ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

উচ্চারণের বিপরীতে

সংবাদমাধ্যমের সত্য ও প্রশ্ন করার পরিসর

সংবাদমাধ্যমের সত্য ও প্রশ্ন করার পরিসর
×

মাহবুব আজীজ

মাহবুব আজীজ

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৪ | ২৩:৫৪ | আপডেট: ২৮ অক্টোবর ২০২৪ | ২৩:৫৪

সংবাদমাধ্যম ঘিরে সম্প্রতি এক সভায় গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ফ্যাসিবাদের বয়ান বনাম গণমানুষের গণমাধ্যম’ শীর্ষক শনিবারের সভাটির আয়োজক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পর্যালোচনা প্ল্যাটফর্ম ‘জুলাই গণপরিসর’। আলোচনায় উঠে আসে: ‘গণমাধ্যম কেবল সরকার ও রাষ্ট্রের দাসত্ব করেনি। গণমাধ্যমের মূল সমস্যা অসত্য বলতে বলতে মানুষের আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। আস্থা ফেরানোর পদ্ধতি একটাই– সত্য বলা। সাংবাদিকতা করতে পারলে, জবাবদিহির জায়গা তৈরি করা গেলে ভবিষ্যতে ফ্যাসিজম আসবে না’ (প্রথম আলো, ২৭ অক্টোবর ২০২৪)।
প্রশ্ন হচ্ছে, সংবাদমাধ্যম কখন অসত্য বলে? পেশাদার সাংবাদিককে অসত্য বলতে হয় কেন? নিকট অতীতের বাস্তবতা কী বলে? সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রেস অফিসের কাজ ছিল নজরদারি এজেন্সির ভূমিকা পালন করা– মন্তব্য করে বর্তমান প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সভায় বলেন, ‘ওদের কাজ ছিল সংবাদ কীভাবে নামানো যায়। সংবাদ হত্যার কাজ যে শুধু সরকার করেছে তা নয়, বেসরকারি খাতও ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষার জন্য স্বেচ্ছায় এই কাজ করেছে।’ 

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্বের শুরু আওয়ামী লীগের হাতেই; ১৯৭৫ সালে কেবল চারটি পত্রিকা রেখে বাকিগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে বাস্তবতা হচ্ছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর থেকে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসবার আগ পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমে ‘পাকিস্তানি বাহিনী’ শব্দটি উচ্চারণ করা যেত না, বলতে বা লিখতে হতো ‘হানাদার বাহিনী’। ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি উচ্চারণও নিষিদ্ধ ছিল। আশির দশকে জেনারেল এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনে সংবাদমাধ্যমের ওপর নানা খড়্গ নেমে আসে; পত্রিকা নিষিদ্ধ হয়, বিটিভি ও রেডিও বাংলাদেশ নিম্নমানের সরকারি প্রচারযন্ত্রে পরিণত হয়।

এরশাদ সরকার পতনের পর গণতান্ত্রিক শাসনামলে– যথাক্রমে খালেদা জিয়া (১৯৯১ ও ২০০১) ও শেখ হাসিনার (১৯৯৬) প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় সংবাদমাধ্যম তুলনামূলকভাবে কিছুটা স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারলেও প্রধানমন্ত্রীর প্রেস অফিস ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তদারকি ছিল। তবে তা মাত্রাছাড়া হয়নি। এরপর ‘ওয়ান ইলেভেন’ সরকারের সময় (২০০৭-০৮) নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম এবং আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে সাংবাদমাধ্যমের ওপর পূর্ণমাত্রায় নিয়ন্ত্রণচেষ্টা থেকে পুরোনো আপ্তবাক্যটি সত্য হয়ে উঠতে থাকে– একটি দেশে কতটা গণতন্ত্র আছে, তা দেশটির গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দেখে বোঝা যায়! 

