অন্যদৃষ্টি
নারীর ‘রাজপথে’ সাইবার কাঁটা
ইফতেখারুল ইসলাম
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:১৬ | আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০২৫ | ১১:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে সাম্প্রতিক সময়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে সাইবার বুলিং ও স্লাট শেমিং। আরও দুঃখজনক ব্যাপার হলো, সাইবার বুলিংয়ের ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৮০ ভাগই নারী ও কিশোরী। ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে অশ্লীল ভিডিও, অশালীন কথাবার্তা পাঠিয়ে নারীদের হয়রানি করা হচ্ছে। এতে অনেকেই মানসিক ট্রমায় পড়েছেন। কেউ কেউ বিপর্যস্ত হয়ে পড়াশোনাও ছেড়ে দিয়েছেন। শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত একটি কনফারেন্সেও এ চিত্র উঠে এসেছে। বলা হয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনীতিতে নারীদের যুক্ততা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়; এবং ডাকসু, জাকসু ও রাকসুতে আমরা তার কিছুটা চিত্র দেখেছি। কিন্তু পত্রপত্রিকার বিভিন্ন খবরে আমরা রাজনীতি থেকে নারীদের দূরে রাখতে সাইবার বুলিং ও স্লাট শেমিং হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করার চিত্র দেখেছি। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে নারী শিক্ষার্থীদের অনেকে আগ্রহ থাকলেও প্রার্থী হননি।
সমকালের ২৯ আগস্টের প্রতিবেদন বলছে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী শ্রাবণী জামান জ্যোতি একজন জুলাইযোদ্ধা। জাকসু নির্বাচনে আগ্রহ থাকলেও প্রার্থী হননি। তাঁর মতে, ‘জুলাই আন্দোলনের পর নারীর প্রতি সাইবার বুলিং ও স্লাট শেমিং বেড়েছে। কিছু বিষয় এমন, সত্যি নিতে পারি না। ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলে এসব আরও বাড়বে বলে ঝুঁকি নিইনি।’ জ্যোতির মতো অনেকে একই কারণে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া থেকে বিরত থেকেছেন। এটি জাকসু নির্বাচনের জরিপ থেকেও বেশ সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এখন দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারী-পুরুষের হার প্রায় সমান। অর্ধেক ভোটার ছাত্রী হলেও জাকসু নির্বাচনে মোট ১৫০টির মধ্যে নারী প্রার্থী ছিলেন মাত্র ২৫ শতাংশ পদে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় সংসদে ভিপিসহ চার পদে কোনো ছাত্রী নেই। বেশির ভাগ ছাত্রী হলের নির্ধারিত ১৫ পদের কোটা পূরণ হয়নি। আরও হতাশাজনক হলো, ৫৬ পদে কোনো নারী মনোনয়ন ফরমই তোলেননি।
রাজনীতি ও সামাজিক কাজে, ঐতিহাসিক কারণে, নারীর অংশগ্রহণ সীমিত। প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এ সমস্যা কমিয়ে আনার সুযোগ থাকলেও তা যথেষ্ট ফল দিচ্ছে না। তার প্রধান কারণ এ ব্যাপারে আমাদের সামষ্টিক কোনো তৎপরতা গড়ে ওঠেনি, বরং সামাজিক নানা ফ্যাক্টর নারীকে উৎসাহের বদলে হতাশ করেছে। এ জন্য রাজনীতি দূরের কথা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও নারীর অংশগ্রহণ সন্তোষজনক নয়। হাল আমলে বিভিন্ন বট অ্যাকাউন্ট থেকে নারীকে হেনস্তা করার ঘটনা অনেক বেড়েছে। ছাত্র সংসদ নির্বাচনকালে এসব ঘটনা ব্যাপক রূপ পেয়েছিল। অথচ জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম শক্তি ছিলেন নারীরা। অভ্যুত্থানের পরপরই তাদের বেশির ভাগই হারিয়ে গেছেন, যারা আছেন তাদের মাটি কামড়ে লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে, এ যেন রাজপথে নারীর সাইবার কাঁটা।
সরাসরি তো বটেই, ছেলেদের একটা অংশ অনলাইনেও অশ্লীল ভিডিও, ছবি কিংবা বার্তা পাঠিয়ে নারীকে বিব্রত করে। এতে তারা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে নিজেদের দূরে রাখতে বাধ্য হন। এ ধরনের ফল কোনো সমাজের জন্য মঙ্গল নয়। নারী-পুরুষের পারস্পরিক ও সমানভাবে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র যেভাবে এগোতে পারে, সেটি কেবল এক পক্ষ দিয়ে সম্ভব নয়। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র এ অপচয়ের ভার বহন করতে পারে না। তাই নারী অধিকার নিয়ে রাষ্ট্রের সক্রিয় হওয়ার সময় এখনই। সচেতন পুরুষ মাত্রই এ বিষয়ে সোচ্চার হতে হবে। নারীকেও এগিয়ে আসতে হবে এবং তাদেরই সব ধরনের সাইবার বুলিং ও স্লাট শেমিংয়ের বিরুদ্ধে প্রথমে কণ্ঠ ছাড়তে হবে। এ ব্যাপারে নিজেরা প্রতিশ্রুতিশীল থেকে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নারীর ব্যাপারে আরও বেশি তৎপর হওয়া জরুরি।
ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল
