চারদিক
আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর ডাকসেবা
মো. মনিরুজ্জামান
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:১৭ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৫ | ১২:১১
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন ও আধুনিক প্রযুক্তি অভিযোজনের মাধ্যমে সাশ্রয়ী, মানসম্পন্ন ও আন্তর্জাতিক মানের ডাকসেবা নিশ্চিতের অঙ্গীকার নিয়ে চলা বাংলাদেশের ডাক ব্যবস্থা একটি ঐতিহ্যবাহী ও জনবান্ধব সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ ডাক বিভাগ দেশের প্রতিটি অঞ্চলে যোগাযোগ ও সেবার বন্ধন গড়ে তুলেছে। বর্তমানে ডাক বিভাগ শুধু চিঠি পরিবহনে সীমাবদ্ধ নয়। তথ্যপ্রযুক্তির যুগেও ডাক বিভাগের গুরুত্ব কমে যায়নি, বরং নতুন আঙ্গিকে বেড়েছে। এখন নাগরিক সেবা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ কাজ করছে। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর পণ্য পরিবহনে ডাক বিভাগের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ডাক বিভাগ এক সময় মানুষের ভালোবাসা, খবর ও যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রাইভেট সার্ভিস কুরিয়ার ও ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থা জনপ্রিয় হওয়ায় ডাক বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা কিছুটা কমেছে। তাই এখন প্রয়োজন সেবার মান, গতি ও নির্ভরযোগ্যতা ফিরিয়ে এনে সেই আস্থা পুনর্গঠন করা।
আস্থাশীল ডাক বিভাগ গঠনে আইসিটির ভূমিকা অনস্বীকার্য। সাশ্রয়ী সেবা নিশ্চিত করতে আইসিটির ভূমিকাকে অগ্রাধিকার বিবেচনা করে ডিজিটাল অটোমেশনের মাধ্যমে পত্র, পার্সেল ও আর্থিক লেনদেন প্রক্রিয়া কম্পিউটারভিত্তিক করলে সময় ও জনবল খরচ কমে। ফলে সেবা আরও সাশ্রয়ী হয়। ইলেকট্রনিক পেমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিং, পোস্টাল ক্যাশ কার্ড ও অনলাইন বিল পেমেন্ট চালু থাকলে গ্রাহককে আর অফিসে যেতে হয় না। ফলে সময় ও যাতায়াত ব্যয় দুই-ই সাশ্রয় হয়। ডিজিটাল রুট পরিকল্পনায় আইসিটি ব্যবহার করে ডাকপিয়নের পথ নির্ধারণ করা গেলে জ্বালানি ও সময় বাঁচে, খরচও কমে। সেবা প্রদানের ধীরগতি ও পুরোনো অবকাঠামো থেকে বের হয়ে আইসিটি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা ঘুচিয়ে ডাক বিভাগকে এখন আইসিটিতে শক্তিশালী হতে হবে। গ্রামীণ অঞ্চলে ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো-বিষয়ক দুর্বলতার উত্তরণ ঘটাতে হবে। আইসিটিকে উপেক্ষার মনোভাবের উন্নয়ন ঘটিয়ে কর্মীদের আইসিটিতে দক্ষতা বাড়িয়ে ও নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ততা তৈরি করে গ্রাহকসেবার মনোভাব বাড়াতে হবে, যেন গ্রাহকের আস্থার সংকট না হয়।
প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন দ্রুত, ট্র্যাকযোগ্য ও ঘরে পৌঁছে দেওয়ার সেবা দিচ্ছে, তেমন আইসিটি বেজড সেবা দিতে হবে। আইসিটি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিটি পার্সেল বা চিঠি রিয়েল টাইমে ট্র্যাক করার ব্যবস্থা গ্রাহকের মনে নিরাপত্তা ও আস্থা তৈরি করে। এ সবকিছু অর্জনে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আইসিটি বেজড ডাক বিভাগ এখন সময়ের দাবি।
ডাক বিভাগ দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও যোগাযোগের জীবন্ত প্রতীক। তবে জনগণের আস্থা ফিরে পেতে এখন প্রয়োজন দ্রুত সেবা, ডিজিটাল রূপান্তর ও ব্যবস্থাপনা, কর্মদক্ষতা, জবাবদিহি। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হলে ডাক বিভাগ আবার হয়ে উঠবে জনগণের নির্ভরযোগ্য, আধুনিক ও গর্বের প্রতিষ্ঠান। ডাক বিভাগকে টিকিয়ে রাখতে ও জনগণের আস্থা ফেরাতে প্রযুক্তি ব্যবহারের বিকল্প নেই।
আইসিটি-নির্ভর ডিজিটাল ডাক বিভাগ গড়ে উঠলে তা হবে জনগণের কাছে নির্ভরযোগ্য, স্বচ্ছ, সাশ্রয়ী ও গর্বের একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান।
ডাক বিভাগ শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি মানুষের আবেগের অংশ। প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক যুগে ডাক বিভাগ যদি তথ্যপ্রযুক্তি, দক্ষতা ও সেবার মান একত্রে উন্নত করে, সেটি আবার হতে পারে জনগণের সবচেয়ে সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও প্রিয় যোগাযোগ ব্যবস্থা। প্রযুক্তির এই যুগেও ডাক বিভাগের মানবিক সেবা আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ।
৯ অক্টোবর ছিল বিশ্ব ডাক দিবস। আমাদের অঙ্গীকার হোক ডাক বিভাগকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর, আধুনিক, কার্যকর ও জনগণের আস্থার প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলা।
মো. মনিরুজ্জামান: ডাক অধিদপ্তরে কর্মরত
[email protected]
