শিক্ষা ব্যবস্থা
মুখস্থবিদ্যা থেকে বের হতে হলে
আজিজুর রহমান
আজিজুর রহমান
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:২৪ | আপডেট: ১২ অক্টোবর ২০২৫ | ১৭:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশে বিরাজমান শিক্ষাব্যবস্থা যে সম্পূর্ণভাবে মুখস্থ বিদ্যানির্ভর তা হয়তো কেউ অস্বীকার করবে না। এতে, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের মধ্যে জিপিএ/সিজিপিএ পাওয়ার একটি তীব্র প্রতিযোগিতা কাজ করে; শিক্ষার্থী কী শিখল বা তার জ্ঞানের বহরে কিছু যোগ হলো কিনা, সেটি কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। জিপিএ/সিজিপিএ পাওয়ার দৌড়ে ছেলেমেয়েদের এগিয়ে রাখার জন্য অভিভাবকরা তাদের সাধ্য অনুযায়ী এক বা একাধিক প্রাইভেট টিউটর বা কোচিং সেন্টার তাদের পেছনে লাগিয়ে রাখেন। সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা শেষে শিক্ষার্থী কী শিখল, বা ওরা মানুষ হচ্ছে কিনা, সে প্রশ্ন কোনো অভিভাবক নিজেকে করেন বলে মনে হয় না। এমন কী, জিপিএ/সিজিপিএ পাওয়ার রেকর্ডের ভিত্তিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও একটি প্রতিযোগিতা চলে।
মাত্র কয়েকদিন আগে একটি পত্রিকার সংবাদে দেখলাম, গত এসএসসি পরীক্ষায় কোনো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সর্বোচ্চ সংখ্যক জিপিএ পাওয়ায় ওই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ওই শিক্ষার্থীদের খুবই জাঁকজমকপূর্ণ সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। অথচ জিপিএ পাওয়া এটিই বোঝায় যে, ওই শিক্ষার্থীরা মুখস্থবিদ্যায় খুব দক্ষ। তোতা পাখির মতো মুখস্থবিদ্যায় পারদর্শীরা কী জ্ঞানার্জন করল, ওই জ্ঞান আমাদের সমাজ উন্নয়নে বা মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কোনো কাজে লাগবে কিনা, সে-প্রশ্ন অভিভাবক বা শিক্ষকগণ উত্থাপন করেন বলে মনে হয় না।
মুখস্থবিদ্যার মতোই আরেকটি ভয়ংকর ব্যবস্থা হচ্ছে আমাদের দেশে বিরাজমান বহু ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা। এর মধ্যে তিনটি প্রধান ধারা হচ্ছে–সাধারণ শিক্ষা, কিন্ডারগার্টেন শিক্ষা এবং মাদ্রাসা শিক্ষা। ধারণা করা হয়, সাধারণ ধারার শিক্ষার্থীদের বড় অংশ মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের যোগাযোগ অন্যদের চেয়ে বেশি থাকে। অন্যদিকে, ইংরেজি মাধ্যমের কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য অংশ সমাজের বিত্তবান শ্রেণির সন্তান বলে মনে করা হয়। এই দ্বিতীয় ধারার শিক্ষার্থীরা বিদেশে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব থাকে বিধায় বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য-কৃষ্টি ইত্যাদির ব্যাপারে অনেকটাই উদাসীন থাকে। তৃতীয় ধারা, মাদ্রাসায়, সাধারণত গ্রামের দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরাই পড়াশোনা করে। এই শেষোক্ত ধারায় সচেতনভাবেই আধুনিক ধ্যান-ধারণা সাধারণত বর্জন করা হয়, যা প্রকারান্তরে জ্ঞান-বিজ্ঞানকে অস্বীকার করে। এই তিন ধারার শিক্ষার মাধ্যমে আসলে আমরা একই রাষ্ট্রে তিন ধরনের নাগরিক তৈরি করছি। অথচ, আমাদের ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১৭নং অনুচ্ছেদের (ক) অংশে বলা হয়েছে–‘একটি একমুখী, গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা চালু’র লক্ষ্যে রাষ্ট্র কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। আমাদের সংবিধানের সেই মহামূল্যবান প্রতিজ্ঞা আজও বাস্তবায়িত হয়নি।
আমাদের দেশের সাধারণ মানুষকে প্রায়ই বলতে শুনি যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হচ্ছে মানুষ তৈরির কারখানা। বাস্তবে আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে মানুষের পরিবর্তে নিতান্ত ব্যক্তিস্বার্থে পরিচালিত সংকীর্ণ চিন্তার মানুষ তৈরি হচ্ছে বলে অনুমিত হয়।