২০১৪ সালে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও কারসাজির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখলকারী আওয়ামী লীগ সংবাদমাধ্যমে কঠোর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। স্বার্থান্বেষী সাংবাদিকরা সেই উদ্যোগে সহযোগী হন। পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ যত বেশি অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী হয়েছে, সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে তত বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আওয়ামী বয়ানে সমালোচনাকারী মানেই ছিল ‘উন্নয়নবিরোধী’ ও ‘জঙ্গি’। নিজেদের অপকর্ম, দখলদারিত্ব ও অগণতান্ত্রিক আচরণ আড়াল করতেই সংবাদমাধ্যমে সত্য কথন নিয়ন্ত্রণ করা হতো। 

১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও রেডিও বাংলাদেশের সংস্কারকল্পে তৎকালীন সচিব আসাফউদদৌলাকে প্রধান করে একটি কমিশন গঠন করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। যথাযথ বিকাশ ও গুরুত্ব তৈরির জন্য টেলিভিশন ও বেতারের স্বায়ত্তশাসনের সুপারিশ করে ওই কমিশন। ২৭ বছর ধরে সেই সুপারিশ পড়ে থাকে; বিটিভি ও  বেতার ‘সাহেব-বিবি-গোলামের বাক্স’ হয়েই থাকে। জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার রক্তে যখন রাজপথ ভেসে যাচ্ছে, তখন বিটিভিতে ‘বাতাবিলেবুর বাম্পান ফলন’ প্রচার হতে থাকে। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা রামপুরায় বিটিভি ভবন ভাঙতে জড়ো হয়।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিটিভি বছরে সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা আর বাংলাদেশ বেতার ২০০ কোটি টাকার বাজেটে দিব্যি উন্নয়নের সোনার পাথর বাটির গল্প প্রচার করতেই থাকে। অন্যদিকে হুমকি-ধমকি আর সরকারি বিজ্ঞাপনের ফাঁদে সংবাদমাধ্যমকে আটকে ফেলে সরকার। আরও নানা মহলের স্বার্থ রক্ষাসহ সব মিলিয়ে সংবাদমাধ্যমে সত্য থাকে অনুপস্থিত। এরপরও কয়েকটি সংবাদমাধ্যম সাধ্যমতো সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতায় সচেষ্ট আছে ও থাকে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের প্রেক্ষিত তৈরিতে প্রতিকূল ও দমবন্ধ পরিবেশেও পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম। এই সত্যও ইতিহাসের অংশ।
৫ আগস্টের পর স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশে জাতির অন্যতম আকাঙ্ক্ষা– কথা বলবার স্বাধীনতা নিশ্চয়ই আর বাধাগ্রস্ত হবে না। সংবাদমাধ্যমও কোনোভাবে সরকারি নিয়ন্ত্রণের আওতায় আসবে না। সকলেই যে যার মতামত নির্ভয়ে প্রকাশ করবেন। বিটিভি ও বেতারের স্বায়ত্তশাসনের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার আদৌ কিছু ভাবছে? নাকি প্রতিষ্ঠান দুটির স্বায়ত্তশাসন নিয়ে কমিশন রিপোর্ট ২৭ বছর ধরে যেভাবে পড়ে আছে, সেভাবেই পড়ে থাকবে? 

বাস্তবে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর বিটিভি আর বেতারে কোনো পরিবর্তন হয়নি। সেই ক্ষমতাসীনদের বক্তৃতা, বিবৃতি। আওয়ামী লীগ আমলে বিটিভির সংবাদে সরকারপ্রধান ও মন্ত্রীদের ছবি ও বক্তৃতা প্রাধান্য পেত; বর্তমানে সরকারপ্রধান, উপদেষ্টাবৃন্দ, ছাত্রনেতাদের পাশাপাশি বিএনপি ও জামায়াতের প্রধান নেতাদের ছবি-বক্তৃতা প্রচার হয়। দ্রব্যমূল্যে পিষ্ট সাধারণ মানুষের জীবন, নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, স্বাস্থ্য-শিক্ষার অব্যবস্থাপনার খবর বিটিভি ও বেতারে অনুপস্থিত। কেন? 

