ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রাইট টার্ন

ছাত্র সংসদে আদর্শ নির্বাচন যেভাবে সম্ভব

ছাত্র সংসদে আদর্শ নির্বাচন যেভাবে সম্ভব
×

মোহাম্মদ গোলাম নবী

মোহাম্মদ গোলাম নবী

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:০৫

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বারবারই জাতির সংকটে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে। কিন্তু উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্বে সগৌরবে মাথা তুলে দাঁড়াতে হলে এখন আমাদের কাজের অগ্রভাগে থাকা দরকার ক্লাসরুম, ল্যাব, শেখার গুণগত মান, গবেষণা ও উদ্ভাবন, নিরাপদ ক্যাম্পাস এবং শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন সমস্যার দ্রুত সমাধান। সে কারণে এখন দরকার প্রতিবাদের শক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক সমাধানের রূপ দেওয়া। এই রূপান্তরের একটি সহজ ও বাস্তব পথ হলো, ডাকসুকে এক বছরের ‘পাইলট ক্যাম্পাস’ বানানো। 

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদের কাঠামো ও চর্চায় কিছু মৌলিক ফাঁক রয়ে গেছে: অনিয়মিত নির্বাচন, অতিরিক্ত দলীয় প্রভাব, সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং সেবায় সময়সীমার অনুপস্থিতি। অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে সফল মডেলগুলোতে ছাত্র সংসদগুলোর নির্বাচন হয় নিয়মিত। তারা নীতিনির্ধারণে অংশীদার হয় এবং বাজেট, সেবা ও জবাবদিহিতে স্বচ্ছতা থাকে। দিল্লি, অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, সিডনি, মেলবোর্ন, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও এমআইটির উদাহরণ বিবেচনায় রেখে ডাকসুতে এক বছরের জন্য কিছু বিষয় বাস্তবায়ন করে দেখা যেতে পারে কীভাবে আন্তর্জাতিক ও বিশ্বমানের চর্চাগুলো বাংলাদেশ উপযোগী করা যায়। সব দেখে-শুনে তারপর দেশজুড়ে বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেটি রোলআউট বা বাস্তবায়ন করা।

রূপান্তরের শুরুটা করা যেতে পারে ছাত্র সংসদের কাঠামোতে। প্রথমত, ছাত্র সংসদের প্রেসিডেন্ট হবেন ছাত্রদের সরাসরি নির্বাচিত প্রতিনিধি, এখনকার ভিপি এই দায়িত্ব পালন করবেন। ভাইস চ্যান্সেলর সর্বোচ্চ প্যাট্রন/উপদেষ্টার ভূমিকায় থাকবেন। এতে সিদ্ধান্তের জবাবদিহি শিক্ষার্থীদের কাছেই থাকবে।  দ্বিতীয়ত, নির্বাচন ক্যালেন্ডার তৈরি থাকবে। কোনো অজুহাতে নির্বাচন স্থগিত করা হবে না। তৃতীয়ত,  ছাত্র সংসদ বাজেট ও পরিকল্পনায় নিজস্ব কর্তৃত্ব রাখবে, কিন্তু প্রশাসনের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে সমন্বয় ও জবাবদিহির নিয়ম থাকবে। চতুর্থত, সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল, বাজেট-ডিসিপ্লিনারি কমিটিতে নির্দিষ্টসংখ্যক শিক্ষার্থীর আসন থাকবে; যেসব নীতি শিক্ষার্থীসংশ্লিষ্ট সেগুলো বাধ্যতামূলকভাবে শিক্ষার্থীদের শুনানিতে নিতে হবে। পঞ্চমত, অতিরিক্ত দলীয় প্রভাব ঠেকাতে আচরণবিধি থাকতে হবে এবং যে কোনো ধরনের সহিংসতায় অনুদান স্থগিত করার নীতি কার্যকর করতে হবে।

ডাকসু সব ধরনের শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক সেবা ও অভিযোগের জন্য ওয়ানস্টপ ‘৩-৩-৩ সার্ভিস ডেস্ক’ চালু করবে। যেখানে তিন মিনিটে অভিযোগ গ্রহণ ও টিকিট নম্বর দেওয়া হবে; তিন কর্মদিবসের মধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির নাম ও তাঁর দিক থেকে প্রথম সাড়ামূলক তথ্য উপস্থাপন করা হবে এবং তিন সপ্তাহের মধ্যে সমাধান বা উচ্চতর পর্যায়ে পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।  নিরাপত্তা বিষয়ে ২৪ ঘণ্টার সেফটি রেসপন্স ব্যবস্থা চালু করতে হবে। 

