ডাকসু নির্বাচন
শিক্ষার পরিবেশ ও সহাবস্থান প্রত্যাশিত
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:০৯
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন মঙ্গলবার শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অংশগ্রহণে যেই স্বতঃস্ফূর্ততার সহিত সম্পন্ন হইয়াছে, উহা উৎসাহ ও আশাব্যঞ্জক। নির্বাচনটি ঘিরিয়া বেশ কিছু অভিযোগ উঠিলেও মোটাদাগে উহা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ও স্বচ্ছতার সহিত হইয়াছে বলিয়া প্রতীয়মান। নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের ভূমিধস বিজয় অনেককে বিস্মিত করিলেও ইহাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। স্বীকার্য, বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সমকালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শিবিরের কৌশলই উহাদের অগ্রগামী করিয়াছে। কিন্তু ইহার অর্থ এই নহে, অন্যান্য প্রার্থীর পরাজয় হইয়াছে। আমরা মনে করি, ইহার মধ্য দিয়া যেই প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে প্রস্তুত হইয়াছে, উহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতিকেই আগাইয়া লইয়া যাইবে। এখন বরং বিজয়ী পক্ষকে যদ্রূপ শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানে মনোযোগী হইতে হইবে, তদ্রূপ পশ্চাতে থাকা প্রার্থীদেরও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে নজরদারি ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করিতে হইবে।
আমরা দেখিয়াছি, বিগত দেড় দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কীভাবে ক্ষমতাসীন দলের শিক্ষার্থী সংগঠন ছাত্রলীগের নিকট জিম্মি হইয়া পড়িয়াছিল। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে উহা হইতে সাময়িক মুক্তি ঘটিলেও গেস্টরুম সংস্কৃতি, গণরুম ইত্যাদি হইতে চিরমুক্তির প্রত্যাশা শিক্ষার্থীদের। ছাত্রশিবিরও ইশতেহারে এই সকল বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিয়াছিল। কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি, শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যা, পরিবহন সংকট, ছাত্রীদের নিরাপত্তা, গবেষণা খাতে অপ্রতুল বরাদ্দ ইত্যাদি শিক্ষার পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাবক বিষয়গুলোর সমাধান সত্যিই জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। আমরা বিশ্বাস করি, ডাকসুতে বিজয়ী প্যানেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতায় এই সকল সমস্যা সমাধানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে।
ডাকসু নির্বাচনের প্রাক্কালে শিক্ষার্থীদের প্যানেলগুলি যেইভাবে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার মাধ্যমে প্রচারকার্য চালাইয়াছে, সেই সহাবস্থানমূলক পরিবেশ আমরা নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও দেখিতে প্রত্যাশী। এই ক্ষেত্রে নির্বাচিত পরিষদের দায়িত্ব স্বাভাবিক কারণেই অধিক। তাহারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যদ্রূপ সকলের সহাবস্থান নিশ্চিত করিবে, তদ্রূপ অন্য সকল ছাত্র সংগঠনের মতামত গ্রহণেরও ব্যবস্থা করিবে।
আমরা জানি, ২০১৯ সালের পর পুনরায় ডাকসু নির্বাচনের পথ উন্মুক্ত হইয়াছে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়া। এই নির্বাচনে যাহারা প্রতিযোগিতা করিয়াছিলেন, তাহারা প্রায় সকলেই সেই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করিয়াছেন এবং অনেকেই নেতৃস্থানীয় ভূমিকায় ছিলেন। শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ ফিরাইয়া আনিবার ক্ষেত্রে তাহারা যেই প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন, উহা রক্ষা করিবার এখনই সময়।
বিশ্ববিদ্যালয়টি যেইভাবে দেশের সকল ক্রান্তিকালে ত্রাতার ভূমিকা পালন করিয়া আসিতেছে, তথা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান হইতে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়াছে; অনুরূপ শিক্ষা ও গবেষণায়ও আন্তর্জাতিক বিশ্বের সহিত তাল মিলাইয়া আগাইয়া যাইবার বিকল্প নাই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আমরা ধন্যবাদ জানাই এই জন্য, তাহাদের আন্তরিকতা ও বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণে দীর্ঘ প্রত্যাশিত ডাকসু নির্বাচন সফলভাবে অনুষ্ঠিত হইয়াছে। তাহারা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মের অংশ হিসাবে নিয়মিতভাবেই এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করিবেন বলিয়া আমাদের বিশ্বাস। ডাকসু নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী অধিকাংশ শিক্ষক, পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকগণ ইহাকে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য বলিলেও ইহাকে কেন্দ্র করিয়া যেই সকল অভিযোগ উঠিয়াছে, সেইগুলির বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতে হইবে, যাহাতে প্রায় ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনকে প্রশ্নমুক্ত করা যায়।
ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের প্যানেলসহ বিজয়ী সবাইকে আমরা অভিনন্দন জানাই। ডাকসু নির্বাচনের মধ্যমে যেই ইতিবাচক ধারা তৈয়ার হইয়াছে, উহা যাহাতে অন্যান্য ছাত্র সংসদে অনুসৃত হয়। ডাকসুর ন্যায় সকল রাজনৈতিক দল পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকিলে ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান সহজ হইবে।
- বিষয় :
- ডাকসু নির্বাচন
