ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নারী ক্রিকেটারের অভিযোগ

স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত করুন

স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত করুন
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১১ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:১৭ | আপডেট: ১১ নভেম্বর ২০২৫ | ১২:০১

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের সাবেক নির্বাচক ও ব্যবস্থাপক মঞ্জুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে জাতীয় নারী দলের ক্রিকেটার জাহানারা আলম যৌন হয়রানির যেই অভিযোগ উত্থাপন করিয়াছেন, উহা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত জাহানারা সম্প্রতি ঢাকাভিত্তিক একটি ইউটিউব চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করিয়াছেন, ২০২১ সাল হইতে দেড় বৎসরাধিককাল ধরিয়া মঞ্জুরুল তাঁহাকে নানাভাবে যৌন হয়রানি করিয়াছেন। জাহানারার অভিযোগের পর সৃষ্ট চাঞ্চল্য না কাটিতেই জাতীয় দলের অপর ক্রিকেটার রোমানা আহমেদ এবং সাবেক ক্রিকেটার ও কোচ রেশমা আক্তার আদুরিও অভিন্ন অভিযোগ করিয়াছেন। তাঁহাদের এই অভিযোগ অধিকতর উদ্বেগজনক, ক্রিকেট বোর্ডের শীর্ষ পর্যায়ে লিখিতভাবে জানাইয়াও যাহার প্রতিকার মিলে নাই। অভিযোগগুলি সত্য হইলে ইহা স্পষ্ট– দেশের ক্রিকেটাঙ্গন নারীবান্ধব নহে। অথচ নারী ক্রিকেট বিশ্বপরিসরে দিন দিন জনপ্রিয় হইয়া উঠিতেছে; বাংলাদেশও এই ক্ষেত্রে পিছাইয়া নাই। শুধু জাতীয় দল গঠনের মধ্য দিয়া দেশে নারী ক্রিকেটের যাত্রা হইলেও বর্তমানে বিভাগওয়ারি দল গঠন করিয়া জাতীয় লিগও অনুষ্ঠিত হইতেছে। অর্থাৎ নারীরা পেশাদার ক্রিকেটাররূপে নিজেদের গড়িয়া তুলিতে ক্রমশ উৎসাহিত হইতেছেন। এমতাবস্থায় নারী ক্রিকেটারগণ যদি প্রতিকারহীন যৌন হয়রানির শিকার হইতে থাকেন, তাহা হইলে নারীদের ক্রিকেটমুখী স্রোত নিশ্চিতভাবেই বাধাগ্রস্ত হইবে। তৎসহিত ক্রিকেটের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নও থমকিয়া যাইবে।

ইহা সত্য, আমাদের সমাজ অদ্যাবধি পুরুষতন্ত্রে বাঁধা। বিগত কয়েক দশকে নারী শিক্ষার প্রসার ঘটিলেও উক্ত পথ মসৃণ নহে। এই কারণে প্রাথমিকে নারী শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ ব্যাপক হইলেও মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষায় নারী শিক্ষার্থীর ঝরিয়া পড়িবার হার উদ্বেগজনক। রাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ অতীতের তুলনায় বৃদ্ধি পাইলেও সকল ক্ষেত্রেই নারীকে সমস্যাসংকুল পথ পাড়ি দিতে হয়। সংস্কৃতি ও ক্রীড়ায় নারীর অংশগ্রহণও সমস্যাহীন নহে। পথঘাট, কর্মস্থল, এমনকি গৃহেও হেনস্তা ও যৌন নিপীড়ন নারীর জন্য চ্যালেঞ্জ হইয়া রহিয়াছে। অদ্যাবধি বহু সমীক্ষায় দেখা গিয়াছে, গৃহে কিংবা বাহিরে জীবনে একবারও যৌন হেনস্তার শিকার হন নাই– দেশে এমন নারী বিরল। তথাপি জাহানারার ন্যায় ক্রিকেটারের নিপীড়নের শিকার হইবার বিষয় মানিয়া লওয়া কঠিন। 

আমরা জানি, ২০০৯ সালে দেশে বিশেষত স্কুল-কলেজের নারী শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানির ঘটনা ভয়াবহরূপে বৃদ্ধি পাইলে উচ্চ আদালত সরকারি-বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি বা সেল গঠনের নির্দেশ দিয়াছিলেন। অদ্যাবধি অল্প কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যতীত সর্বত্রই উহা উপেক্ষিত। উদাহরণস্বরূপ, বিসিবিতে তো এই প্রকার সেল বা কমিটি গঠনের কথা ছিল। বাস্তবে কি তাহা গঠিত হইয়াছে? থাকিলে জাহানারাকে হয়তো ঘটনার চার বৎসর পর আসিয়া ইউটিউব চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিয়া প্রতিকার প্রত্যাশা করিতে হইত না।
এই যে জাহানারার অভিযোগের ভিত্তিতে বিসিবি দ্রুত একটা তদন্ত কমিটি গঠন করিয়াছে, তাহাও কি সংস্থাটির বিশেষত নারী ইস্যুতে সংবেদনশীলতা প্রমাণ করে? সংবাদমাধ্যমের খবর, জাহানারার অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত বিসিবি গত বৃহস্পতিবার রাত্রেই জানাইয়াছিল। শনিবার তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির নাম ঘোষণা করিয়াছে বিসিবি। কমিটিকে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশ জমা দিতে হইবে। কিন্তু এই কমিটির তিনজনের দুইজনই বিসিবি বা ক্রীড়া ফেডারেশন-সংশ্লিষ্ট; নারী হইলেও যাহাদের পক্ষে প্রতিষ্ঠানের বাহিরে চিন্তা করিবার সুযোগ নাই। তাই দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা টিআইবি তদন্ত কমিটিতে স্বতন্ত্র কোনো বিশেষজ্ঞ রাখিবার দাবি জানাইয়াছে। আমাদের প্রত্যাশা, বিসিবি অবিলম্বে এই সুপারিশ বিবেচনা করিয়া স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য তদন্তের ব্যবস্থা করিবে। 

কেবল জাহানারা নহেন; অপর দুই ক্রিকেটারের অভিযোগও আমলে লইতে হইবে। এই আশঙ্কাও অমূলক হইতে পারে না, নিপীড়নের শিকার আরও নারী ক্রিকেটার জনপরিসরে মুখ নাও খুলিতে পারেন। জনান্তিকে হইলেও তাহারা যাহাতে অভিযোগ উপস্থাপন করিতে পারেন, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণের বিকল্প নাই।

আরও পড়ুন

×