ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

তৃতীয় মেরু

গণভোটের বিভ্রম এবং গণতান্ত্রিক বাস্তবতা

গণভোটের বিভ্রম এবং গণতান্ত্রিক বাস্তবতা
×

শেখ রোকন

শেখ রোকন

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:২২ | আপডেট: ০২ নভেম্বর ২০২৫ | ১১:১০

| প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের যে সুপারিশমালা গত মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে তুলে দিয়েছে, এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের ‘আইনি ভিত্তি’ তৈরিতে একটি গণভোট অনুষ্ঠানের কথাও বলা হয়েছে সেখানে। 

যে কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গণভোট বা রেফারেন্ডাম একটি স্বাভাবিক সাংবিধানিক বা শাসনতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। সাধারণত যে দেশের গণতন্ত্র যত উন্নত, সেখানে গণভোটের সংখ্যা তত বেশি। যেমন ১৮৪৮ সালে আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সুইজারল্যান্ডে ছয় শতাধিক গণভোট হয়েছে। গণভোটের সংখ্যা ইতালিতে ৭২, অস্ট্রেলিয়ায় ৪৫, আয়ারল্যান্ডে ৩৫, যুক্তরাজ্যে ১৩। আবার, অসাধারণত, জাপান বা ভারতের মতো দেশে কখনোই গণভোট হয়নি। 

বাংলদেশে এ পর্যন্ত তিনটি গণভোট হয়েছে; ১৯৭৭ সালের ৩০ মে, ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ এবং ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। প্রথম দুটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল যথাক্রমে জিয়াউর রহমান এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব প্রক্রিয়ার প্রতি জনসাধারণের ‘আস্থা ও সমর্থন’ যাচাইয়ের জন্য। তৃতীয়টি অনুষ্ঠিত হয়েছিল রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় ফেরার জন্য।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণভোটের প্রবণতা ও ফলাফল যাচাই করলে দেখা যায়, উন্নত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটার উপস্থিতি অনেক কম থাকে; অন্যদিকে, দুর্বল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটার ‘উপস্থিতি’ বিপুল সংখ্যায় থাকে। যেমন এ বছর জুন মাসে ইতালিতে মাত্র ৩০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতির কারণে অভিবাসী আইন বিষয়ক গণভোটটি বাতিল হয়ে গেছে। আবার পশ্চিম আফ্রিকা দেশ গিনিতে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বয়কট সত্ত্বেও এ বছর সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত গণভোটে ৯০ শতাংশের বেশি ‘ভোটার উপস্থিতি’ ছিল। এই গণভোটের সমর্থন নিয়ে দেশটির সামরিক শাসক জেনারেল মামাদি দুমবোয়া ক্ষমতায় থেকেই এখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।

বাংলাদেশে প্রথম গণভোটে ৮৮ দশমিক ১ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি ছিল; এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছিল ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ‘না’ ভোট ছিল মাত্র ১ দশমিক ১ শতাংশ। দ্বিতীয় গণভোটে ভোটার অংশগ্রহণের হার ছিল ৭২ দশমিক ২ শতাংশ; ‘হ্যাঁ’ ভোট ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ‘না’ ভোট ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। তৃতীয় গণভোটে ভোটার অংশগ্রহণের হার ছিল ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ; হ্যাঁ ভোট ৮৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ, না ভোট ১৫ দশমিক ৬২ শতাংশ।

গণভোট নিয়ে ঐকমত্য থাকলেও, এর সময় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। বিএনপি যদিও জাতীয় নির্বাচনের দিনেই গণভোট আয়োজনের পক্ষে; জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ কয়েকটি দল জাতীয় নির্বাচনে আগেই–এমনকি নভেম্বরের মধ্যে গণভোট চায়। জাতীয় পার্টি জানিয়েছে, তারা গণভোটের পক্ষেই নয়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বক্তব্য জানা যায়নি, স্বাভাবিকভাবেই।

এবারের গণভোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিগত প্রশ্ন থাকুক; খোদ গণভোটটি কারিগরি দিক থেকে বিভ্রান্তিমূলক। যেমন বাংলাদেশে আগে অনুষ্ঠিত তিনটি গণভোটে ব্যালটে একটিমাত্র প্রশ্ন থাকায় ভোটারদের পক্ষে হ্যাঁ বা না বলা সহজ ছিল। কিন্তু এবার প্রশ্ন সংখ্যা ও গুণগত দিক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠকের ভিত্তিতে ভিন্নমতসহ ও ভিন্নমতছাড়া ৮৪টি প্রস্তাব জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। সেখান থেকে ভিন্নমতছাড়া ৪৮টি প্রস্তাবের ওপর গণভোট হবে।

এটা কাণ্ডজ্ঞানের প্রশ্ন যে, সকল ভোটারের পক্ষে এই ৪৮টি প্রস্তাব পাঠ, অনুধাবন ও সিদ্ধান্তগ্রহণ কি সম্ভব? এছাড়া কোনো ভোটার যদি কিছু প্রস্তাবের পক্ষে ও কিছু প্রস্তাবের বিপক্ষে থাকেন, তিনি হ্যাঁ ভোট, নাকি না ভোট দেবেন? 

