ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

উচ্চশিক্ষা

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলভিত্তিক শিক্ষা কতটা কাজে দেবে?

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলভিত্তিক শিক্ষা কতটা কাজে দেবে?
×

ফাইল ছবি

মো. আসিরুল হক

প্রকাশ: ১১ নভেম্বর ২০২৫ | ১৪:০৫ | আপডেট: ১১ নভেম্বর ২০২৫ | ১৮:৫৫

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় একটা নতুন যুগের সূচনা হয়েছে ফলভিত্তিক শিক্ষা (আউটকাম বেজড এডুকেশন বা ওবিই) নামক এ ধারণার মাধ্যমে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কলেজগুলোয় সাম্প্রতিককালে নতুন পাঠ্যক্রম এবং সিলেবাস চালু হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট ফল অর্জনে কেন্দ্রীভূত। কিন্তু এ পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়েছে যে শিক্ষক সম্প্রদায়, তাদের অধিকাংশেরই ওবিইর মূল ধারণা, শিক্ষাদানের পদ্ধতি (পেডাগোজি) এবং মূল্যায়নের কৌশল নিয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। এ সমস্যার সম্ভব কীভাবে? একদিকে সরকারি নির্দেশনায় ওবিই পাঠ্যক্রম চালু করতে হবে, অন্যদিকে শিক্ষকরা তাত্ত্বিক জ্ঞান ছাড়াই শিক্ষার্থীদের শিখনফল অর্জনে সাহায্য করবেন কীভাবে? এ প্রশ্নটি শুধু শিক্ষকদের মনে নয়, গোটা শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ জাগাচ্ছে।

ওবিইর মূল ধারণা হলো শিক্ষাকে ফলকেন্দ্রিক করা অর্থাৎ শিক্ষার্থী কী শিখেছে তা নয়, বরং সে কীভাবে সেই জ্ঞান প্রয়োগ করতে পারে, কী দক্ষতা অর্জন করেছে, তা মূল্যায়ন করা। এতে শিক্ষকদের ভূমিকা পরিবর্তিত হয়। তারা আর ক্লাসরুমে একতরফা বক্তৃতা দেবেন না, বরং শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে দক্ষতা গড়ে তুলবেন। কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কলেজগুলোয় যেখানে হাজার হাজার শিক্ষক কাজ করছেন, এ পরিবর্তনের জন্য কোনো প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। ফলে শিক্ষকরা একটা অদৃশ্য জালে আটকে পড়েছেন। পুরোনো পদ্ধতিতে শিক্ষা দিলে পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্য হবে না, আর নতুন পদ্ধতি চেষ্টা করলে অভিজ্ঞতার অভাবে ব্যর্থতার শঙ্কা আছে।

শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের অভাব এবং সম্পদের ঘাটতি
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলোয় ওবিই চালু হওয়ার পর শিক্ষকদের মুখ্য সমস্যা হলো প্রশিক্ষণের অভাব। বেশির ভাগ শিক্ষক এখনও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাদানের সঙ্গে পরিচিত, যেখানে বইয়ের অধ্যায় শেষ করাই ছিল লক্ষ্য। কিন্তু ওবিই-এ ফোকাস পড়ে শিক্ষার্থীর দক্ষতা, যেমন যোগাযোগ দক্ষতা, বিশ্লেষণাত্মক চিন্তাভাবনা এবং দলগত কাজের ওপর। এ পরিবর্তনের জন্য শিক্ষকদের নতুন পদ্ধতি শিখতে হবে। যেমন শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিখণ পদ্ধতি, প্রজেক্টভিত্তিক শিক্ষা, কেস স্টাডি বা রুব্রিকভিত্তিক মূল্যায়ন। কিন্তু বাস্তবে এমন কোনো ব্যবস্থা প্রণালি নেই। ২০১২ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ওবিই চালু করার সময় কারিকুলাম সংশোধন, প্রোগ্রাম এডুকেশনাল অবজেক্টিভস নির্ধারণ এবং প্রোগ্রাম আউটকামস স্থাপনের চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের অভাব সবচেয়ে বড়।

এ ছাড়া কলেজগুলোয় প্রতি শ্রেণিতে অধিক শিক্ষার্থী (১০০-২০০), শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের অসমতা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এ সংকট আরও গভীর করে তুলেছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির শিক্ষার্থীদের মধ্যে ওবিইর প্রস্তুতির মাত্রা মাঝারি-নিম্নমানের। এর জন্য শিক্ষকদের প্রতিশ্রুতি এবং প্রশিক্ষণের অভাবকে দায়ী করা হয়েছে। ফলে শিক্ষকরা দ্বিধায় পড়ে যান। পুরোনো পদ্ধতি অনুসরণ করলে ওবিইর লক্ষ্য অর্জনে সমস্যা, নতুন পদ্ধতিতে তারা অনভ্যস্ত ও অসমর্থ। এই দ্বিধা শুধু ক্লাসরুমে সীমাবদ্ধ নয়; এটি শিক্ষকদের মানসিক চাপ বাড়িয়ে তুলছে, যা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজগুলোয় এ সমস্যা আরও তীব্র। কারণ এখানে দ্বৈত কর্তৃত্বের জটিলতা রয়েছে। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে ডিরেক্টরেট অব সেকেন্ডারি অ্যান্ড হায়ার এডুকেশনের (ডিএসএইচই) অপারেশনাল দায়িত্ব। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে আঞ্চলিকভাবে পেডাগোজির ওপর পাঁচ দিনব্যাপী সিপিডি প্রশিক্ষণ চালু করা হয়েছে। তবে সেটি খুবই স্বল্প মাত্রায়– মাত্র ২০০ শিক্ষককে ইতোমধ্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। কলেজ শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্পের (সিইডিপি) মতো উদ্যোগে কিছু শিক্ষক প্রশিক্ষিত হয়েছেন। ২ হাজার ২০০-এর অধিক কলেজের এক লাখ ৫০ হাজার শিক্ষকের মধ্যে প্রায় চার হাজার শিক্ষক, যা সংখ্যার হিসাবে খুবই অল্প। একটি কেস স্টাডিতে দেখা গেছে, সিইডিপি প্রশিক্ষণ নেওয়া শিক্ষকরা ওবিই চালুর জন্য প্রস্তুত, কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অভাব রয়েছে নেতৃত্বের সমর্থন এবং ফলোআপ ট্রেনিংয়ের। ফলে শিক্ষকরা বলছেন– আমরা জানি না কীভাবে শিক্ষার্থীদের ফল অর্জনে সাহায্য করব। কারণ আমাদের নিজেদেরই প্রশিক্ষণ নেই।

