।

দেশে প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা যে সময়ে এলো, তাও নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। অস্বীকারের অবকাশ নেই যে, বাংলাদেশ ক্রিকেট এক ঝোড়ো হাওয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ দলের অন্যতম স্তম্ভ বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান গত অক্টোবরে দীর্ঘ সময়ের জন্য মাঠের বাইরে গেছেন। ভরসার অন্যান্য সারথি তামিম ইকবাল ও মুশফিকুর রহিম যথাক্রমে নভেম্বরের ভারত সফর ও চলমান পাকিস্তান সফরে যোগ দিতে না পারায় আমরা কাঙ্ক্ষিত ফল দেখতে পাইনি। তারও আগে বাংলাদেশ ক্রিকেটের চিরচেনা সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বিরোধের চিড় ধরেছিল ধর্মঘটকে কেন্দ্র করে। এমন প্রেক্ষাপটে অনূর্ধ্ব উনিশ দলের ঐতিহাসিক জয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট দিগন্তে জমা হওয়া কালো মেঘ কেটে গেছে।

আমরা জানি, যুব দলগুলো থেকে ধাপে ধাপে জাতীয় দলে ক্রিকেটার যুক্ত হয়। আমরা অনূর্ধ্ব উনিশের বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশের যে বিচ্ছুরণ দেখতে পেলাম, তা সামনের দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে বলে প্রত্যাশিত। আমরা দেখতে চাইব, আগামী ওয়ানডে বিশ্বকাপে এই তরুণ খেলোয়াড়রাই বাংলাদেশকে ভরসা জোগাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমাদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। বিজয়ে যেমন আনন্দে উদ্বেলিত হই, পরাজয়ে যেন নেতিবাচক অবস্থান না নেই। বিসিবিকেও নতুন খেলোয়াড়দের গড়ে তোলায় আন্তরিক ও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, যে জাতি মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করতে পারে, চাপমুক্ত থাকলে তার ক্রিকেট দলও যে কোনো দিনকে নিজের করে নিতে অবশ্যই সক্ষম।

আরও পড়ুন

×