এছাড়া, সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহ্‌দীন মালিক যে প্রশ্ন তুলেছেন, সেটা যথার্থ–‘সম্পূর্ণ অবাস্তব ধারণা থেকে গণভোটের কথা বলা হচ্ছে। সাধারণত গণভোট হয় আগের সংসদ একটা ব্যাপারে একটা আইন পাস করলো বা সংবিধানের সংশোধনী পাস করলো। তারপরে দ্বিতীয় ধাপে গিয়ে জনগণও এটিকে গ্রহণ করছে কিনা ওই জন্য গণভোট হয়’ (ডয়েচে ভেলে বাংলা, ৩১ অক্টোবর ২০২৫)।

এই প্রশ্নও তোলা যায়, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় নভেম্বরে একটি ও ফেব্রুয়ারিতে আরেকটি জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচন কি বাস্তবসম্মত? স্পষ্টতই, এবারের গণভোটের পক্ষের অ্যাডভোকেটরা ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বাস্তবতাও বুঝতে চাননি।     

বাংলাদেশে ইতোমধ্যে অনুষ্ঠিত তিনটি গণভোটের তৃতীয়টি আমার চাক্ষুষ করার সুযোগ হয়েছিল। বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের একটি উপজেলা সদরে। তখনকার দুই প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয়ই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ছিল। তবে কোনো পক্ষেই জোরালো প্রচারণা ছিল না। সম্ভবত ক্ষমতাসীন দল হিসেবে ভোটের দিন বিএনপি ও এর অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীর কেউ কেউ বারবার ঢুকে ‘হ্যাঁ ভোট’ দিয়ে আসছিলেন। তাদের মধ্যে ছাত্রদলের একজন স্থানীয় নেত্রী এবং সম্পর্কে আমার আত্মীয়ও ছিলেন। মনে আছে, দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা দেখেও না দেখার ভান করছিলেন। এক পর্যায়ে অনুযোগ করেছিলেন– ‘আপনি বারবার যাচ্ছেন কেন, আর কাউকে পাঠান’!

এসব সত্ত্বেও গোটা দেশের বিপরীতে গিয়ে ওই উপজেলাসহ গোটা রংপুর অঞ্চলেই ‘না ভোট’ জয়যুক্ত হয়েছিল। এখন জানা যাচ্ছে, রংপুর অঞ্চলে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৪৮টি ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিপরীতে ‘না’ ছিল ২ লাখ ৫৩ হাজার ৫৫৭টি (সমকাল, ৩১ অক্টোবর ২০২৫)।

কারণ সহজেই অনুমেয়, মাত্র ৭ মাস আগে, ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বৃহত্তর রংপুরের পাঁচ জেলার ২২টি আসনের মধ্যে ১৭টি পেয়েছিল জাতীয় পার্টি। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ একাই পাঁচটি আসনে বিজয়ী হন। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হলেও ‘অমপুরের ছৈল’ তাঁর নিজভূমিতে জনসমর্থন হারাননি, বরং বেড়েছিল। পরবর্তী গণভোটটিকেও রংপুরবাসী ‘এরশাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র’ হিসেবে গ্রহণ করেছিল।

কথা হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার প্রযোজিত গণভোটটির সময় ও পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক অনৈক্যও বুমেরাং হতে পারে। যদি বিএনপির আপত্তি উপেক্ষা করা হয়, দলটির বিপুল কর্মী-সমর্থক দলে দলে গিয়ে ‘না ভোট’ দিয়ে আসতে পারে। বস্তুত, অনলাইনে ইতোমধ্যে এর ছাপ স্পষ্ট। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সমর্থক দেশের অন্তত ২৫-৩০ শতাংশ জনগণও তো কর্পূরের মতো উবে যায়নি! ক্ষয়িষ্ণু হওয়া সত্ত্বেও জনসমর্থনের দিক থেকে জাতীয় পার্টির অবস্থান এখনও অন্তত চতুর্থ। বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টির মধ্যে সখ্য না থাকলেও গণভোটের সরল অঙ্কে তিন দলের ‘না ভোট’ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই যোগ হতে পারে বৈকি। শুধু জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির সম্ভাব্য ‘হ্যাঁ ভোট’ দিয়ে সেই সমীকরণ সামলানো যাবে? রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকের বাইরেও যে ‘সুইং ভোটার’ রয়েছে, গত দেড় বছরের অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম তাদেরও বড় অংশকে হতাশ করেছে। এর প্রভাব যে গণভোটে পড়বে না, কে বলতে পারে?

গত বছরের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দল-মত, শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল পরিবর্তনের প্রত্যাশায়। শত শত মানুষের প্রাণহানি ও হাজার হাজার মানুষের রক্তপাতের বিনিময়ে হলেও তারা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা দেখতে চেয়েছিল। আমিসহ অধিকাংশ নাগরিক গত তিনটি নির্বাচনে ভোট দিতে পারিনি; আর যাদের বয়স ত্রিশের নিচে, তারা গোটা জীবনেই ভোট দিতে পারেনি। এখন, গণভোট নিয়ে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশেষের গোয়ার্তুমিতে যদি জাতীয় নির্বাচনই পিছিয়ে বা অনিশ্চিত হয়ে যায়, এর দায় কে নেবে?

শেখ রোকন: লেখক ও নদী গবেষক
[email protected]

আরও পড়ুন

×