মানুষ আমরা তাকেই বলতে চাই, যার মধ্যে সর্বোচ্চ মানবিক গুণাবলি রয়েছে। মানবিক গুণাবলির মধ্যে রয়েছে–বাবা-মাসহ বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা, পাড়ামহল্লাসহ আশপাশের দশজনকে ভালোবাসা এবং তাদের সুখ-দুঃখে পাশে থাকা, নীতিনিষ্ঠ এবং কর্তব্যপরায়ণ হওয়া, কারও সঙ্গে কখনও কোনো অন্যায় আচরণ না করা, কোনো মানুষকেই কখনও অশ্রদ্ধা বা অপমান না করা; নিজের দেশ এবং দেশের জনগণকে ভালোবাসা, দেশের কল্যাণে করণীয় নির্ধারণ করা এবং সে অনুযায়ী কাজ করা। কোনো মানুষ আসলেই সুশিক্ষিত হলে, দেশের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে কোনো নামিদামি প্রতিষ্ঠানের কোনো পদে বসার পর ওই প্রতিষ্ঠান বা দেশের সর্বোচ্চ কল্যাণসাধনের চেষ্টা না করে নিজের পদোন্নতি এবং অঢেল বিত্ত-বৈভব অর্জনের অনৈতিক পথে পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটতে পারে না। অথচ আমাদের বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী বড় বড় কর্তাব্যক্তি সর্বক্ষণ এই অন্যায়-অনৈতিক কাজেই ব্যস্ত আছেন।

উপরোক্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, মুখস্থ বিদ্যানির্ভর একঘেয়ে ও নিরানন্দময় শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে প্রকৃত মানুষ তৈরির শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এ জন্য আমাদের দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ‘শিক্ষাসহায়ক কার্যাবলি’ (কো-কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটিজ) নামে একটি ব্যবস্থা রয়েছে। এজন্য, সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি বার্ষিক অনুদান প্রদানের ব্যবস্থাও রয়েছে। এই ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো হচ্ছে–খেলাধূলা, নাচ-গান, চিত্রাঙ্কন, নাট্যানুষ্ঠান, সাহিত্য-বিতর্ক প্রতিযোগিতা ইত্যাদি। উপরোক্ত বিষয়গুলোর প্রতিটির বিশদ বর্ণনায় না গিয়ে আমি কেবল নাচ-গান এবং চিত্রাঙ্কনের উপকারিতার দিকগুলো উল্লেখ করতে চাই। নাচ-গান শিক্ষার্থীদের গতানুগতিক শিক্ষা পরিবেশের মধ্যে একটা আনন্দঘন বৈচিত্র্য নিয়ে আসে; যা শিক্ষার্থীদের দারুণভাবে আকর্ষণ করে। পরপর একাধিক বিষয়ের শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের মনোনিবেশ করতে হলে তাদের মধ্যে যে একঘেয়েমিভাব তৈরি হয়, তা দূর করতে চিত্রাঙ্কন দারুণ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। শিক্ষকদের একটা বড় অংশের অসচেতনতার কারণে আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘শিক্ষাসহায়ক কার্যাবলি’ তীব্রভাবে অবহেলিত। অন্তত, প্রাথমিক এবং হাইস্কুলগুলোতে কমপক্ষে নাচ-গান এবং চিত্রাঙ্কনের নিয়মিত অনুশীলন থাকলে এসব অল্প বয়সী শিক্ষার্থীদের আনন্দঘন পরিবেশে শিক্ষা দেওয়া যেত।
একথাও বলতে হয় যে, শুধু শিক্ষার ধরন পাল্টালেই হবে না, প্রকৃত অর্থেই আমাদের দেশের শিক্ষার মানোন্নয়ন ঘটাতে হলে, শিক্ষায় সরকারি ব্যয় বরাদ্দ লক্ষণীয়ভাবে বাড়াতে হবে। এ বিষয়ে ইউনেস্কোর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে (বাংলাদেশ যার সদস্য) এর সর্বশেষ সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, শিক্ষা খাতে সদস্য রাষ্ট্রগুলো প্রতি বছর তাদের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপি’র ৬% বরাদ্দ রাখবে। বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ গত বেশ কয়েক বছর ধরেই জিডিপি’র মাত্র ২%-এর আশপাশে রয়েছে।
তাই, আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, শিক্ষা খাতে জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হোক। তা ন্যায্যতার ভিত্তিতে ব্যয় করা হলে শিক্ষা খাতে বিরাজমান শহর-গ্রামের বৈষম্যের মতো ধনী-গরিব বৈষম্যও কমানো যাবে। শিক্ষক-কর্মচারীদের উপযুক্ত বেতন-ভাতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অবকাঠামো সংকটও তাতে অনেকাংশে দূর হবে। তবে সবার আগে দরকার সংশ্লিষ্ট সবার মত নিয়ে একটা যুগোপযোগী শিক্ষানীতি, যার ভিত্তিতে গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকে খোলনলচে বদলে দেওয়া হবে।
ড. আজিজুর রহমান: প্রাক্তন অধ্যাপক, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- শিক্ষা
- মুখস্থবিদ্যা
- আজিজুর রহমান
