ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সাদা কালো

‘বৃহত্তর’ রাজনৈতিক জোটের সম্ভাব্য বিপদ

‘বৃহত্তর’ রাজনৈতিক জোটের সম্ভাব্য বিপদ
×

সাইফুর রহমান তপন

সাইফুর রহমান তপন

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:২৬ | আপডেট: ৩০ অক্টোবর ২০২৫ | ১৩:৫৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী বছর ফেব্রুয়ারির প্রথম ভাগে অনুষ্ঠিত হবে, এটাই এখন পর্যন্ত সাব্যস্ত। তবে এ নিয়ে জনমনে সন্দেহও কম জাগছে না; বিশেষত মঙ্গলবার  জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার কাছে দেওয়া জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশমালা দেখে। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি কমিশনের পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানালেও বিএনপি এর বিরুদ্ধে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ মঙ্গলবারই সাংবাদিকদের কাছে প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে বলেছিলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ‘নিষ্কৃতি’ পাওয়ার জন্য আলোচনা ও সিদ্ধান্ত-‘বহির্ভূত’ বিষয় সংযুক্ত করে সুপারিশ জমা দিয়েছে। আর বিএনপি মহাসচিব বুধবার এক অনুষ্ঠানে ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশকে ‘জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রতারণা’ হিসেবে বর্ণনা করে প্রধান উপদেষ্টার কাছে সেসব সুপারিশ সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ডা. আবদুল্লাহ মো. তাহের বুধবার কমনওয়েলথের ‘ইলেকটোরাল সাপোর্ট’ শাখার উপদেষ্টা ও ‘প্রি-ইলেকশন অ্যাসেসমেন্ট’-প্রধান লিনফোর্ড অ্যান্ড্রুজের নেতৃত্বাধীন টিমের সঙ্গে বৈঠকের পর সংবাদকর্মীদের বলেছেন, নির্বাচন কোনো কারণে পিছিয়ে গেলেও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন যেন না পেছায়, সে জন্য আগে গণভোট হতে হবে (প্রথম আলো)। স্পষ্টত, জামায়াত এখনও জুলাই সনদের ভিত্তিতে নির্বাচন চায়, যা এনসিপিরও দাবি। সমকালের এক প্রতিবেদন বলছে, বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে গোলটেবিল আলোচনায় এনসিপি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের যে রূপরেখা তুলে ধরেছে, তাতে পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট দাবি করা হয়েছে, যাতে পরবর্তী নির্বাচনে বেশ কিছু সংস্কার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়।

নির্বাচন নিয়ে সংশয় এমন সময়ে উদ্ভূত হলো যখন দেড় যুগের বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির মরিয়া প্রত্যাশা নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন হোক। সম্ভবত এ কারণে জুলাই সনদের বহু বিষয়ে শুরুতে আপত্তি করলেও শেষ দিকে দলটি ছাড় দিয়েছে। নির্বাহী আদেশে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের বিরোধিতা করে দলটির মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য আওয়ামী লীগের ভাগ্য জনগণের হাতেই ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের সময় ঠিক হওয়ার পর বিএনপির সুর পাল্টে যায়। 

গত মে মাসে জামায়াত ও এনসিপির চাপে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করে সরকার। তাদের নিবন্ধন, প্রতীকও স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন। বিএনপি মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ তখন বলেছিলেন, বিচারিক প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের জন্য তারা সরকারকে একাধিকবার চিঠি দিয়েছেন। সম্প্রতি আরেকবার সালাহউদ্দিন বলেছেন, ‘বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কোনো রাজনৈতিক দলকে দল হিসেবে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি নির্ধারিত হোক। আদালতকে সিদ্ধান্ত নিতে দিন’ (বিবিসি, ২৬ অক্টোবর, ২০২৫)। 

ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে সংশোধনী এনে বলা হয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের কোনো মামলায় কারও বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হলে সেই ব্যক্তি জাতীয় সংসদ এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। এ ছাড়া সম্প্রতি মামলায় পলাতক আসামিরা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না– এমন বিধান রেখে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (সংশোধন) অধ্যাদেশের খসড়া অনুমোদন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। ফলে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতি দীর্ঘকাল ধরেই আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগবিরোধী– এই দুই ভাগে বিভক্ত। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ রাজনীতিতে বর্তমানে প্রাধান্য বিস্তারকারী দলগুলো ‘আওয়ামী লীগবিরোধী’। বিএনপি সম্ভবত মনে করছে, আওয়ামীবিরোধী শিবিরে বিরোধ বাড়লে কার্যত তাদেরই ক্ষতি হবে। কারণ তখন একদিকে এ শিবিরের নেতৃত্ব চলে যেতে পারে জামায়াতের হাতে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ এর সুযোগ নিয়ে রাজনীতির মাঠে ফিরে আসতে পারে। আওয়ামী লীগবিরোধী শিবিরের নেতৃত্ব জন্মলগ্ন থেকেই বিএনপির হাতে।

