ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রাজনীতি

শাসক শ্রেণির অনিবার্য বিধিলিপি

শাসক শ্রেণির অনিবার্য বিধিলিপি
×

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:২৪ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৫ | ১৪:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের শাসক শ্রেণিকে চিনবার উপায় কী? অতীতের ইতিহাস তো আছেই, বর্তমান দেখেও চেনা যায়। একটা পরিচয় হচ্ছে দেশপ্রেমের অভাব, অপরটি দুর্নীতি। আমাদের দেশে এখন যে যতটা বিত্তবান তার ভেতর দেশপ্রেম ততটাই কম। আর লুণ্ঠনই যাদের প্রধান কাজ তারা নীতি মানবে কেন? তারা যেভাবে পারবে নিজেদের কাজ চালিয়ে যাবে। যে জন্য দেশের কোথাও আজ কোনো আইন নেই, নিয়ম নেই, শৃঙ্খলা নেই। রয়েছে কেবল দুষ্কর্মের প্রতিযোগিতা এবং দুষ্কর্মে যে যত পারঙ্গম তাকেই দেখা যাচ্ছে তত প্রত্যক্ষ ও ক্ষমতাদৃপ্তরূপে। শাসক শ্রেণি যা করে অন্যরা তারই অনুসরণ করে। বাধ্য হয় করতে। সাধারণ মানুষ এই সব বীর ও নেতাকে দেখেই শিখছে যা শিখবার। ভালো দৃষ্টান্ত বড়ই বিরল। খারাপ দৃষ্টান্তগুলো ভালোদের ক্রমাগত দুর্বল ও অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।

চিনবার আরও একটি উপায় আছে বৈ কি। সেটা হলো রুচি। এই শ্রেণিটির নিজস্ব রুচি বলতে কিছুই নেই। যেখানে যা পায় আত্মসাৎ করে; এই ব্যাপারটা এদের বস্তুগত জীবনে যেমন সত্য, অবিকল সত্য তেমনি মানসিক জগতেও। কেবলই গোঁজে, গোঁজামিল দেয়। ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে কথা বলে। ইংরেজি উচ্চারণ যে উৎকট হবে, সেটা অপ্রত্যাশিত নয়। কিন্তু বাংলাও বলে গ্রাম্য চালে, যেন কেয়ার করে না, স্বেচ্ছাচারী। যা বলে তা-ই ঠিক। কেননা, তারা হচ্ছে ক্ষমতাবান, জমিদার।

আসলে রুচি দিয়েই মানুষ চেনা সহজ। চেনা যায় এদেরও। ঘর ভরে ফেলে আসবাবে, বিলাসের উপকরণে। দেশি-বিদেশি সামগ্রীর প্রদর্শনী গড়ে তোলে আপন আপন বাসগৃহে। বোঝা যায়, সব কিছুই খেয়েছে। খাবে; হজম করার কথা ভাববে না। ছেলেমেয়ের বিয়েতে গায়ে হলুদের আয়োজন করবে যতটা পারা যায় গ্রামীণ প্রথা ও উৎসাহে। কিন্তু সমান বেগে, একই অনুষ্ঠানে ব্যবস্থা রাখবে ব্যান্ড মিউজিকের, যেখানে তরুণরা তো বটেই, এমনকি বয়স্করাও অত্যন্ত উদ্বেল হয়ে উঠবে নৃত্যপরতায়।

চেনা যায় অবশ্য জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক দেখেও। সম্পর্কটি পুরাতন এবং মোটামুটি অপরিবর্তিত। সেটা হচ্ছে শোষণের।

শাসক শ্রেণি ক্ষমতায় আরোহণ প্রচেষ্টায় জনগণকে সঙ্গে নেয়, আন্দোলনে ডাকে। বৈধতা নেওয়ার জন্য কিংবা বিরোধী দলকে ক্ষমতাচ্যুত করবার জন্য ভোট চায় এবং সমর্থন আদায় করে নেয়; কিন্তু ক্ষমতায় যে-ই আসুক সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটে, তা মোটেই নয়। আগে যেমন ছিল এখনও তা-ই, দেশের ভেতরে মূল দ্বন্দ্বটা থাকে শাসক শ্রেণির সঙ্গে জনগণেরই। 

এরই মধ্যে আবার রয়েছে মৌলবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের উৎপাত। মৌলবাদ ক্রমশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, মৌলবাদীরা জঙ্গি আকার ধারণ করছে– মোটেই অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু মৌলবাদীদের যে এমন বাড়বাড়ন্ত, তার রহস্যটা কোথায় সেটা দেখতে হবে।

সত্য কেবল এটা নয় যে, শাসক শ্রেণি এদের নিয়ে তথাকথিত আন্দোলন করে এবং ভোট পাবার জন্য ব্যবহার করে। সত্য এটাও যে, ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের যে সামাজিক ভূমি সেটা তৈরি এবং তাতে বারি সিঞ্চনের কাজটি শাসক শ্রেণিই করে; কখনও কখনও হয়তোবা করে থাকে ইচ্ছা-নিরপেক্ষভাবেই। ওই দুই কর্ম তারা সম্পন্ন করে দুই পন্থায়– এক. বৈষম্য বৃদ্ধি; দুই. দারিদ্র্য সৃষ্টি। বৈষম্য ও দারিদ্র্য আবার পরস্পর নির্ভরশীল। বৈষম্য যত বাড়ে, সমষ্টিগত দারিদ্র্যও তত বাড়ে এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধিও বৈষম্য বৃদ্ধির কারণ হয় বৈ কি।

