ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

কন্যাশিশুর মা

কন্যাশিশুর মা
×

.

ইফতেখারুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৫:৫৭ | আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১১:৪২

সোমবার সমকালে খুলনার এক হাসপাতালে কন্যাসন্তান জন্মদানকে কেন্দ্র করে এক মর্মান্তিক ঘটনার বর্ণনা এসেছে। শাহজাদীর চার কন্যাসন্তান হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে তাঁর ওপর পারিবারিক চাপ ছিল।

আবারও কন্যাসন্তান হলে বিয়ে বিচ্ছেদের হুমকি দিয়েছিলেন স্বামী। অন্যদিকে একই হাসপাতালে আরেক মা প্রসব করেন এক পুত্রসন্তান। সংসার টিকাতে হতভাগ্য শাহজাদী সেই পুত্রসন্তানকে নিজের কাছে নিয়ে নেন। এতে ওই পুত্রসন্তানের পিতা মানব পাচার আইনে শাহজাদী ও তাঁর মায়ের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে সিসি ক্যামেরায় ঘটনাটি ধরা পড়লে পুলিশ কন্যাশিশুর নানি নার্গিসকে আটক করে, যিনি ছয় দিন ধরে কারাগারে। উপরন্তু পুলিশ পাহারায় চিকিৎসাধীন শাহজাদীর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে আদালত তাঁকেও কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পরে কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়ায় শাহজাদী ও তাঁর ১২ দিনের কন্যাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে পাঠানো হয়েছে।

আমরা জানি, হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়ত লাভের আগে আরবে ছিল আইয়ামে জাহেলিয়াত বা অন্ধকার যুগ। তখন কন্যাসন্তানের জন্ম হলে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে জ্ঞানজগতের এত উৎকর্ষের পরও কেন খুলনায় এ ধরনের ঘটনা ঘটে? এটা কি স্রেফ আমাদের মানসিকতা, নাকি এর সঙ্গে ভিন্ন কিছু যুক্ত?

বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ এখনও মেয়েদের জন্য অত্যন্ত অনিরাপদ জায়গা। এখানকার রাস্তাঘাট, এমনকি কোনো কোনো অফিসও নারীর জন্য অনিরাপদ। প্রতিনিয়ত আমরা খবরের কাগজে নারী নিপীড়ন কিংবা লাঞ্ছনার খবর দেখতে পাই। এখনও বহু কর্মক্ষেত্রে নারীর যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতাকে ছেলেদের চেয়ে দুর্বল ভাবা হয়, যদিও নিশ্চিতভাবে আমরা জানি, বহু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বহু নারী যোগ্যতা ও দক্ষতায় ছেলেদের অতিক্রম করেছে। এ অবস্থায় কন্যাশিশু এখানে পরিবারের কাছে এক ধরনের বোঝা হবে– এটাই স্বাভাবিক।

এই মনোভাব শুধু বাংলাদেশের মতো পিছিয়ে থাকা রাষ্ট্রগুলোতে নয়, বরং  অনেক উন্নত দেশেও দেখা যায়। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত অর্থনৈতিক কাঠামো, যা নারীকে স্বাধীন সত্তা হিসেবে বিবেচনা করে না। ফলে সমাজে নারীকে অর্থনৈতিক দিক থেকে অনুৎপাদনশীল ভাবা হয়। বাংলাদেশও এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়।

কিন্তু কন্যাশিশু জন্মদানের দায় তো মায়ের নয়। বিজ্ঞান বলে, ছেলেদের এক্স ওয়াই ক্রোমোজোমের ওয়াই আসে বাবার কাছ থেকে। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ঘটনা এটি। এখানে মায়ের কী করার থাকে?
আসলে এ অজ্ঞতার পাশাপাশি এটাও সত্য, আমরা নারীদের ক্ষমতায়ন নিয়ে উৎফুল্ল হলেও আদতে নারীদের যথার্থ ক্ষমতায়নে রাজি নই। অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে যাদের আমরা নারীর ক্ষমতায়নের আদর্শ হিসেবে তুলে ধরি, তাদের বেশির ভাগই বনেদি পরিবারভুক্ত। এই সমস্যা দেশের প্রবৃদ্ধি ধরে উন্নয়ন বোঝার গোঁজামিলের মতোই, যেখানে একজন দিনমজুর ও কোটিপতির মাথাপিছু আয় একই। অথচ যে কোনো রাষ্ট্রে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি দেখা দরকার প্রান্তিক পর্যায় থেকে। অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও রাজনীতি ক্ষেত্রে কত শতাংশ নারী দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা থেকে এসে জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে? জাতীয় রাজনীতি, সংস্কৃতি কিংবা অর্থনীতিতে আমাদের এ ধরনের কোনো নজির নেই। ফলে এখান থেকেই আমাদের বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক রাজনীতির স্বরূপ পরিষ্কার হয়ে ওঠে। 

যতদিন নারীর ক্ষমতায়ন প্রশ্নে সমাজের নীচুতলার দিকে নজর দেওয়া না হবে, ততদিন আমাদের চিন্তা কাঠামোতে পারিবারিক বা সামাজিক অনেক সমস্যার জন্য শাহজাদীদেরই নন্দঘোষ বানানো হবে। এ ক্ষেত্রে শুধু শাহজাদীর স্বামীকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। সমস্যার মূলে যেতে হবে এবং তার টেকসই সমাধান খুঁজতে হবে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক নারী-পুরুষের মধ্যে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা ছাড়া এ ধরনের মনোভাব দূর করা অসম্ভব। এ সত্য মেনে নিতে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ও নীতিনির্ধারকরা কতটা প্রস্তুত– সেটাই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।   

ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×