বাজেট হবে উন্মুক্ত। কোন খাতে কত ব্যয় করা হচ্ছে তা অনলাইনে প্রকাশিত হবে। বছর শেষে সার্টিফায়েড অডিট ফার্ম দিয়ে স্বাধীনভাবে অডিট করা হবে। শিক্ষার মান বাড়াতে প্রতি সেমিস্টারে গোপনে কোর্স ইভ্যালুয়েশনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিষয়বস্তুর সাম্প্রতিকতা, শেখানোর ধরন, মূল্যায়নের ন্যায্যতা, ফিডব্যাক ইত্যাদিকে গুরুত্ব দিয়ে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে বিভাগ ও ডাকসু যৌথভাবে টিচিং ইম্প্রুভমেন্ট প্ল্যান তৈরি করবে। 

বিশ্ববিদ্যালয় মানেই গবেষণা। তাই গবেষণার সংস্কৃতি শক্ত করতে ডাকসু ‘রিসার্চ অ্যাপ্রেন্টিসশিপ ৫০০’ নামে প্রথম বছরে একটি প্রকল্প চালু করতে পারে। প্রতিবছর অন্তত ৫০০ শিক্ষার্থী ল্যাব/প্রকল্পে কিংবা শিল্পকারখানায় শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাবেন। এ জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা ও নির্দিষ্ট একাডেমিক ক্রেডিট যে কোনো একটি শিক্ষার্থীরা পাবেন। বছরে একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রার খরচ যেমন–হলের সিট ভাড়া, ডাইনিংয়ের খাবারের মান ও দাম, যাতায়াতের খরচ, শিক্ষা উপকরণের খরচ সব মিলিয়ে কতগুলো সূচকের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। এতে করে ফি, জরিমানা, অন্যান্য খরচ ইত্যাদি বদলানোর সিদ্ধান্ত শুধু কর্তৃপক্ষের ওপর থাকবে না। ডাকসু, প্রশাসন, শিক্ষক, হল সংসদসহ সংশ্লিষ্ট সবাই মিলে নিরাপদ ক্যাম্পাস চুক্তি তৈরি করে স্বাক্ষর করবে। নিরাপত্তার মধ্যে র‍্যাগিং, বহিরাগত, হলে প্রবেশে স্মার্ট আইডি, রাতে নিরাপদ পথচলা, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সহায়তা, কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তা ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। 
শিক্ষার্থীদের আবাসনের বিষয়টি দেখা ডাকসুর কাজ। এ লক্ষ্যে তারা সব হলের রুম ও রুমের বরাদ্দ নিয়ে অনলাইন ড্যাশবোর্ড তৈরি করবে এবং অবস্থানকারী শিক্ষার্থীদের নাম প্রকাশ করবে। ডাইনিংসংক্রান্ত কমিটি ডাইনিংয়ের মেনু ও পুষ্টিসংক্রান্ত তথ্য প্রতিদিন ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে আপডেট করবে। প্রয়োজনে প্রশাসনের সহায়তায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে খাবার নিয়ে জরিপ চালানো ও চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানকে অপসারণ ও জরিমানার ব্যবস্থা করবে।

বিশ্বখ্যাত অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিপি ও জিএস পদগুলো ফুলটাইম বেতনভুক্ত হয়ে থাকে। বাকি পদগুলো পার্টটাইম ও বৃত্তির ব্যবস্থা থাকতে পারে। পার্টটাইম পদগুলোর জন্য ন্যূনতম একাডেমিক অগ্রগতি বাধ্যতামূলক রাখতে হবে। এতে ছাত্র রাজনীতি করার জন্য বছরের পর বছর শিক্ষার্থী হয়ে থাকা কিংবা ‘পদ আঁকড়ে থাকা’র প্রবণতা কমবে। 
ডাকসুর পাইলট থেকে পাওয়া সাফল্য–ব্যর্থতা স্পষ্ট রোডম্যাপসহ প্রকাশ করতে হবে। তারপর বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একযোগে নির্বাচন করা যেতে পারে। প্রার্থীরা তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকবেন। তারা সেভাবে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেবেন।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ইতিহাস আমাদের গৌরব দিয়েছে। এখন দরকার বিশ্বমানে উন্নীত হওয়া। সেই কারণেই ডাকসুতে পাইলট করার পর দেশজুড়ে বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নির্বাচন দিলে তখন স্লোগান নয়, ফলাফল বলবে: ছাত্র সংসদের মডেল বদলালে বিশ্ববিদ্যালয় বদলায়; আর বিশ্ববিদ্যালয় বদলালে বদলায় দেশের উচ্চশিক্ষার মানচিত্র।

মোহাম্মদ গোলাম নবী: কলাম লেখক; প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, রাইট টার্ন
 

আরও পড়ুন

×