আমাদের শাসকেরা মাদ্রাসা শিক্ষার একনিষ্ঠ সমর্থক, যেখানে দরিদ্ররাই পড়তে যায় এবং পড়ে বেকার হয়। এ শিক্ষার্থীরা মনে করে, তারা শিক্ষিত। অথচ দেখে যে তাদের শিক্ষা তাদের না দিচ্ছে সম্মান, না সম্ভব করছে চাকরি পাওয়া। তাদের ভেতর তীব্র ক্ষোভ জেগে ওঠে; তারা হিংস্র হয়ে পড়ে। দেখে, বিত্তবানদের ছেলেমেয়ে কেমন ফুরফুর করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিত্তবানদের গায়ে যে হাত দেবে, তা পারে না। সেখানে নানা রকমের পাহারা আছে। তাই এরা বৃদ্ধি করে ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক দলের শক্তিকে, যোগ দেয় ক্যাডার হিসেবে। সুযোগ-সুবিধা কিছু পায়। একটা বীরত্বপূর্ণ কাজে লিপ্ত রয়েছে– এ ধরনের সন্তোষও অর্জন করে। আর নিজেদের বিতৃষ্ণাকে শানিত করে তাদের বিরুদ্ধে, যারা ধর্মনিরপেক্ষ, ইহজাগতিক, উদার রাজনৈতিক, সর্বোপরি যারা সমাজ পরিবর্তনে বিশ্বাসী। মেয়েদের প্রকাশ্যে চলাফেরা করতে দেখলে বলে– বেশরম, বামপন্থিদের বলে নাস্তিক।

ওদিকে শাসক শ্রেণির মানুষদের জীবনে যে শূন্যতা রয়েছে; স্থূল বস্তুতান্ত্রিকতা, কারও কারও মধ্যে রয়েছে অপকর্মের স্মৃতি, তা তাদের ‘আধ্যাত্মিক’ করে তোলে। রয়েছে আত্মপরিচয়ের সংকটও। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে চাঁদা দিয়ে, মাদ্রাসা খুলে, প্রতিযোগিতামূলক ও আন্তরিকতাহীন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এদের অনেকেই মনে করে, পরকালের জন্য পুঁজি সঞ্চয় করছে। ইহকালের সুখটাকে পরকালেও প্রলম্বিত করবে বলে তারা ভরসা রাখে। মোট কথা, এ শাসক শ্রেণি যতদিন ক্ষমতায় আছে ততদিন ওই ব্যাধি থেকে নিস্তারের আশা খুবই কম। নেই বললেই চলে।

সাম্রাজ্যবাদীরা, যারা নিজেদের ভাবে, অত্যন্ত আধুনিক ও প্রগতিশীল, তারাও কিন্তু ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের পৃষ্ঠপোষক। সাম্রাজ্যবাদীরা যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার রক্ষক, সেই ব্যবস্থা চরিত্রগতভাবেই বৈষম্য ও দারিদ্র্য সৃষ্টিতে বিশ্বাসী। সেটা হচ্ছে পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা। প্রত্যক্ষভাবেও যে এরা মৌলবাদীদের প্রশ্রয় দেয়, সেটা তো জ্ঞাত সত্য। তালেবান যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদেরই সৃষ্টি, তা নতুন কথা নয়। উদ্দেশ্য ছিল আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নকে হটানো। সোভিয়েত ইউনিয়ন আজ নেই, তাই তালেবানের পিতা-পুত্রের সম্পর্কের ইতি ঘটেছে। সন্দেহ নেই, সমাজতন্ত্রীদের যদি পুনরুত্থান ঘটে তাহলে এই দুই পক্ষ আবার এক হয়ে যাবে। এখন এক পক্ষ বলে ক্রুসেডের কথা, অন্য পক্ষ ডাক দেয় জিহাদের। বোঝা যায়, ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী চেতনা উভয়ের ভেতরই কার্যকর। তা ছাড়া আমেরিকার তো ‘শত্রু’ দরকার। নইলে অস্ত্র বিক্রি ও ব্যবহার করবে কোথায়?

সাম্রাজ্যবাদীরা যে আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ছিনতাই করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, আদতে আমাদের শাসক শ্রেণিই বরং আগ বাড়িয়ে নিজেদের সাম্রাজ্যবাদের বলয়ের ভেতর সবেগে নিক্ষেপ করেছে। এই আত্মসমর্পণ তাদের চরিত্রের ভেতরেই প্রোথিত। সাম্রাজ্যবাদীরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেনি, উল্টোটাই করেছে; বিরোধিতা করেছে। এখন যারা এসেছে তারা অনিবার্যরূপে সাম্রাজ্যবাদের নিরাভরণ মুখাপেক্ষী। বাঙালি জাতীয়তাবাদীরাও ওই জায়গাতে আটকা পড়ে রয়েছে। এ যুগে যে জাতীয়তাবাদী সকল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী হতে অসম্মত বা অসমর্থ হবে, তাদের অনিবার্য বিধিলিপি এটাই।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×