সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যার আমাদের মাঝে ফিরে আসুক
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
শেখ হাফিজুর রহমান সজল
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৫ | ১৫:৫৫ | আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২৫ | ১৬:৪৩
দেশ বরেণ্য শিক্ষক সর্বজন শ্রদ্ধেয় সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, যাঁকে আমরা সবাই এসএমআই স্যার বলেই ডাকি, তিনি আজ লাইফ সাপোর্টে আছেন। তাঁর ছাত্র হিসেবে এটি আমাদের জন্য কষ্টের। ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে বেসরকারি একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় শারীরিক পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটলে রোববার সন্ধ্যায় স্যারকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়েছে। দেশ বিদেশের অসংখ্য শিক্ষার্থীদের প্রাণের শিক্ষক হিসেবে পরিচিত এসএমআই স্যারের অসুস্থতার খবরে সবাই বিচলিত এবং সবাই তাঁর সুস্থতার জন্য মহান রাব্বুল আলামীনের কাছে দোয়া প্রার্থনা করছেন।
রবী ঠাকুরের ‘সকল শিক্ষক গুরু নয়’ কথাটি এসএমআই স্যারের সঙ্গে প্রযোজ্য নয়; তিনি শুধু শিক্ষকই নয় তিনি আমাদের সকলেরই গুরু হিসেবে সমাদৃত। এসএমআই স্যারের মত এত প্রজ্ঞাবান, আধুনিকমনষ্ক, দূরদর্শী ও সত্যিকার অর্থেই গর্ব করার মতো শিক্ষক খুব কমই আছে। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যারকে শিক্ষকের চেয়েও প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, গল্পকার, সাহিত্য সমালোচক, সমকালীন রাজনৈতিক বিশ্লেষক, চিত্র সমালোচক হিসেবে অধিকাংশরা চেনেন।
স্যারের ছাত্র হিসেবে অসংখ্য স্মৃতির মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল তাঁর ক্লাস। মঞ্জু স্যারের শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল অন্য শিক্ষকদের থেকে একদমই আলাদা। স্যারের অসাধারণ বলারভঙ্গী আর ব্যতিক্রমী স্টাইল যা ইদানিংকালের শিক্ষকদের মাঝে ভীষণভাবে অনুপস্থিত। এসএমআই স্যারের ক্লাসে অসংখ্য সমকালীন উদাহরণের উপস্থিতি থাকে যা শিক্ষার্থীদের জন্য বুঝতে সহায়ক হয়। স্যারের প্রতিটি ক্লাস ইংরেজি সাহিত্যের সাথে ইতিহাস, প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের সাহিত্য ধারা ও সমকালীন বাস্তবতার সেতু বন্ধন ছিল। পাশাপাশি স্যারের রসবোধ, হাস্যরসাত্মক উপমা ও প্রতীকের মাধ্যমে তিনি ক্লাসকে সদা প্রাণবন্ত রাখেন এবং এই কারণে স্যারের ক্লাস সবসময় শিক্ষার্থী ভরপূর থাকে। ব্যাঙ্গাত্মক উক্তি আর রম্যবোধ স্যারের ক্লাসকে আরও আনন্দদায়ক করে তুলতো। তাছাড়া, মঞ্জু স্যারের ক্লাস ঘন্টার পর ঘন্টা করলেও কেউ বিরক্ত হয়েছে এমন কথা কেউ বলতে পারবে না।
