ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মামলা ও জামিন

রিকশাচালক আজিজের নতুন বন্দোবস্ত দর্শন

রিকশাচালক আজিজের নতুন বন্দোবস্ত দর্শন
×

আজিজকে শুক্রবারই ৩২ নম্বর থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ

সাইফুর রহমান তপন

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৫ | ২০:০৩

গত ১৫ আগস্ট শুক্রবার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে মারধর খেয়ে কারাগারে যাওয়া রিকশাচালক আজিজুর রহমানের জামিন দিয়েছেন আদালত। সমকালের খবর অনুসারে, রোববার দুপুরে শুনানি শেষে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত তাঁকে জামিন দেন। এই ঘটনা বিশেষ করে আইনের শাসনপ্রত্যাশী মানুষদের যেমন স্বস্তি দিয়েছে, তেমনি তাদের মধ্যে বিস্ময়েরও উদ্রেক ঘটিয়েছে। 

আজিজকে শুক্রবারই ৩২ নম্বর থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। শনিবার তাঁকে জুলাই আন্দোলনের হত্যাচেষ্টা মামলায় কারাগারে পাঠিয়েছিলেন আদালত। সমকালের খবর অনুযায়ী, এদিন তাঁকে আদালতে হাজির করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ধানমন্ডি থানার উপপরিদর্শক মোহাম্মদ তৌহিদুর রহমান কারাগারে রাখার আবেদন করেন। পরে বিচারক কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

গণপিটুনির সময় আজিজ বলেন, ‘আমি কোনো দল করি না। শুধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ভালোবাসি। তাই এসেছিলাম।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনাকে ফেরাতে আসিনি। বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসি। তাই আমার হালাল টাকা দিয়ে কেনা ফুল নিয়ে এসেছি।’ 

জীবিকার জন্য আজিজ ঢাকায় থাকলেও তাঁর বাবা-মাসহ পরিবার থাকে ঝিনাইদহের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে, অত্যন্ত দরিদ্র হালে। তিনি ৪০০ টাকা দিয়ে ওই ফুলের তোড়া কিনেছিলেন। কিন্তু কোনো কিছুই তাঁকে কেন্দ্র করে মব সৃষ্টিকারীদের নিবৃত্ত করতে পারেনি। পুলিশকেও আশ্বস্ত করতে পারেনি। অসহায়ভাবে মার তো খেতে হয়েছেই, উপরি হিসেবে জেলেও যেতে হয়েছিল, সম্পূর্ণ মিথ্যা মামলায়।

এ সরকারের আমলে এটা একটা রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে যে অপছন্দ হলেই যে কারও বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দিয়ে দেওয়া যায়। হত্য মামলা না পেলে হয় হত্যা প্রচেষ্টা মামলা। তবে উভয় ধরনের মামলাতেই জামিন প্রায় সোনার হরিণ– যদিও আইনে এ ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। আইনজীবীদের অভিযোগ, জুলাই-আগস্টের ঘটনা সম্পর্কিত মামলা হলে এমনকি উচ্চ আদালতও নাকি সরাসরি বলে দেন, এ মামলা শোনা যাবে না।

এ রকম এক পরিস্থিতিতে কারাগারে যাওয়ার মাত্র এক দিনের মাথায় একজন ‘হত্যাচেষ্টা’ মামলার আসামির জামিন পাওয়া, নিঃসন্দেহে বিরল ঘটনা। তাই আজিজের জামিন পাওয়া বিস্ময়কর ঘটনা। তবে এ ঘটনা একই সঙ্গে স্বস্তিরও বটে, বিশেষ করে আসামি যেহেতু অসহায় দরিদ্র রিকশাচালক। 

বিষয়টা বিস্ময়কর এ কারণেও যে, আজিজ ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ হিসেবে তকমা পেয়েও জামিন পেয়েছেন। গত বছর জুলাই-আগস্টে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে, তারই ফসল হিসেবে ক্ষমতায় বসেছে অন্তর্বর্তী সরকার। আওয়ামী লীগ ও তাঁর সমর্থক মাত্রই ওই আন্দোলনকারীদের কাছে ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিবাদের দোসর। সম্ভবত সে কারণেই সরকার ও সমর্থকরা মনে করেন, আওয়ামী লীগের সামান্য গন্ধ থাকা সবাইকে জেলে পুরতে হবে। সে কারণে কারাগারে আটক বিগত সরকারের মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মি বা সমর্থকদের জামিন পাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। এমনও ঘটনা আছে, ফাঁকফোকরে কেউ যদি জুলাই-আগস্টের মামলায় জামিন পেয়েও যান, তাঁকে নতুন মামলা দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। আইনজীবীদের কারও কারও তীব্র সমালোচনা সত্ত্বেও এ নীতিতে বদল আসেনি।

আজিজকে আটক রাখার আবেদনে বলা হয়েছিল, ‘মামলার ঘটনার সময় প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী এবং বাদীকে জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার আসামি মো. আরিফুল ইসলামকে হত্যাচেষ্টা মামলার ঘটনায় জড়িত থাকার বিষয়ে সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। মামলা তদন্তের স্বার্থে আসামিকে জেলহাজতে আটক রাখা একান্ত প্রয়োজন’। কিন্তু এ ‘প্রয়োজন’ মাত্র এক দিনের মাথায় কেন ফুরিয়ে গেল, সেটা যে কাউকেই বিস্মিত করার কথা। শুধু তাই নয়, খবরে প্রকাশ সরকার নাকি ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে কেন আজিজুরকে গ্রেপ্তার করা হলো তার কারণ দর্শানোরও নোটিশ দিয়েছে। একেবারে অ্যাবাউট টার্ন বা ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যাওয়া! এতে তো বিস্ময় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়াই সংগত।

প্রশ্ন হতে পারে, এত রথী-মহারথীর জামিন আটকে দিয়ে আজিজের মতো নিরীহ মানুষের জামিন সরকার আটকাল না কেন? এখানে দুটো বিষয় থাকতে পারে। একটি হলো, গত এক বছরে সরকারের জামিনবিরোধী অবস্থান এত সমালোচনার জন্ম দিয়েছে যে এখন একটু হলেও চাপ অনুভব করছে। আরেকটা হলো, সামাজিক মাধ্যমে অন্তত আজিজের ঘটনা শুধু ভাইরালই হয়নি, সরকারকে ব্যাপক প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
কিন্তু এভাবে কতদিন? বিচারের বাণী কি নীরবে নিভৃতে কাঁদতেই থাকবে?

সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল
 

আরও পড়ুন

×