ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জন্মদিন

হালিম বয়াতি: সঙ্গীতে একজীবন

হালিম বয়াতি: সঙ্গীতে একজীবন
×

আবদুল হালিম বয়াতি

সিরাজুল ইসলাম

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৫ | ১৭:৫২


বিচার গানের বিশেষ এক ধারা প্রবর্তন করেছেন আবদুল হালিম বয়াতি। তিনি সাধক হালিম নামেই পরিচিত। আজ ৩০ অক্টোবর ক্ষণজন্মা এই গুণী মানুষটির ৯৬তম জন্মবার্ষিকী। নানা আয়োজনে দিনটি উদযাপন করছেন তাঁর সন্তান ও ভক্ত-অনুরাগীরা। এ উপলক্ষে আজ তাঁর বাসভবন রাজধানীর মিরবাগে মিলাদ মাহফিল ও বিচার গানের আসর বসছে। ১ নভেম্বর সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমিতেও জমকালো আয়োজনে উদযাপন করা হবে হালিম জন্মোৎসব। দেশের প্রখ্যাত শিল্পীরা সেখানে গান পরিবেশন করবেন।

আবদুল হালিম বয়াতি ১৯২৯ সালে মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার বড়দোয়ালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সাত বছর বয়স থেকে তিনি গান গাওয়া শুরু করেন। ১৯৫৭ সালে বেতারে সরাসরি অনুষ্ঠানে লোকবাদ্যযন্ত্র সারিন্দা বাজান। পরবর্তীকালে এটি পূর্ব বাংলায় জনপ্রিয় বাদ্যযন্ত্র হিসেবে পরিচিতি পায়। এর আগে থেকেই সারিন্দা এ অঞ্চলের শিল্পীরা বাজাতেন। কিন্তু গ্রাম থেকে শহরে; রেডিওতে তিনিই প্রথম সারিন্দা বাজিয়ে গান পরিবেশন করেন। পরে ধীরে ধীরে এটি অন্যতম জনপ্রিয় বাদ্যযন্ত্র এবং লোকগানের প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। আজ শুধু বাংলাদেশ নয়–ভারত, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কাতেও এটি অন্যতম জনপ্রিয় বাদ্যযন্ত্র। এই সারিন্দা নিয়েও বেশ কয়েকটি গান রচনা করেছেন আবদুল হালিম বয়াতি। যেমন, ‘সারাটা জনম ভরে/ সারিন্দার গলা ধরে/ কী কথা কইলাম দয়াল/কও আমারে’। ‘বাজো বাজো সারিন্দা রে/ বাজো মধুর বোল/অল্প বয়সে তোমার সুরে/ হয়েছি পাগল...’ ইত্যাদি। 

হালিম বয়াতি গান গাওয়া শুরু করেন মাত্র ৭ বছর বয়সে। অথচ ওই বয়সে এখনও বাচ্চারা একা স্কুলে যেতে পারে না। শুধু তাই নয়; ওই সময় তিনি সারিন্দা বাজাতেন। তাঁর কোনো ওস্তাদ ছিলেন না। ঐশ্বরিক ক্ষমতা বলে তিনি একা একাই সেটি বাজানো রপ্ত করেন। তাঁর হাত ছিল পাকা। তাঁর সারিন্দার সুর এত নিখুঁত ছিল যে মনে হতো কোনো মানুষ স্পষ্ট ভাষায় কথা বলছেন। তাঁর গানেরও ওস্তাদ ছিলেন না। তাঁর মুখ থেকে অটোম্যাটিক্যালি গান বের হতো। সেটি তিনি লিখে রাখতেন। তাৎক্ষণিকভাবে তিনি গান রচনা করতে পারতেন। সেটিকে সরাসরি সুরারোপ করে পরিবেশন করার অলৌকিক ক্ষমতা ছিল তাঁর। উদাহরণ হিসেবে একটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই। হালিম বয়াতি তখন তরুণ; কিন্তু তাঁর খ্যাতি আকাশচুম্বী। প্রতিদিনই গানের আসর থাকে। একদিন গানে যাওয়ার আগে তাঁর বাবা আবদুল জব্বার মোড়লের কাছে গেলেন বিদায় নিতে। তাঁর বাবা বললেন– ‘আমার শরীর ভালো না। আজ গানে যেও না।’