২.
কেবল সরকারি চাপে নয়; এর পাশাপাশি নানা রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় দল-গোষ্ঠীর চাপ ও প্রতিক্রিয়ার সামনে সংবাদমাধ্যম অনেক সময় প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়ে। আগে যেমন আওয়ামী লীগ বয়ানের বিপক্ষে কথা বললেই ‘রাজাকার’ বা ‘বিএনপি-জামায়াত’ বলে চিহ্নিত করা হতো; বর্তমানে তেমনই নানাভাবে ‘ক্ষমতাশালী’ পক্ষের সমালোচকদের যথেচ্ছভাবে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে সামাজিকমাধ্যমে। সংবাদমাধ্যমের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব বস্তুনিষ্ঠ অনুসন্ধান ও গঠনমূলক সমালোচনা। আর ক্ষমতা ও দায়িত্বমাত্রই পদে পদে জবাবদিহি, প্রশ্ন ও সমালোচনার মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকা। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। 
সংবাদমাধ্যমের ভূমিকাও সমালোচনার বিষয় হতে পারে। কিন্তু সংবাদমাধ্যমকে শত্রু মনে করে তা বন্ধ বা তার ওপর হামলা গণতান্ত্রিক মানসিকতা হতে পারে না। ক্ষমতা কাঠামোকে সংযত ও গণতান্ত্রিক রাখবার প্রয়োজনেই স্বাধীন ও মুক্ত সংবাদমাধ্যম প্রয়োজন; অংশী সকলের দায়িত্ব সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় সচেষ্ট হওয়া। পারস্পরিক অবিশ্বাস ও অভিযোগ হানাহানি তৈরির পাশাপাশি গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষুণ্ন করে।

৩.
সর্বগ্রাসী ক্ষমতা নিজের চারপাশে অন্যায় সুযোগ ছড়িয়ে সকল প্রতিষ্ঠানে নিজের কর্তৃত্ব কায়েম করে। আওয়ামী লীগ গত দেড় দশকে তা-ই করতে চেয়েছে। ফলাফল হিসেবে আমরা বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হতে দেখি। সংবাদমাধ্যমও ব্যতিক্রম নয়। সরকারি সংবাদমাধ্যমে তো বটেই, বেসরকারি পর্যায়েও দলীয় ও গোষ্ঠীগত প্রাধান্য ব্যক্তিপূজায় পর্যবসিত হয়েছে। সরকারপ্রধানকে এমন অবস্থায় পৌঁছানো হয়েছিল যে, তিনি সকল সমালোচনার ঊর্ধ্বে। এমন পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে মূল ব্যক্তি স্বয়ং সরকারপ্রধানই ছিলেন; বাকি সবই অনুঘটক। অনুঘটকরা ছিলেন সুবিধালোভী। প্রধানমন্ত্রীর প্রায় প্রতিটি বিদেশ সফর শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন তৈলবাজিতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠত! পেশাদার সাংবাদিক তৈলবাজি করেন না। করতে পারেন না।
সমাজে প্রশ্ন করবার পরিসর থাকতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের যথাযথ উত্তর বা ব্যাখ্যা দিতে হবে। সমালোচনার উত্তরে, তিনি যে-ই হোন না কেন, ক্রুদ্ধ হয়ে প্রতিশোধপ্রবণ হয়ে উঠতে পারবেন না। সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যম প্রকাশিত সংবাদ ও মতামতের জন্য হুমকি-ধমকি বা হয়রানির মুখোমুখি হবেন না তখনই, যখন দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র থাকবে। আমাদের দেশে কি সেই গণতন্ত্র কোনো দিন দেখতে পাব? 

মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল; সাহিত্যিক 
[email protected]

আরও পড়ুন

×