ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জনস্বাস্থ্য

হাসপাতালকে ‘মানবিক’ করতে পারে যে ‘অদৃশ্য’ বিভাগ

হাসপাতালকে ‘মানবিক’ করতে পারে যে ‘অদৃশ্য’ বিভাগ
×

মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম

মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৭:৪৭ | আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৭:৫৮

হাসপাতালে কেউ বেড়াতে যায় না, নেহাত শারীরিক-মানসিক সংকটে না পড়লে। কিন্তু দেশের সরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী ও তাদের পরিচর্যাকারী স্বজনরা নানান বিভ্রান্তি ও মানসিক চাপের মুখোমুখি হন। এমনকি শিকার হন সহিংসতার। এর কারণ চিকিৎসক বা ওষুধের অভাব নয়। বরং এখানে চিকিৎসা ও সেবা প্রক্রিয়ায় মানবিক সংযোগ অনুপস্থিত। এই শূন্যতা পূরণের জন্যই হাসপাতালে রয়েছে সমাজসেবা বিভাগ। 

প্রায় প্রতিটি বড় সরকারি হাসপাতালে এই বিভাগের অন্তত একটি অফিস কক্ষ আছে। কিন্তু এর কথা খুব কম রোগীই জানেন। আর এর চেয়ে কম মানুষ সেখান থেকে সেবা ও সুবিধা পান। বিভাগগুলো শক্তিশালী করা গেলে দেশের স্বাস্থ্যসেবার অভিজ্ঞতা বদলে যেতে পারে।

মুশকিল হচ্ছে, বিভাগগুলো পর্যাপ্ত তহবিল, জনবল ও সচেতনতার অভাবে ভুগছে। এগুলোকে শক্তিশালী করার জন্য খুব বেশি অর্থ বিনিয়োগের দরকার নেই। সামান্য কিছু উদ্যোগই সুফল বয়ে আনতে পারে। ফিরিয়ে আনতে পারে সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় সম্মান, আস্থা ও মানবিকতা।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালে সমাজসেবা বিভাগের মূল লক্ষ্য ছিল গরিব ও অসহায় রোগীদের সাহায্য; যেমন আর্থিক সহায়তা, বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রকল্পের সঙ্গে রোগীদের সংযোগ ঘটানো, কাউন্সেলিং এবং হাসপাতালের জটিল নিয়মকানুনের মধ্য দিয়ে পরিবারগুলোকে পথ দেখানো।

নীতিগতভাবে হাসপাতালে সমাজসেবা বিভাগ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল চিকিৎসাকর্মী ও রোগীর মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি, যাতে চিকিৎসা শুধু ক্লিনিক্যাল প্রক্রিয়া না হয়ে মানবিক হয়। বাস্তবে এর ভূমিকা সংকুচিত হয়ে গেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শুধু ছোট অনুদান বা জাকাত তহবিল থেকে ওষুধ কেনার টাকা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। জনবলও কম। নেই প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ। ফলে সেবাপ্রত্যাশীদের কাছে অদৃশ্যই থেকে গেছে এর কার্যক্রম।

মনে রাখা জরুরি, সরকারি হাসপাতালে মানবিক স্পর্শের খুব প্রয়োজন। দেশের হাসপাতালগুলোতে প্রতি ৯৯০ জনের জন্য মাত্র একটি শয্যা। আর ডাক্তার ও নার্সরা নিমজ্জিত অতিরিক্ত কাজের চাপের ভারে। রোগী ও তাদের পরিচর্যাকারীর নিজেদের মতোই পুরো ব্যবস্থাটা সামলাতে হয়। ফলে প্রায়ই হাসপাতালে রোগী-পরিচর্যাকারী স্বজন-ডাক্তার-নার্স-সেবাকর্মীর মাঝে জন্ম নেয় অবিশ্বাস ও সংঘাত। এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৬৭ শতাংশেরও বেশি চিকিৎসক কর্মক্ষেত্রে সহিংসতার শিকার। যার বেশির ভাগই হতাশ রোগীর আত্মীয়দের মাধ্যমে ঘটে। বিশেষত জরুরি বিভাগগুলোতে উত্তেজনা বেশি থাকে। এখানে ঝগড়া-বিবাদের মূল কারণ হলো দীর্ঘ অপেক্ষা, দুর্বল যোগাযোগ ও বাড়তে থাকা উদ্বেগ।

এখানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে সমাজসেবা বিভাগ। সেই ভূমিকার মধ্যে রয়েছে রোগী ও তার স্বজনদের চিকিৎসা ও সেবা গ্রহণ প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা, পরিবারগুলোকে কাউন্সেলিং, ভুল বোঝাবুঝির মীমাংসা করা। রোগীদের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা। এভাবে রোগীদের কষ্ট কমতে পারে; হ্রাস পেতে পারে চিকিৎসাকর্মীদের ওপর চাপ। 

এ ক্ষেত্রে নতুন করে কিছু শুরু করার দরকার নেই। ভারতে অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসের মতো বড় বড় হাসপাতালে মেডিকেল সোশ্যাল সার্ভিস অফিসার নিয়োগ করা হয়। এসব অফিসার রোগীর পরিবারকে কাউন্সেলিং করেন। রোগীদের কল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা এবং ডাক্তার ও আত্মীয়দের মধ্যে যোগাযোগ সহজ করেন। শ্রীলঙ্কায় মেডিকেল সোশ্যাল সার্ভিস ইউনিটগুলো কাউন্সেলিং, আর্থিক নির্দেশনা ও পুনর্বাসনের পরামর্শ দিয়ে থাকে।

বস্তুত উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় সমাজকর্মীরা অপরিহার্য। যুক্তরাজ্যেও জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় তারা রোগীদের হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়া ও কমিউনিটিতে সহায়তা পেতে সমন্বয় করেন। যুক্তরাষ্ট্রে হাসপাতালের সমাজকর্মীরা রোগীদের মানসিক চাপ সামলাতে, স্বাস্থ্যবীমার নিয়ম বুঝতে এবং ফলোআপ চিকিৎসার পরিকল্পনায় সাহায্য করেন। কাজেই দেখা যাচ্ছে, স্বাস্থ্যসেবা শুধু রোগ সারানো নয়। বরং এটি রোগের সংকটের মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষকে সমর্থন করার বিষয়।

হাসপাতালের সমাজসেবা বিভাগকে শক্তিশালী করতে ব্যয়বহুল প্রযুক্তি বা বিদেশি পরামর্শকের প্রয়োজন নেই। দরকার জনবল বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ, দৃশ্যমানতা ও সন্নিবেশন। জনবল বৃদ্ধি মানে শুধু প্রশাসক নয়, বরং প্রশিক্ষিত সমাজকর্মী নিয়োগ দেওয়া। প্রশিক্ষণ মানে বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে মেডিকেল সোশ্যাল ওয়ার্ক বিষয়ে প্রোগ্রাম তৈরি। অন্যদিকে, দৃশ্যমানতা বলতে বোঝায় হাসপাতালের ভেতর স্পষ্ট দিকনির্দেশনা; সন্নিবেশন মানে হাসপাতালের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও রোগীর সেবা প্রক্রিয়ার সমন্বয় নিশ্চিত করা।

নতুন ওয়ার্ড তৈরি বা উন্নত যন্ত্রপাতি আমদানির চেয়ে এটি কম খরচের সংস্কার। কিন্তু এর প্রভাব হবে বিশাল, যার মধ্যে রয়েছে রোগী ও হাসপাতালের সেবাকর্মীর মাঝে কম সংঘাত, কম সহিংসতা, রোগীর জন্য সহজ সেবা এবং সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় জনগণের অংশগ্রহণ জোরদার করা। 

স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং শিশু ও মাতৃমৃত্যু হ্রাসের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দারুণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা অর্জনে শুধু সুযোগের প্রসার ঘটানোই যথেষ্ট নয়। এ জন্য চাই সেবাকে মানবিক করে তোলা। হাসপাতালের সমাজসেবা বিভাগকে আধুনিকীকরণের মাধ্যমে হাসপাতালকে শুধু চিকিৎসার জায়গা নয়, পূর্ণ অর্থে সেবার জায়গা করে তুলতে পারে বাংলাদেশ।

মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম: জনস্বাস্থ্য ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, সিনিয়র লেকচারার, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)

আরও পড়ুন

×