নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা
শুধু গ্রন্থে নহে, গোহালেও থাকুক
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:২৮ | আপডেট: ০২ অক্টোবর ২০২৫ | ১১:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য নির্বাচন কমিশন যেই সকল ‘নিবন্ধনযোগ্য প্রতিষ্ঠান’ চিহ্নিত করিয়াছে, ঐগুলি কী যোগ্যতায় এইরূপ গুরুদায়িত্ব পালনের উপযোগী সাব্যস্ত হইল, উহা আমাদের গুরুতর প্রশ্নের সম্মুখে দাঁড় করাইয়াছে। সোমবার ও মঙ্গলবার সমকালে দুই পর্বে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাইতেছে, তালিকাভুক্ত কোনো কোনো সংগঠনের কার্যত অস্তিত্বই নাই। প্রদত্ত ঠিকানায় গিয়া ঝোপ-জঙ্গল, বসতবাড়ি কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মিলিয়াছে। এই ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাইয়ের ন্যূনতম শর্তও যে প্রতিপালিত হয় নাই, উহা বুঝিবার জন্য বিশেষজ্ঞ হইবার প্রয়োজন নাই। যেইগুলির ঠিকুজি সামান্য ভদ্রস্থ, ঐগুলির ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা পরিহারের বিষয়টি মান্য করা হয় নাই। আমাদের সন্দেহ সামান্যই, নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার নিবন্ধনের প্রাথমিক কর্মও নির্বাচন কমিশন আন্তরিকতা ও দক্ষতার সহিত সম্পন্ন করে নাই। ফলস্বরূপ নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষক সংস্থা বাংলা প্রবাদে কাজীর গরুর ন্যায় শুধু গ্রন্থেই রহিয়াছে, গোহালে নাই।
আমরা দেখিয়াছি, কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন কমিশনের নিবন্ধিত প্রায় একশত স্থানীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থার সবটির নিবন্ধন গত ১৮ জুলাই বাতিল করিয়াছে বর্তমান নির্বাচন কমিশন। বিতর্কিত প্রতিবেদন দাখিলসহ বেআইনি বিভিন্ন সুবিধা লাভের অভিযোগে যদি ঐ সকল প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিল হইয়া থাকে, তাহা হইলে নূতন করিয়া ভুঁইফোঁড় সংগঠনগুলিকে নিবন্ধন প্রদানের যৌক্তিকতা কোথায়? প্রশ্নটি বিপরীতক্রমেও উত্থাপন করা যাইতে পারে; ভুঁইফোঁড় সংগঠনকেই যদি নিবন্ধন দেওয়া হইবে, তাহা হইলে বাতিলকৃত সংগঠনগুলি কী দোষ করিয়াছিল? সত্য যে, নির্বাচন কমিশনের গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হইয়াছে, তিন শতাধিক প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনের আবেদন করিয়াছিল। যাচাই-বাছাই শেষে তন্মধ্য হইতে ৭৩ প্রতিষ্ঠানের তালিকা করা হইয়াছে। আমাদের প্রশ্ন, এই ‘যাচাই-বাছাই’ সম্পন্ন হইয়াছে কী প্রক্রিয়ায়? এই প্রশ্নও এখন অমূলক হইতে পারে না– তিন শতাধিক আবেদনকারীর মধ্যে বাতিলকৃত সংস্থাগুলির ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া যথার্থ হইয়াছে কিনা। বাছাইকৃত সংগঠনগুলির ব্যাদানকৃত মুখচ্ছবি দেখিবার পর আমরা দাবি জানাইব, বাতিলকৃত সংগঠনগুলির তালিকাও প্রকাশ করা হউক, যাহাতে সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সংগঠন ঐগুলিও যাচাই করিয়া দেখিতে পারে।
মন্দের ভালো, নির্বাচন কমিশন জানাইয়াছে– কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কাহারও আপত্তি বা অভিযোগ থাকিলে ২০ অক্টোবরের মধ্যে লিখিতভাবে জানাইতে হইবে। ইহার পর শুনানি শেষে পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন চূড়ান্ত করা হইবে। প্রাথমিক তালিকায় এই কেলেঙ্কারির পর চূড়ান্তকৃত সংগঠন বা সংস্থাগুলির নির্বাচন পর্যবেক্ষণ-যোগ্যতাও যাচাই করিতে হইবে বৈ কি। ঢাকাই প্রবাদের ন্যায় ‘উপরে ফিটফাট, ভিতরে সদরঘাট’ সংস্থা তদবিরের জোরে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পাইবার উদাহরণ নেহায়েত কম নাই। নির্বাচন পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে আমরা উহার পুনরাবৃত্তি কামনা করি না। ইহাও মনে করি, চূড়ান্ত তালিকা এবং তালিকাভুক্ত সংগঠনগুলির সক্ষমতা যাচাইয়ের পূর্বেই ভুঁইফোঁড় প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক তালিকাভুক্ত হইবার প্রক্রিয়া সম্পর্কে তদন্ত করিতে হইবে। যেই সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর দায়িত্বহীনতা কিংবা অতি উৎসাহের কারণে ইহা ঘটিয়াছে, তাহাদেরও জবাবদিহি করিতে হইবে। নির্বাচন কমিশনকে বিতর্কিত করিতে ইহা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের নাশকতামূলক কর্ম কিনা, খতাইয়া দেখা জরুরি। অন্যথায় সরিষার অভ্যন্তরের এই ভূত ভবিষ্যতেও নির্বাচন কমিশনের নীতিগত সদিচ্ছায় অনৈতিকতার দাগ লাগাইতে থাকিবে।
স্মরণে রাখিতে হইবে, একাদিক্রমে তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হইবার পর একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য জাতি অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ। এই ক্ষেত্রে বিশেষত নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতিতে ঘাটতি রাখা চলিবে না। প্রশ্নটি নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তিরও। স্মরণে রাখিতে হইবে, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক করিয়া তুলিতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি, তৎসহিত সরকার, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও সাধারণ ভোটারের আস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। উহা কেবল নিয়ম ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা দিয়া সুলভ হইতে পারে না। বরং ভাবমূর্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিয়া থাকে। কিন্তু নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থার নিবন্ধনেই যদি এতখানি গলদ মুখ ব্যাদান করিয়া থাকে, ভাবমূর্তির মুখচ্ছবি মলিন হইতে বাধ্য।