কলাভবনের দোতলার সেই শ্রেণি কক্ষগুলো থেকে শুরু করে ইংরেজি ডিপার্টমেন্ট অ্যালামনাই, বিভাগের পিকনিক, ড্রামা সোসাইটি, ডিপার্টেন্টের যে কোন ম্যাগাজিন, জার্নাল, টকশো অথবা পত্রিকার কলামসহ সর্বত্রই ছিল এসএমআই স্যারের সক্রিয় বিচরণ। আমাদের মতো সচেতন পাঠক সমাজ স্যারের কলাম পড়ার জন্য সব সময় উৎসুক হয়ে থাকে। একদম পাঠকদের মনের কথাই উঠে আসতো স্যারের প্রতিটি লেখায় বা বক্তব্যে। উল্লেখ্য, তাঁর বক্তৃতা বা লেখায় আলোচিত কোনো সমস্যার বর্ণনা, সমস্যার কারণ, সমাধান ও সমাধানের বিভিন্ন উপায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে। তবে সবচেয়ে অনুকরণীয় দিক হলো- স্যারের কথা বলার ধরণ ও ভঙ্গি, যেটা স্যারকে সত্যিকার অর্থেই ব্যতিক্রমী করে তুলেছে।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যার শুধু গুরু বা শিক্ষকই নয়, তিনি আমাদের সকলের অভিভাবক হিসেবেই আছেন। ডিপার্টেন্টের শিক্ষার্থী ছাড়া অনেক শিক্ষার্থীদের স্যার আর্থিকভাবেও সহায়তা এবং চাকরির জন্য তিনি সুপারিশ পাঠাতেন। তাছাড়া, দেশ বিদেশের উচ্চ শিক্ষা, এমফিল, পিএইচডি বা অন্য অনেক কারণের জন্য শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, বরং অনেক শিক্ষকদের জন্য রিকমেন্ডেশন লেটার লিখে দিতেন। শুধু কি তাই, রাজনৈতিক বা অন্যান্য কারণে শিক্ষা জীবন যথাসময়ে সমাপ্ত করতে না পারা বহু শিক্ষার্থীদের পক্ষেও স্যার কথা বলতেন এবং তাঁদের শিক্ষাজীবন ফিরিয়ে দিতে সাহসী ভূমিকা নিতে কখনো দ্বিধা করতেন না।
স্যারের সঙ্গে আমার অসংখ্য ব্যক্তিগত স্মৃতি আছে, আছে সীমাহীন কৃতজ্ঞতাবোধ। মাস্টার্স শেষ করার পর ইংরেজী বিভাগের আরেক শিক্ষক প্রয়াত খন্দকার রেজাউর রহমান স্যার ও এসএমআই স্যার দুজন মিলে আমাকে একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন; যা আমি কখনোই ভুলব না। এছাড়া, বিসিএস লিখিত পরীক্ষার আগে স্যার যে পরামর্শ দিয়েছেন সেটা আক্ষরিক অর্থে ভীষণ কাজে লেগেছে। আমার মতো অগণিত শিক্ষার্থীদের স্যার নিঃস্বার্থভাবে উপকার করেছেন, দিয়েছেন দিক নির্দেশনা আর দায়িত্ব পালন করেছেন অভিভাবকের মতো। এখানে উল্লেখ্য যে, এসএমআই স্যারের দ্বারা উদ্ভুদ্ধ হয়ে আমি পত্রিকায় নিবন্ধ লেখা শুরু করি এবং আমার প্রথম নিবন্ধ মঞ্জু স্যারই একটি জাতীয় পত্রিকায় ছাপানোর ব্যবস্থা করেছিলেন।
প্রায়ই স্যারের সঙ্গে কথা হত। ভাবির অসুস্থতা নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলেন। সে দিনও বেশ কিছুক্ষণ স্যারের সঙ্গে কথা হলো। ভাবতে পারছি না চির তরুণ, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ও শিক্ষার্থী বান্ধব এসএমআই স্যার আকস্মিক অসুস্থ হয়ে লাইফ সাপোর্টে চলে যাবেন। এদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু নির্বাক শ্রেণিকক্ষ, চেয়ার, পডিয়াম, বেঞ্চ, ফুলার রোডসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি প্রাঙ্গণ, ক্যাম্পাসের গাছ-পালা, নীরব করিডোর আর অসংখ্য বই ও চিত্রকর্মে ঠাসা স্যারের নিজের রুমই শুধু নয়, অগণিত শিক্ষার্থীদের অনেকের চোখেই আজ ঘুম নেই, সবাই আজ উদ্বিগ্ন ও স্রষ্টার কাছে প্রার্থনারত। সবার মনের আকুতি একটাই- সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসুন এসএমআই স্যার। দেশ বিদেশের আপনার লাখো শিক্ষার্থীরাসহ গোটা দেশবাসী আপনার ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করছে, সবাই দোয়া করছে আপনার সুস্থতার জন্য।
শেখ হাফিজুর রহমান সজল: উপসচিব, কৃষি মন্ত্রণালয় ও প্রাক্তন ছাত্র, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
