ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

দুর্যোগ

বন্যা মোকাবিলায় পূর্বপ্রস্তুতির দায়

বন্যা মোকাবিলায় পূর্বপ্রস্তুতির দায়
×

এম এ হালিম

এম এ হালিম

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৫ | ০০:৪৯

এবার কালবৈশাখী ও ঘূর্ণিঝড় মৌসুম (মার্চ-মে) বলা চলে উল্লেখযোগ্য কোনো দুর্যোগ ছাড়াই পার হয়েছে। চলমান বন্যা মৌসুম অন্তত আগস্ট পর্যন্ত থাকার কথা। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ফেনী ও নোয়াখালীতে বন্যা দেখা দিয়েছে। অনেককেই দুর্ভোগের শিকার হয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হয়। বৃষ্টিপাত কমায় এখন বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও বর্ষা মৌসুম বিধায় অতি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে যে কোনো সময় পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ২ হাজার ২০০ মিলিমিটার। পরিবেশের ‘পরিশোধন’, বন ও গাছপালার সতেজতা, বন্যপ্রাণীর সতেজতা (রিফ্রেশ) ও তাদের উপযোগী পরিবেশ প্রতিষ্ঠায় বৃষ্টি ভূমিকা পালন করে। নদী ও জলাধার পরিপূর্ণ হওয়া, কৃষিজমিতে পলি জমায় ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি ইত্যাদিতে বৃষ্টির অবদান অনেক। তবে নিয়মিত নদী সংস্কার না করা ও মানুষের বিরূপ আচরণের ফলে ছোট-বড় নদী ভরাট হওয়ায় অল্প বৃষ্টিতেই এখন বন্যা হচ্ছে। কারণ নদী বা জলাশয়ের পানি ধারণ ক্ষমতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। 

এ বছর ফেনীর বন্যার কারণ অনেকাংশে গত বছরের আগস্টের বন্যার মতোই। অর্থাৎ প্রবল বৃষ্টি ও উজান থেকে আসা ঢল। গত বছর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ সঠিকভাবে মেরামত না করা, অন্য বাঁধগুলোর অবস্থা যথাযথ মনিটরিংয়ের অভাব এবং প্রয়োজনীয় মেরামত না করাও এর কারণ। শনিবারের সমকালের সংবাদে বলা হয়েছে, ফেনীতে বিভিন্ন বাঁধের ২২টি অংশ ভেঙে গেছে। এসব ভাঙা অংশ দিয়ে পানি ঢুকে অনেক গ্রাম তলিয়ে গেছে। গত বছরের আগস্টে বন্যার পর বলা হয়েছিল, শীত মৌসুমে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত করা হবে। তা কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে এবং বাস্তবায়িত কাজের মান নিয়ে জনমনে অতীতের মতোই প্রশ্ন রয়ে গেছে। এ আশঙ্কা শুধু ফেনীর বাঁধ নয়, দেশের অনেক নদীর বাঁধের বেলায়ও প্রযোজ্য। সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন জেলার বাঁধ ইতোমধ্যে ভেঙে যাওয়ায় বাঁধ-সংলগ্ন গ্রামবাসী দুর্ভোগের শিকার হয়েছে। 

বন্যা হলে দুর্গত মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু এ কেন্দ্রের সংখ্যা অপর্যাপ্ত বিধায় প্রয়োজনের সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সাময়িক আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ফলে এসব কেন্দ্রে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। এ ছাড়া আশ্রয় গ্রহণকারীদের সম্পদ ও নারীদের নিরাপত্তার বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিবেচনায় বন্যাপ্রবণ এলাকায় পর্যাপ্ত পরিকল্পিত বহুমুখী আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের বিষয়টি দীর্ঘদিনের দাবি। 

বন্যায় অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াও মৎস্য খামার ডুবে যাওয়ায় মাছচাষিরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন। অথচ আগাম প্রস্তুতি হিসেবে বর্ষা মৌসুমের আগেই খামারের (পুকুর কিম্বা বিল) পাড় উঁচুকরণ অথবা জাল দিয়ে ঘিরে রাখলে এ ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। বন্যায় সমুদ্রতীরবর্তী কৃষিজমিতে নোনাপানি ঢোকার ফলে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়া নিয়মিত অভিজ্ঞতা। তাই এ সমস্যা সমাধানে সরকারি উদ্যোগে বন্যা প্রতিরোধ বাঁধ নির্মাণ ও নিয়মিত মেরামত নিশ্চিত করতে হবে। এ কাজে স্থানীয় প্রশাসন ও কমিউনিটিকে উদ্যোগী হতে হবে। দুর্যোগ, বিশেষত বন্যার বড় শিকার কৃষি খাত। এ জন্য বিশ্বের অনেক দেশের মতো কৃষি বীমা প্রচলনের জন্য ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে। বন্যার সময় ও বন্যার পর বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকটে দুর্গত এলাকায় পানিবাহিত রোগ একটি সাধারণ সমস্যা। এ ছাড়া নদীভাঙনের ফলে প্রতিবছর অনেক ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি হারানোর ঘটনা ঘটে, যা বাস্তুচ্যুতির কারণ।

গত বছর বন্যায় সরকারি হিসাব অনুসারে আর্থিক ক্ষতি হয় ১৪ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এবং আগাম সতর্ক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলে বন্যার ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে আনা সম্ভব। জাতিসংঘের ‘সবার জন্য পূর্বসংকেত’ ক্যাম্পেইনকে জোরদার করার মাধ্যমে সংকেত ব্যবস্থাকে বিপদাপন্ন মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। অভিজ্ঞতা বলছে, দুর্যোগের পর উন্নয়ন সংস্থাগুলো যার যার মতো সমন্বয়হীনভাবে জরিপ পরিচালনা এবং নিজস্ব অগ্রাধিকার অনুসারে সহযোগিতার তালিকা প্রণয়ন করে থাকে, যা অনেক সময় ক্ষতিগ্রস্তদের প্রকৃত উপকারে আসে না। ফলে কোনো ক্ষেত্রে অনেক পরিবার একাধিক সংস্থা থেকে সহযোগিতা পায়। আবার অনেক পরিবার জরুরি সময়ে কোনোই সাহায্য পায় না। এ বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

বন্যাসহ যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় সক্ষমতা জরুরি। সরকারের দুর্যোগবিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলির (এসওডি) আওতায় স্থানীয় (ইউনিয়ন, ওয়ার্ড) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি (ডিএমসি) এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাস্তবে এসব কমিটির অধিকাংশই সক্রিয় নয়। বিষয়টি লক্ষণীয়। ডিএমসিগুলোকে সক্রিয় রাখতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, মহড়ার আয়োজন এবং উপকরণ নিশ্চিতকল্পে পরিকল্পনাভুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া বন্যাপ্রবণ এলকায় স্থানীয় প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দানের বিষয়ও জরুরি। 
প্রান্তিক ও বিপদাপন্ন জনগোষ্ঠীর জন্য সহজবোধ্য পূর্ব-সংকেত প্রচলন, সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর (ডিএমসি, প্রস্তাবিত স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী) সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে শক্তিশালীকরণ এবং পারিবারিক প্রস্তুতি গ্রহণের মাধ্যমেই সম্ভব দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাস, ক্ষয়ক্ষতি প্রশমন এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতি থেকে উত্তরণের মাধ্যমে সম্ভব এ মৌসুমে সম্ভাব্য বন্যা মোকাবিলা। এ জন্য প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ ও অংশগ্রহণ।  
 
এম এ হালিম: সাবেক পরিচালক, 
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি
[email protected] 

আরও পড়ুন

×