বিনয়ের সঙ্গে হালিম বয়াতি বললেন, ‘আব্বা গান না হলে আয়োজকের বাড়িতে হামলা হতে পারে।’ এ কথায় সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে তাঁর বাবা বিদায় জানালেন। এটিই ছিল বাবা-ছেলের শেষ কথা। হালিম বয়াতি গান পরিবেশন করছেন। হঠাৎ সারিন্দার সুরের তারটি ছিঁড়ে যায়। তাঁর আর বুঝতে বাকি রইলো না তাঁর বাবা আর নেই। তিনি গান শেষ করে বাড়িতে এলেন পরদিন। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। বাড়িতে ঢোকার আগেই চোখে পড়ল একটি নতুন কবর। তিনি কবরের পাশে বসে গেয়ে উঠলেন, ‘এই দেখিলাম সোনার ছবি/ আবার যাইয়া দেখি নাই/ তুমি এমন করে ছেড়ে যাইবা রে দয়াল/ আগে জানি নাই।’ এটি তাঁর বিখ্যাত গানগুলোর মধ্যে অন্যতম। এখনও প্রায় সব শিল্পী গানটি গেয়ে থাকেন।

হালিম বয়াতি কতগুলো গান রচনা করেছেন, তা সঠিকভাবে জানা যায় না। তবে ছয় হাজারের মতো গান বিভিন্ন বইয়ে আছে। এগুলোর বেশির ভাগই আধ্যাত্মিক গান। পবিত্র আল কোরআনের শূরাগুলো ব্যাখ্যা করে তিনি গান রচনা করেছেন। দেহতত্ত্ব, শরীয়ত, মারেফত, হকিকত, তরিকত নিয়ে তিনি গান রচনা করেছেন। আল্লাহ, হজরত মুহাম্মদ (সা.), বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী (র.), খাজা মঈনুদ্দীন চিশতিকে নিয়েও তিনি গান রচনা করেছেন। দেশাত্মকবোধক গান রচনাতেও তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গান হলো– ‘উজান আর ভাটির লহর/ দেখিলাম কতই মকর/পাইলাম না তাহার খবর/তবু কেন তাহারে খুঁজি।’ ‘অমূল্য ধন বিক্রি করে/ বিনামূল্যে পাবি রে/ মারেফতের দেশে যদি যাবি।’ ‘হৃদয় মাঝে তোমার ছবি/ জাগে নিশিদিনে/ পলকে পলকে রে বন্ধু/ পড়ে আমার মনে।’ ‘জ্ঞানের আয়না ভক্তির পায়রা/মুর্শিদ রূপে ছুরাত দেখো/ স্বরূপে রূপ দেখতে চাইলে/ ধ্যানের ঘর কর লক্ষ্য।’ ‘এশকেতে এলাহি পাবি/ প্রেমরসে থাক ডুবি/ গুরুর বাড়ি শিষ্যের বাড়ি/ বিনা তারে তার লাগাবি।’

লোকসংগীতে বিশেষ অবদানের জন্য আবদুল হালিম বয়াতিকে ২০০১ সালে বাংলা একাডেমি সম্মানসূচক ফেলোশিপ প্রদান করে। এ ছাড়া তিনি কবি জসীম উদ্‌দীন গবেষক স্বর্ণপদক পেয়েছেন। ২০০৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি দেহত্যাগ করেন।
 
সিরাজুল ইসলাম: সাংবাদিক 

আরও পড়ুন

×