ছাত্র সংসদ
ডাকসু নির্বাচনে রায় দিতে ভুল করা যাবে না
ফাইল ছবি
আখতার সোবহান মাসরুর
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৭:৩১ | আপডেট: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৭:৩৯
জুলাই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পরিক্রমায় এবারের ডাকসু নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এ নির্বাচন আগামী দিনে দেশের মোড় পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু জ্ঞানের চাষাবাদই করেনি, দেশের রাজনৈতিক দিক পরিবর্তনেও নির্দেশনা দিয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় তৎকালীন পূর্ব বাংলা ও বাংলাদেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরির পাশাপাশি সমাজের গণতান্ত্রিক রূপান্তরে বড় ভূমিকা পালন করেছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই ওপরতলা ও নবাবদের হাত থেকে দেশের রাজনীতিকে সাধারণের বিষয় করে তুলেছে। পাকিস্তানের উপনিবেশের বিরুদ্ধে সামনে থেকে লড়েছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বায়ান্নতে নিজের জবানের অধিকার রক্ষার সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে, ’৬৯-এ আইয়ুব খানের সিংহাসন গুঁড়িয়ে দিয়েছে, ’৯০-তে এরশাদের সামরিক শাসন উচ্ছেদ করেছে। সর্বোপরি ছাত্ররা ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের অভিমুখ ঠিক করে দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বরাবরই স্বৈরতন্ত্র বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, প্রতিষ্ঠা (এস্টাবলিশমেন্ট) বিরোধীদের পক্ষে সমর্থন জুগিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়েও ডাকসু শেখ হাসিনার দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ভূমিকা রেখেছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবস্থা বিরোধীরা ছাত্রসমাজের প্রশ্রয় পেয়েছে, নির্বাচনে বামপন্থিরাই বেশির ভাগ সময়ে বিজয়ী হয়েছে।
নির্বাচনে অনেক মুখোশ। অরাজনৈতিক, বিরাজনৈতিক আর সাধারণ ছাত্রের ব্যানার বলে আসলে কিছু নেই। এসব মুখোশ, মুখোশের পেছনে রয়েছে রাজনীতি। মুখোশ নিজেদের আড়াল করার জন্য, কিন্তু লুকানোর কোনো সুযোগ নেই, ছাত্রসমাজ সবারই আমলনামা জানে। এবারের ডাকসু নির্বাচনের ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত হলো ফ্যাসিবাদ ও বৈষম্যবিরোধী জুলাই অভ্যুত্থান। সব ধরনের বৈষম্য– জাতিগত, নারী-পুরুষ বৈষম্য, সম্পদ বৈষম্য, আয় বৈষম্য, ধর্মীয় বৈষম্য দূর করার রাজনৈতিক প্রত্যয় থেকে ছাত্রসমাজকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। গণতন্ত্র ও অভ্যুত্থানের মুখোশের আড়ালে গণতন্ত্রকে হত্যার জন্য যারা তৎপর; ছাত্ররা আশা করি তাদের চিনতে ভুল করবে না, তাদের সুযোগ দেবে না। ফ্যাসিবাদ শুধু একজন ব্যক্তি নয়; ফ্যাসিবাদ একটি রাজনৈতিক অবস্থা, একটি ব্যবস্থা। শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদ বিদায় নিলেও অন্য ফ্যাসিবাদীরা মাঠে আছে মুখোশের আড়ালে। ফ্যাসিবাদের অনেক রং আছে। যারা নিজের মতকে একমাত্র সত্য মনে করে, যারা ‘ফাইনাল সলিউশন’ দিয়ে ভিন্ন মতকে সহিংস শারীরিকভাবে দমন করে, ধর্ষণের হুমকি দেয়, হত্যা করে, রগ কাটে– তারাও ফ্যাসিবাদী। রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরেও ফ্যাসিবাদী রাজনীতি সক্রিয় থাকতে পারে। তাই ডাকসু নির্বাচনে রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরের মুখচোরা ফ্যাসিবাদী রাজনীতিকে মোকাবিলা করতে হবে শিক্ষার্থীদের।
