ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পাক-আফগান সংঘর্ষ যেদিকে গড়াতে পারে

পাক-আফগান সংঘর্ষ যেদিকে গড়াতে পারে
×

জিয়া উর-রহমান, ইয়াকুব আকবরি, সাফিউল্লাহ পাদশাহ, এলিয়ান পেল্টিয়ার

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৩০ | আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০২৫ | ১৩:৫৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

রোববার আফগানিস্তান ও পাকিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করে। আর দেশ দুটির সেনাবাহিনীর মধ্যে রাতভর মারাত্মক সংঘর্ষে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটে। এটি প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে সংঘটিত তীব্র সহিংসতাগুলোর মধ্যে একটি।

রোববার আফগান কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের নিরাপত্তা বাহিনী সীমান্তবর্তী পাকিস্তানি সামরিক চৌকিগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তারা এ হামলাকে ‘প্রতিশোধমূলক অভিযান’ বলে তুলে ধরেছেন। গত সপ্তাহে পাকিস্তান বিমানবাহিনী আফগানিস্তানে হামলা করেছে বলে দাবি করার পর কাবুল এ অভিযান চালায়। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর মতে, শনিবার কমপক্ষে পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে ২৩ জন এবং আহত ২৯ জন। তালেবান সরকার জানিয়েছে, ৯ জন আফগান সেনা নিহত এবং ১৬ জন আহত হয়েছে। তবে সীমান্ত অঞ্চলে প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ থাকায় তাদের কোনো দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

রাতভর চলা এ সংঘর্ষের ফলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এ সহিংসতা দুই দেশের মধ্যে আরও বিস্তৃত সংঘাতে রূপ নিতে পারে। কারণ ২০২১ সালে তালেবানরা আফগানিস্তানে ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের পর থেকে এ দুই দেশের সরকার ধীরে ধীরে একে অপরের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন হয়ে উঠেছে। তালেবান সরকারের প্রধান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ রোববার সাংবাদিকদের বলেন, কাতার ও সৌদি আরব দেশ দুটিকে সংযমের আহ্বান জানানোর পর মধ্যরাতে লড়াই বন্ধ হয়ে যায়। তিনি পাকিস্তানকে সতর্ক করে বলেছেন, আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্বের যে কোনো ধরনের লঙ্ঘনের প্রতিশোধ নেওয়া হবে।

রোববার এক বিবৃতিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী জানিয়েছে, রাতভর আফগানরা পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ব্যাপক গুলিবর্ষণ ও অভিযান চালিয়েছে। তারা জানিয়েছে, সৈন্যরা আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে ভারী কামান, বিমান হামলা ও অভিযান চালিয়ে হামলার জবাব দিয়েছে। বুধবার আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল এবং সীমান্তের কাছে একটি বাজারে পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে। তালেবান সরকার দাবি করেছে, পাকিস্তান এ জন্য দায়ী। 

শুক্রবার পাকিস্তান জানিয়েছে, তারা পাকিস্তানি জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ‘একাধিক প্রতিশোধমূলক অভিযান’ চালিয়েছে; তারা সরাসরি আফগানিস্তানের কথা উল্লেখ করেনি। বৃহস্পতিবার কাবুল ও সীমান্তবর্তী বাজারে বিস্ফোরণের জন্য পাকিস্তানও দায় স্বীকার করেনি। রোববার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সাম্প্রতিক সহিংসতার সুনির্দিষ্ট বিবরণ না দিয়ে সীমান্তে আফগান উস্কানির প্রতি ‘শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিক্রিয়া’ হিসেবে তুলে ধরার জন্য তার দেশের সশস্ত্র বাহিনীর প্রশংসা করেছেন। এ সময় তিনি বলেছেন, সেনাবাহিনী ‘তাদের বেশ কয়েকটি সীমান্ত চৌকি ধ্বংস এবং তাদের পিছু হটতে বাধ্য করেছে।’

উভয় দেশের সেনাবাহিনী সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রায়ই সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, যা প্রায় এক হাজার ৬০০ মাইল দীর্ঘ পাহাড়ি এলাকা দিয়ে বিস্তৃত। পাকিস্তান বারবার তালেবান সরকারকে নিষিদ্ধ গোষ্ঠী তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান-টিটিপি যা পাকিস্তানি তালেবান নামেও পরিচিত– আশ্রয় দেওয়ার জন্য অভিযুক্ত করেছে। তাদের হামলায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর শত শত সৈন্য নিহত হয়েছে। পাকিস্তান তাদের জনম জনমের শত্রু টিটিপিকে সমর্থন করার জন্য ভারতের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তুলেছে। 

পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা, স্বাধীন গবেষক ও জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের মতে, টিটিপি নেতৃত্ব আফগান সরকারের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা এবং এর সশ্রস্ত্র গোষ্ঠীরা আফগানিস্তানে অবাধে প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়েছে। আফগানিস্তানের তালেবান পাকিস্তানি গোষ্ঠীকে সমর্থন দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ এবং কূটনৈতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও আফগান ও পাকিস্তান সরকার সম্পর্ক পুনরায় ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করেছে। দেশটির শীর্ষ কূটনীতিকরা আগস্টে তাদের চীনা প্রতিপক্ষের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, কিন্তু পাকিস্তান তালেবানকে আফগানিস্তানের বৈধ কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। তবুও উভয় দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। পাকিস্তান আফগানিস্তানের শীর্ষ রপ্তানি অংশীদার এবং গত কয়েক দশক ধরে নিরাপত্তাহীনতা ও বেকারত্বের কারণে পালিয়ে আসা লাখ লাখ আফগানকে দেশটি আশ্রয় দেয়। পাকিস্তানি ও আফগান কর্মকর্তাদের মতে, রাতভর সংঘর্ষের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে প্রধান সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গত কয়েক মাসে পাকিস্তান সরকারের বহিষ্কারের এক ঢেউয়ের মধ্যে দেশটিতে বসবাসকারী কয়েক হাজার আফগান আফগানিস্তানে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছে। 

ওয়াশিংটনের গবেষণা কেন্দ্র কুইন্স ইনস্টিটিউটের আফগানিস্তান ও পাকিস্তান বিশ্লেষক অ্যাডাম ওয়েইনস্টাইন বলেন, শনিবারের সংঘর্ষ মাত্র কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছিল। তাঁর মতে, সম্ভবত এর কারণ উভয় দেশই উত্তেজনা আরও বাড়ার বিষয়ে সতর্ক থাকতে পারে। ‘পাকিস্তান এখনও কোনো ধরনের শাসন পরিবর্তনে জড়িত হতে চায় না, তবে তালেবানরা জানে, লড়াই আরও এগিয়ে নিলে তারা পাকিস্তানিদের দ্বারা পরাজিত হবে।’ 

তিনি আরও বলেন, আফগানিস্তানের বেশির ভাগ অংশজুড়ে বিমান হামলা চালাতে পারে পাকিস্তান। তবে তালেবানরা সীমান্তবর্তী কামান এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরে চাপ বাড়ানোর জন্য টিটিপি সশস্ত্র গোষ্ঠীদের সম্ভাব্য ব্যবহারের মধ্যেই সীমিত রয়েছে। শনিবার টিটিপি আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী পাকিস্তানি প্রদেশ খাইবার পাখতুনখোয়ায় ধারাবাহিক হামলার দায় স্বীকার করেছে, যেখানে বেশ কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মী ও বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে একটি পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কাছে বোমা হামলাও অন্তর্ভুক্ত।

উভয় পক্ষের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর বাসিন্দারা মোবাইল ফোনে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তারা রাতভর তীব্র সংঘর্ষ দেখেছেন, যা কয়েক ঘণ্টা ধরে চলেছে। পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী জেলা কুররামের বাসিন্দা শাব্বির খান পাহাড়ের মধ্য দিয়ে ভারী অস্ত্রের শব্দ প্রতিধ্বনিত হওয়ার ঘটনা তুলে ধরে বলেছেন, ‘কোনো ধরনের বিরতি ছাড়াই লড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে চলেছিল।’ পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী আফগানিস্তানের কুনার প্রদেশের সাওকাই জেলার বাসিন্দা আজিজ সায়ারের মতে, রাত ৯টার দিকে গুলিবর্ষণ শুরু হয়েছিল এবং তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলেছিল। তিনি বলেন, ‘রাতভর গুলি প্রতিধ্বনিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শিশুরা ভয়ে চিৎকার করে উঠল।’

জিয়া উর-রহমান, ইয়াকুব আকবরি, সাফিউল্লাহ পাদশাহ, এলিয়ান 
পেল্টিয়ার; প্রত্যেকেই প্রতিবেদক; দ্য নিউইয়র্ক টাইমস থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম 

আরও পড়ুন

×