ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

দিবস

বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস 

বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস 
×

মো. মামুন হাসান

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৮:০৩ | আপডেট: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১০:২৫

সাধারণভাবে মানুষ কেবল কুকুরের কামড়কেই জলাতঙ্কের কারণ হিসেবে বিবেচনা করে। বাস্তবে বিড়াল, বানর, বাদুড়, বেজি, শিয়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড়, আঁচড় বা লালার সংস্পর্শেও এ রোগ ছড়াতে পারে। বিশ্বের প্রায় ৯৫ শতাংশ জলাতঙ্কের সংক্রমণ ঘটে কুকুরের মাধ্যমে। ভাইরাসটি একবার শরীরে প্রবেশ করে মস্তিষ্কে পৌঁছালে প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রেই মৃত্যু ঘটে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতিবছর প্রায় ৫৯ হাজার মানুষ জলাতঙ্কে মারা যায়। যার মধ্যে অধিকাংশ মৃত্যু ঘটে এশিয়া ও আফ্রিকার দরিদ্র অঞ্চলে। গড়ে প্রতি ৯ মিনিটে একজন মানুষ এ রোগে প্রাণ হারান। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই শিশু।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০০৭ সাল থেকে প্রতিবছর ২৮ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস। এ দিনটি ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুরের মৃত্যুবার্ষিকীতে পালিত হয়, যিনি প্রথম জলাতঙ্ক প্রতিরোধের ভ্যাকসিন উদ্ভাবন করেছিলেন।

বাংলাদেশে একসময় জলাতঙ্ক ছিল গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জলাতঙ্ক রোগে মানুষের মৃত্যুসংখ্যা ২০১৫ সালে ছিল ৮৩; ২০২১ সালে ৪০ এবং ২০২৪-এ ছিল ৫৬। অন্যদিকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে ২০২০ সালে জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত ও মৃত গবাদিপশুর সংখ্যা ছিল চার হাজার ১৪৩টি, যা ২০২৪ সালে নেমে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ১৩০-এ। অর্থাৎ গত ৫ বছরে জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত গবাদি প্রাণীর সংখ্যা কমেছে তিন হাজার ১৩টি।

২০২০ সালে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাঠানো ৮৩টি কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত প্রাণীর নমুনা পরীক্ষা করে ৭৩টি জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়। ২০২৪ সালে ২০টির মধ্যে পাঁচটি এবং চলতি ২০২৫ সালে ২৫টি নমুনা পরীক্ষায় তিনটি পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে। এই সাফল্য এসেছে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা, গণটিকাদান কর্মসূচি, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দেশি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতার কারণে। বাংলাদেশ সরকার ২০১০ সালে জাতীয় জলাতঙ্ক নির্মূল কর্মসূচি চালু করে।

২০২২ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৮ লাখ ৩০ হাজার মানুষ প্রাণীর কামড়ের কারণে জলাতঙ্ক রোগের ভ্যাকসিন নিয়েছেন। ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশের প্রায় ১৬ লাখ টিকা দেওয়া হয়েছে। এ বছর শুধু বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবসকে কেন্দ্র করে আরও ৭০ হাজার পোষা প্রাণীকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর মানব ও প্রাণী উভয় খাতে সমন্বিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। স্থানীয় সরকার ও সিভিল সোসাইটি মাঠ পর্যায়ে টিকাদান, সচেতনতা ও প্রাণী নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। 

নানাবিধ অগ্রগতি সত্ত্বেও এখনও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। যেমন রাস্তার কুকুর নিয়ন্ত্রণ ও টিকাদানে জটিলতা, গ্রামীণ পর্যায়ে সচেতনতার অভাব, পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও টেকসই কর্মসূচির ঘাটতি, উন্নত ল্যাবরেটরি ও দ্রুত রোগ নির্ণয়ের সীমাবদ্ধতা।

বাংলাদেশ সরকার ‘জিরো হিউম্যান ডগমেডিয়েটেড রেবিস ডেথ বাই ২০২৩০’ লক্ষ্য সামনে রেখে নতুন জাতীয় কৌশল গ্রহণ করেছে। এর আওতায় সারাদেশে নিয়মিত কুকুরকে টিকাদান, ইন্টিগ্রেটেড বাইট কেস ম্যানেজমেন্ট বাস্তবায়ন, গ্রামীণ পর্যায়ে মানুষের জলাতঙ্ক রোগের ভ্যাকসিন সহজলভ্য করা। বাংলাদেশ জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে এক দশকে ৯০% মৃত্যুহার হ্রাস করে বিশ্বে একটি সফল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তবে চূড়ান্ত লক্ষ্য– ২০৩০ সালের মধ্যে জলাতঙ্কজনিত মানব মৃত্যু শূন্যে নামিয়ে আনা।

বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়– জলাতঙ্ক প্রতিরোধযোগ্য। সচেতনতা, টিকাদান ও সঠিক সময়ে চিকিৎসার মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু শূন্য মৃত্যুর লক্ষ্য অর্জনই নয়, বরং বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার লড়াইয়েও একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।

মো. মামুন হাসান: সিনিয়র তথ্য অফিসার, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়

আরও পড়ুন

×