গণতন্ত্রের একটা প্রধান দিক হচ্ছে জাতি, বর্ণ, লিঙ্গবৈষম্যকে অতিক্রম করে নাগরিকদের ব্যক্তি হিসেবেও সমতার ভিত্তিতে বিবেচনা করা। যে রাজনীতি মেয়েদের বিপক্ষে, নারী-পুরুষের সমতায় সমর্থন করে না, ধর্ষণের হুমকি দেয়, নারীকে বেশ্যা বলে বা এমন অভিধাকে সমর্থন করে, বুলিং করে, আক্রমণ করে– এমন হাইপার ম্যাসকিউলিনিটিকে জুলাইয়ের চেতনায় প্রত্যাখ্যান করুন। শিক্ষা দিন। বৈষম্য ও ঘৃণা উৎপাদক কারখানাগুলোকে (সংগঠন) না বলুন। যেসব সংগঠনের সদস্যরা নারী প্রতিপক্ষকে ধর্ষণের হুমকি দেয় তাদের ব্যালটে জবাব দিন। যে রাজনীতি লিঙ্গ বৈষম্যবাদী ধর্ষকামী মনন গঠন করে– তা গণতন্ত্রের বিপক্ষের রাজনীতি, তাকে পরাস্ত করেই গণতান্ত্রিক ও সমতার সমাজ তৈরি হতে পারে। বৈষম্যবাদীদের ভালো করে এবার বুঝিয়ে দিন নারীশক্তি, সমাজের অর্ধেক নারীদের প্রতি বৈষম্য ও অবমাননা করে কেউ পার পাবে না।
জ্ঞান-বিজ্ঞন চর্চার জন্য চাই স্বাধীন মুক্তচিন্তার পরিবেশ। যে রাজনীতি মানুষের চিন্তার স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, সেই রাজনীতি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজয়ী হলে আমাদের মগজে তালা পড়বে। পোশাকে বিধিনিষেধ আসবে। ইরানের মাসা আমিনির মতো শুধু মাথার চুল দেখতে পাওয়ার জন্য নীতিপুলিশ আপনার মাথা থেঁতলে দিয়ে হত্যা করবে– এ রকম বিপদ ডেকে আনবেন না। ধর্মের বাইরে স্বাধীন বিজ্ঞান চিন্তার জন্য গ্যালিলিওর মতো কারাবাস করতে হবে বা জিয়ারডানো ব্রুনোর মতো আপনাকে পুড়িয়ে মারা হবে– এমন পরিবেশকে আমন্ত্রণ জানাবেন না। ইরানে ধর্মীয় শুদ্ধি অভিযানের নামে হাজার হাজার শিক্ষককে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়; গ্রেপ্তার ও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ধর্মীয়করণ করা হয় কারিকুলাম। এমন রাজনীতিকে আহ্বান করে আমরা যেন খাল কেটে কুমির ডেকে না আনি। এসব বিবেচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন মুক্ত জ্ঞান চর্চার পরিবেশ রক্ষার্থে ধর্মান্ধ, ফ্যাসিবাদী ও নিও লিবারেল শক্তির উত্থানের কেন্দ্র হিসেবে একে গড়তে দেওয়া যাবে না। যারা এখনও পাকিস্তানবাদী, জুলাইকে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চায়, শহীদের রক্তের দাগ মুছে ফেলতে চায়– তাদেরকে না বলুন, ব্যালটে জবাব দিন। জানিয়ে দিন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ কোনো আপসের বিষয় নয়। আমরা ’৭১ ও ’২৪ উভয়কেই ধারণ করি।
ডাকসু শুধু ক্ষমতা আর রাজনীতির ব্যাপার নয়, এর সঙ্গে ছাত্রদের নানাবিধ সমস্যা ও দাবিদাওয়া যুক্ত। শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যা, হলে অপরাজনীতি, দখল ও নিপীড়নের সংস্কৃতি, শিক্ষার মানোন্নয়ন, ছাত্রীদের চলাফেরার স্বাধীনতা, যৌন নির্যাতন ও বুলিং, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলা, পরিবহন, গবেষণা, সব পর্যায়ের ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব, ক্যাম্পাসে চিন্তার স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক সহনশীলতা ইত্যাদি।
গণতন্ত্র ভিন্নতা ও বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের গ্রন্থি তৈরি করতে পারে। যে প্যানেলে নারী-পুরুষ, জাতি-ধর্মের সম্মিলন ঘটেছে, তার ভেতর আমরা গণতন্ত্র ও সমতা বোধের একটি প্রতিফলন দেখতে পাই। এবারের ডাকসু নির্বাচনে কিছু গুরুতর প্রশ্ন হাজির হয়েছে, একদা ছাত্রলীগ হয়ে যারা নিপীড়ন চালিয়েছে; যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে মুছে দিতে চায়, বিরোধিতা করে; যারা নারীদের সমঅধিকারে বিশ্বাস করে না, ধর্ষকামী বুলিং আক্রমণ ও হেয় করে; যারা ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থানকে বিক্রি করে বিত্ত-বৈভব গড়েছে; যারা সাম্রাজ্যবাদের সহযোগী নিও লিবারেলপন্থি– তাদের বিষয়ে ছাত্রসমাজকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শান্তি, জ্ঞান ও গণতন্ত্রের পরিবেশ বিরাজ করুক আমাদের স্বপ্নের প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমরা যেন গণতন্ত্রের সুবাতাসে অবগাহন করতে পারি।
ড. আখতার সোবহান মাসরুর: লেখক ও নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম ছাত্রনেতা
- বিষয় :
- ডাকসু
- ডাকসু নির্বাচন
- ছাত্র সংসদ