এনসিপির সঙ্গে সুর মিলিয়ে জামায়াত ও তার জোটসঙ্গীরাও যখন বলছে– আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টিকেও ‘নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না’; বিএনপি এরও জোরালো কোনো বিরোধিতা করছে না। এমনকি কোনো কোনো দল দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকার কারণে ১৪ দলের বাকি দলগুলোকেও  নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়ার কথা বলছে। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার সাবেক জোটসঙ্গীদেরও নির্বাচনে দাঁড়াতে বাধা দিলে শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে তা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে– এমন আশঙ্কা থাকার পরও বিএনপি পরিষ্কার কিছু বলছে না।

সম্প্রতি বিএনপি ‘আন্দোলনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে ফ্যাসিবাদবিরোধী সব শক্তিকে নিয়ে’ বৃহত্তর রাজনৈতিক জোট গঠন করারও উদ্যোগ নিয়েছে। ২৭ অক্টোবর সোমবার যুবদলের ৪৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘আমরা একটিই মেসেজ দিতে চাই, যাতে আমাদের দলের ভেতরে ঐক্য থাকে, জাতির ভেতরে ঐক্য থাকে। জাতির মধ্যে ঐক্যটাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই ঐক্য বজায় রাখার জন্য কেউ যাতে বিভেদের পথে না যায়, সেই মেসেজটা আমরা দিতে চাই।’

এই প্রকল্পের অংশ হিসেবেই বিএনপি ইতোমধ্যে নির্বাচনে তার সঙ্গে গত এক দশক যুগপৎ আন্দোলনে থাকা ছোট দলগুলোকে দু-একটি করে আসন ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। ইতোমধ্যে এনসিপির সঙ্গে তাদের আসন সমঝোতার আলাপ চলছে বলে খবর বেরিয়েছে। মঙ্গলবারই বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমদ এ বিষয়ে বলেছেন, এনসিপিকে ৫০টি আসন ছাড়া হতে পারে। কয়েক মাস আগে বিএনপিরই পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, জামায়াতের প্রত্যাশা অনুযায়ী আসন ছাড়তে রাজি না হওয়ার কারণেই ধর্মবাদী দলটি নানা প্রশ্নে দীর্ঘদিনের মিত্র হওয়া সত্ত্বেও বিএনপির বিরুদ্ধে নেমেছে। ইদানীং এটাও শেনা যাচ্ছিল, বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের আসন নিয়ে আলোচনা আবারও শুরু হয়েছে। নির্বাচনের পর গঠিতব্য জাতীয় সরকারেও জামায়াতকে ভালো সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে বিএনপির শীর্ষ মহল থেকে।
শুধু ‘আওয়ামী লীগবিরোধীদের’ নিয়ে নির্বাচন হলে বিরোধী শক্তি বলে কার্যত কেউ থাকবে না। তাতে নির্বাচনটি বিগত তিনটি নির্বাচনেরই মতো প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। তবে বিএনপি তার এ মিশন নিয়ে এতটাই মশগুল যে, এসব সমালোচনার ভয়ও তাকে থামাতে পারছিল না। এমনকি তাদের প্রস্তাবিত জাতীয় সরকার আওয়ামী লীগকে দ্রুত সংগঠিত হওয়ারও সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে– এমন আশঙ্কাও বিএনপি বিবেচনায় নিতে রাজি নয়। 

প্রশ্ন উঠেছে, ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশের পর বিএনপি কি সম্বিৎ ফিরে পাবে? বিশেষত যখন এ আশঙ্কা জোরালো হয়ে উঠেছে যে, আওয়ামী লীগ ও তার সাবেক জোটসঙ্গীদের নির্বাচনের বাইরে রেখে বিএনপিকে একা করে দিয়ে জামায়াত-এনসিপিও সটকে পড়তে পারে। আমার মনে হয়, ‘দেখি না কী হয়’ জাতীয় মনোভাব নিয়ে বিএনপি শেষ পর্যন্ত দেখে যাবে। জামায়াত-এনসিপির শর্ত মেনে নির্বাচন হলেও ক্ষমতা তার হাতেই আসবে– এমন সম্ভাবনা দেখলে বিএনপি তাতেও আপত্তি করবে না।

সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×