মানবসম্পদ
টেকসই উন্নয়নের অনুঘটক শিক্ষা
.
মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৫ | ০০:১৩
সরকার যখন শিক্ষার চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে, তখন বেসরকারি খাত মানসম্মত শিক্ষা প্রদানে এগিয়ে এসেছে। বাংলাদেশে শিক্ষার ক্রমবর্ধমান চাহিদা বেসরকারি খাতকে বিকশিত করেছে। উন্নত সুযোগ-সুবিধা, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার ও মানসম্পন্ন শিক্ষার ব্যাপারে এসব প্রতিষ্ঠান আগ্রহী। তবে অনেকেই বৈচিত্র্য বা বিশেষ চাহিদা পূরণের চেয়ে ভর্তি বাড়িয়ে আয় বৃদ্ধির দিকে মন দিয়ে অবকাঠামো ও মানোন্নয়নে বিনিয়োগকে উপেক্ষা করছে। শিক্ষার ব্যয়স্ফীতির ফলে নিম্নআয়ের শিক্ষার্থীরা যদি বঞ্চিত হয়, তাহলে সামাজিক বৈষম্য আরও বেড়ে যাবে। এ ছাড়া সেকেলে ও লক্ষ্যহীন পাঠ্যক্রম ব্যবহারের ফলে শিক্ষাদানের গুণমানও ব্যাহত হচ্ছে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক ব্যবসার মডেলের মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সামাজিক দায়িত্বের ভারসাম্য রক্ষা করে শিক্ষা খাতকে টেকসই উন্নয়নের এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে রূপান্তর করা সম্ভব। শিক্ষা ব্যবসা, না জনসেবা– নির্ভর করে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিভঙ্গি ও অগ্রাধিকারের ওপর। একটি ভারসাম্যপূর্ণ পন্থা সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারে যেখানে বেসরকারি বিনিয়োগ মুনাফা অর্জন করলেও সামাজিক দায়িত্ব রক্ষা করে।
শিক্ষা খাতের সূচনা হয়েছিল মানবতার সেবা ও দক্ষ, উৎপাদনশীল জনশক্তি গঠনের মাধ্যমে জীবনের মানোন্নয়নের লক্ষ্যে। পরে রেনেসাঁ যুগে এসে যোগ হলো সত্যিকারের বোদ্ধা ও দায়িত্ববান নাগরিক গড়ার লক্ষ্যগুলো। বাংলাদেশে ১৯৯২ সালে প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয় মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে এবং এগুলোকে অলাভকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধরে আইন বানানো হয়, যাতে ব্যয়-অতিরিক্ত আয়ের অংশ প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নেই ব্যবহৃত হয়; লভ্যাংশ হিসেবে নয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাণিজ্যিক মানসিকতা প্রবেশ করেছে এবং গৎ বাঁধা সব বিষয়ের পঠন হচ্ছে। এর সঙ্গে প্রায়ই মানুষের অন্তর্নিহিত উন্নয়ন বা দেশের মঙ্গলের ধারণাটি মিলছে না। এতে সামাজিক উদ্যোগের চিন্তাধারাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
শিক্ষা ব্যক্তি ও অর্থনীতির জন্য সম্ভাবনা তৈরি করে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত এবং দারিদ্র্য হ্রাস করে। শিক্ষিত মানুষ উদ্যোক্তা হয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উৎপাদনের বৈচিত্র্য আনবে, যা একটি সহনশীল ও অভিযোজনক্ষম অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে। ইউনেস্কোর মতে, শিক্ষায় বিনিয়োগ করা প্রতিটি ডলার ১০ থেকে ১৫ গুণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি করে। শিক্ষা উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা ও গুণমান বৃদ্ধি করে। শিক্ষা ব্যক্তিগত ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার চালক। কিন্তু এর অর্থায়ন প্রায়ই অপর্যাপ্ত থাকে। বাংলাদেশে শিক্ষায় বাজেট বরাদ্দ তুলনামূলক কম; অনেক আফ্রিকান দেশের তুলনায় সিকিভাগ মাত্র। অথচ যেসব দেশ শিক্ষায় বড় বিনিয়োগ করেছে, তারা এখন বিজ্ঞান, জ্ঞান ও প্রযুক্তিতে শীর্ষে থেকে দ্রুত সামাজিক, প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারছে। বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে জনসংখ্যায় নবীন বয়সীর সংখ্যা বেশি, সেখানে শিক্ষা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আলোকবর্তিকা বটে। যুক্তরাষ্ট্রে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেক কম। কর্মসংস্থানের সুযোগ আয়ও বৃদ্ধি করে। কর্মশক্তিতে অধিক অংশগ্রহণ উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি বাড়ায়, দারিদ্র্য হ্রাস করে এবং সামাজিক বৈষম্য কমায়।
একটি শিক্ষিত সমাজ নৈতিক ব্যবসা ও দায়িত্বশীল সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে উদ্ভাবন ও প্রতিযোগিতা বাড়ায়, মানুষকে শ্রমবাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে প্রস্তুত করে, টেকসই উন্নয়নে সহায়তা করে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক গতিশীলতা বাড়ায়। শিক্ষা অসমতা কমায়, শান্তি প্রচার এবং সংঘাতের ঝুঁকি হ্রাস করে। স্কুলে উপস্থিতি দ্বিগুণ করলে সংঘাতের আশঙ্কা অর্ধেক হয় বলে জানিয়েছে ইউনেস্কো। এটি আস্থা, সহানুভূতি, নাগরিক অংশগ্রহণ ও সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি গড়ে তোলে। যার ফলে অপরাধের হার ও নারীর প্রতি সহিংসতা হ্রাস পায়। বেশি শিক্ষা বাল্যবিয়ে ও মাতৃমৃত্যু কমায় এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুযোগ সম্প্রসারিত করে। উচ্চতর শিক্ষা স্বাস্থ্য সচেতনতা, স্বাস্থ্যসেবার প্রবেশাধিকার ও স্বাস্থ্যকর অভ্যাস বাড়ায়। এটি শিশুর টিকে থাকা, মাতৃস্বাস্থ্য, টিকাদান, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যবিধিকে উন্নত করে। শিক্ষিত ব্যক্তি প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পালন করতে এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি হ্রাস করেন।
শিক্ষা সম্পর্কের সহনশীলতা, একতা এবং ব্যক্তি ও বাকস্বাধীনতা প্রচার করে বাংলাদেশের মতো বৈচিত্র্যময় সমাজে বিভেদ দূর ও পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরি করতে পারে। তা আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে জীবনকে উন্নত করবে। এটি আত্মোপলব্ধি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। বিশেষ করে নারীদের ক্ষমতায়নে সহায়তা করে। শিক্ষা জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করে, সহনশীলতা বাড়ায় এবং পরিবেশবান্ধব আচরণকে উৎসাহিত করে। এই জ্ঞান প্রয়োগ করে মানুষ উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখে। সামগ্রিক উন্নয়ন ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত এই খাতে বিনিয়োগকে নারীর ক্ষমতায়ন, নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে মিলাতে হবে। যেহেতু কফি আনানের মতে, শিক্ষা আসলে শান্তিরই প্রতিশব্দ, এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতির অপরিহার্য অংশ। এই গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক খাতটি অন্য সব খাতকে প্রভাবিত করে। শিক্ষাকে সামাজিক ব্যবসা হিসেবে বিবেচনা করলে বিনিয়োগ বাড়বে এবং একটি জ্ঞাননির্ভর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে উঠবে। বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দাতাদের কর ছাড় সুবিধা দিয়ে তহবিল গড়ে। অথচ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তা থেকে পিছিয়ে। অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হলেও এগুলো থেকে যে ভ্যাট নেওয়া হচ্ছে তা উদ্ভাবন অনুদান হিসেবে গবেষণা ও বৃত্তির কাজে ব্যবহার করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উপকৃত হবে।
মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান: উপ-উপাচার্য, আহ্ছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- মানবসম্পদ
