জলাশয়
হাওরের উন্নয়নে সঠিক পরিকল্পনা চাই
সালেহিন চৌধুরী শুভ
সালেহিন চৌধুরী শুভ
প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৫ | ০০:১৫
হাওর এক ধরনের স্বতন্ত্র প্রাকৃতিক সত্তা, যা জমি, বিল ও কান্দার সমন্বয়ে গঠিত। বর্ষাকালে এটি পানিতে একাকার হয়ে বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয়। অন্যান্য জলাভূমির চেয়ে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের হাওরগুলো একসময়ের অখণ্ড কালিদহ সাগরের একেকটি অংশ। অখণ্ড জলাশয়ে ছিল অসংখ্য চর ও কান্দা। এসবের মধ্যে বসতি স্থাপনের পর জনবসতি পরস্পর যুক্ত হয়ে গ্রাম গঠিত হয়। পরে গ্রামের সঙ্গে গ্রাম যুক্ত হওয়ার জন্য তৈরি করা হয় রাস্তা। কালক্রমে গ্রামকে কেন্দ্র করে শহর-বন্দরও গড়ে ওঠে। এভাবেই অখণ্ড জলাশয় ভাগ হয়ে তৈরি হয় ভিন্ন ভিন্ন হাওর। বর্ষায় ছোট-বড় হাওর যুক্ত হয়ে মিশে যায়। তখন ওপর থেকে দেখলে সাগরের মতো এবং শহর-গ্রামগুলোকে মনে হয় দ্বীপ।
হাওরগুলোর মধ্যবর্তী সমভূমি, জনবসতি, গ্রাম-শহর, তীরবর্তী সমভূমি ও পাহাড়ি ভূমি, হাওরনির্ভর অঞ্চলসহ দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত জেলাকে একত্রে হাওরাঞ্চল নামে অভিহিত করা হয়। জেলাগুলো চারটি প্রশাসনিক বিভাগের অধীনে হলেও পরস্পর যুক্ত।
হাওরগুলো বেসিনের মতো, চারদিকে উঁচু ভূমি ক্রমশ নিচু হয়ে গেছে। চারদিকের উঁচু ভূমি, যা কান্দা নামে পরিচিত এবং মাঝখানে বিল নামে জলাশয়, যেখানে সারাবছর পানি থাকে। আবার অনেক হাওরের মাঝখানে বা ভেতরের দিকেও কান্দা রয়েছে। বিলও রয়েছে একাধিক। হাওরের মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ ভূমি বোরো জমি, যা একাধিক ধাপে বিন্যস্ত। হাওরের বোরো জমিগুলো উচ্চতাভেদে পাঁচ-সাত মাস পানির নিচে থাকে। নিচু জমি আগে পানিতে তলিয়ে যায়, দেরিতে জেগে ওঠে। উঁচু জমি দেরিতে তলিয়ে যায়, আগে জেগে ওঠে। হাওরের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত পানি, কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, কান্দা, জলাবন ও জনবসতি। আবার হাওরের মধ্যে জনবসতি বা গ্রামগুলো থাকায় জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত সব বিষয়ই হাওরের সঙ্গে পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত। এর মধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ।
হাওরগুলো দেশের মিঠাপানির বৃহৎ আধার। মিঠাপানি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। ধান চাষ, মাছ উৎপাদন, পরিবেশ-প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য, জীবনযাত্রা, নৌ-যোগাযোগ এবং লবণাক্ততা প্রতিরোধ– প্রতিটি ক্ষেত্রেই মিঠাপানির অবদান ব্যাপক। হাওরের কৃষি মূলত বোরো ধান চাষ, যা হাওরবাসীর প্রধান পেশা। দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও হাওরের বোরো ফসল কাটার মৌসুমে পানিতে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। ফসল রক্ষায় ষাটের দশকে হাওরগুলোর চারদিকে বেড়িবাঁধ তৈরি করা হয়। বাঁধগুলো প্রতিবছর সংস্কার, মেরামত ও পুনর্নির্মাণ করা হয়। কয়েক বছর ধরে বাঁধগুলো উঁচু করা হচ্ছে। ফসল রক্ষায় সাময়িক সমাধান হিসেবে প্রয়োজন হলেও বেড়িবাঁধ হাওরে অনেক সংকট তৈরি করেছে। নদীর স্রোতের সঙ্গে উজান থেকে আসা পলিতে হাওরাঞ্চলের নদীগুলো ইতোমধ্যে অনেকটা ভরাট হয়ে গেছে। আবার বাঁধের মাটিতে প্রতিবছর নদীর তলদেশ ভরাট হচ্ছে। এতে অকালবন্যার ঝুঁকি আরও বাড়ছে। তাই হাওরের বোরো ফসলকে স্থায়ীভাবে ঝুঁকিমুক্ত করতে নদী খননই একমাত্র সমাধান। মেঘনা, সুরমা, কুশিয়ারাসহ হাওরাঞ্চলের নদীগুলো খনন করতে হবে। হাওরের অপর গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো মৎস্য। মূলত বিল থেকে আহরিত হলেও বর্ষায় সারা হাওরই মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র। ফসল রক্ষায় বেড়িবাঁধগুলো উঁচু থাকায় হাওরে অবাধ পানি প্রবেশে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। বাঁধের কারণে হাওর ও নদীর সংযোগকারী অনেক খাল বন্ধ হয়ে আছে। ফলে হাওরে স্রোত না হওয়ায় মাছের প্রজননে বিঘ্ন ঘটছে। এ ছাড়াও কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহার, অবৈধ উপকরণ দিয়ে মাছ ধরা, বিল শুকিয়ে ফেলা, ত্রুটিপূর্ণ ইজারা পদ্ধতি, জলাবন না থাকা প্রভৃতি কারণেও হাওরগুলো প্রায় মাছশূন্য। বর্ষায় হাওরে অবাধ পানিপ্রবাহ নিশ্চিতকরণ, বিল ও হাওরের ভেতরের নদী খননসহ বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করে সঠিক নীতি প্রণয়ন ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করলে হাওরগুলো মৎস্য সম্পদে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
হাওরের সামগ্রিক ভারসাম্যের জন্য কান্দা গুরুত্বপূর্ণ। একসময় কান্দাগুলোয় জলাবনকেন্দ্রিক সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য ছিল। ইদানীং ঘাস কমে গেলেও কান্দাগুলো শুকনার সময় বিপুলসংখ্যক গরু, ভেড়া ও ছাগলের বিচরণক্ষেত্র হয়ে ওঠে। সচেতনতা ও তদারকির অভাবে ইতোমধ্যে জলাবনশূন্য হওয়া কান্দাগুলো প্রতিবছর মাটি কাটায় বিলীন হচ্ছে। কান্দায় জলসহিষ্ণু হিজল, করচ, জালিবেত, মুর্তা, হোগলা প্রভৃতি উদ্ভিদ রোপণের মাধ্যমে সমৃদ্ধ জলাবন তৈরি করা সম্ভব। জলাবনকেন্দ্রিক কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। উচ্চমাত্রায় কার্বন ধরে রাখতে সক্ষম করচবাগ বৃদ্ধির মাধ্যমে হাওরগুলো আন্তর্জাতিক কার্বন বাণিজ্যে অবদান রাখতে পারে। জলাবনে প্রাপ্ত কাঁচামালে হাওরাঞ্চলে কুটিরশিল্পেরও বিকাশ ঘটবে। প্রাণিসম্পদ বৃদ্ধির জন্য হাওরে জলজ ঘাস চাষ সম্প্রসারণ করতে হবে। আবাসন তথা বসবাসেও হাওর ব্যবহৃত হয়। বড় প্রতিটি হাওরে অনেক গ্রাম রয়েছে। মাঝারি আকৃতির হাওরে এক বা একাধিক গ্রাম রয়েছে। ছোট হাওরগুলোর মধ্যেও পার্শ্ববর্তী গ্রামের পাড়া বা বর্ধিত বসতি রয়েছে। গ্রামগুলোতে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠায় হাওরের বুক চিরে সড়ক নির্মাণের ফলে এগুলো বৈশিষ্ট্য হারিয়ে প্রায় রুগ্ণ হয়ে যায়। একসময় হাওরের মধ্যে জনবসতি গড়ে উঠলেও প্রকৃতি ও পরিবেশের জন্য তেমন হুমকি ছিল না। বর্তমানে জনসংখ্যার আধিক্য, বসতি সম্প্রসারণ, জনবসতির জন্য যোগাযোগ ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করা হাওরের অস্তিত্বের জন্য বড় সংকট। হাওরের মধ্যবর্তী গ্রামগুলো মূলত অল্প জায়গায় বেশি ঘনত্বের এলেমেলো জনবসতি, যা বস্তির চেয়ে ঘিঞ্জি। হাওরকে জনঘনত্বের চাপ থেকে মুক্তি দিতেই হবে। হাওরের মধ্যে সাবমার্সিবল (বর্ষাকালে ডুবন্ত) ছাড়া অন্যান্য সড়ক নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। এক দশক ধরে বজ্রপাত হাওরের আতঙ্ক হয়ে উঠেছে। হাওরগুলোতে বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করতে হবে। হাওরের এলোমেলো ও বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলোকে পুনর্গঠন ও পুনঃস্থাপন করতে হবে। হাওরের তীরবর্তী খাস জায়গাগুলো নদী খননের মাটি দিয়ে ভরাটের মাধ্যমে এটা সম্ভব। সুষ্ঠু পরিকল্পনায় হাওরে পরিকল্পিত গ্রাম গড়ে তুললে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগসহ জীবনযাত্রার সব বিষয়ের সংকট মোকাবিলা সহজ হবে। কৃষি ও কুটিরশিল্পনির্ভর আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত গ্রামগুলো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিযোজনে
সক্ষম ও সমৃদ্ধ হবে। সঠিক পরিকল্পনায় হাওরাঞ্চল দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম।
সালেহিন চৌধুরী শুভ: নির্বাহী পরিচালক, হাউস
- বিষয় :
- জলাবদ্ধ