বিদেশি উদাহরণ এবং প্রশিক্ষণ
ওবিইর সফলতা বিদেশি দেশগুলোয় দেখা যায়, যেখানে শিক্ষক প্রশিক্ষণকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের মেয়ো মেডিকেল স্কুলে ২০০৭ সাল থেকে ওবিইভিত্তিক কারিকুলাম চালু হয়েছে, যেখানে ফ্যাকাল্টি ট্রেনিংয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। স্কুলটি থিম কমিটি গঠন করে আউটকামস নির্ধারণ করেছে এবং শিক্ষকদের জন্য ওয়ার্কশপ আয়োজন করেছে, যাতে তারা নতুন শিক্ষাদান পদ্ধতি (যেমন রিফ্লেকটিভ এক্সারসাইজ এবং পিয়ার অ্যাসেসমেন্ট) শিখতে পারেন। ফলে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নত হয়েছে এবং স্কুলটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। এখানে মূল কথা হলো, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ছাড়া ওবিই অর্জন অসম্ভব; যা বাংলাদেশের কলেজগুলোয় ঘটছে।

একইভাবে স্কটল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ডানডি মেডিকেল স্কুলে ১৯৯৭ সাল থেকে ওবিই চালু হয়েছে। তারা ফ্যাকাল্টি বাই-ইন অর্জনের জন্য স্টাফ ডেভেলপমেন্ট সেশন, প্রেজেন্টেশন এবং নিউজলেটার ব্যবহার করেছে। শিক্ষকরা কারিকুলাম প্ল্যানিংয়ে অংশ নিয়ে শিখেছেন কীভাবে শিক্ষার্থীদের ফলাফলের সঙ্গে শিক্ষাদান যুক্ত করতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় মেডিকেল এডুকেশন এক্সপার্টদের নেতৃত্ব এবং ধৈর্যের ভূমিকা ছিল মুখ্য, যা ফ্যাকাল্টির রূপান্তর ঘটিয়েছে। বাংলাদেশে যদি এমন স্টাফ ডেভেলপমেন্ট করা হয়, তাহলে শিক্ষকদের সংকট কমবে।

মালয়েশিয়ায় ওবিইর সফলতা আরেক উদাহরণ। অস্ট্রেলিয়ায়ও ওবিইর একটা সফল মডেল দেখা যায়।  সিঙ্গাপুরের ইয়ং লু লিন স্কুল অব মেডিসিনে ওবিই চালুর পরিকল্পনা পর্যায়ে শিক্ষকদের ট্রেনিংকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তারা মিক্সড টিচিং মেথডস এবং লংগিটিউডিনাল ট্র্যাকস (যেমন এথিক্স এবং রিসার্চ মেথডলজি) শিখিয়েছে, যা শিক্ষকদের নতুন অ্যাসেসমেন্ট ফরম্যাটে অভ্যস্ত করেছে। পাকিস্তানের আগা খান ইউনিভার্সিটি মেডিকেল কলেজে ওবিইর জন্য ফ্যাকাল্টি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম চালু হয়েছে ২০০০ সাল থেকে, যাতে শিক্ষকরা প্রবলেম-বেসড লার্নিং এবং টিম-বেসড টিচিং শিখেছেন। এতে কমিটেড ফ্যাকাল্টি এবং ফিডব্যাক প্রক্রিয়ার ভূমিকা ছিল মুখ্য, যা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য প্রাসঙ্গিক। এই উদাহরণগুলো থেকে স্পষ্ট যে, শিক্ষকদের দ্বিধা দূর করতে প্রশিক্ষণ অপরিহার্য।

সমাধানের পথ
বাংলাদেশে একটা ব্যাপক পরিকল্পনা দরকার, যা বিদেশি সফলতা থেকে শিক্ষা নেবে। প্রথমত, শিক্ষকদের জন্য ওবিই এবং পেডাগোজির ওপর বিশেষায়িত ট্রেনিং প্রোগ্রাম চালু করতে হবে। সিইডিপির মতো উদ্যোগকে প্রসারিত করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলোয় ওবিইকেন্দ্রিক ট্রেনিং ও ওয়ার্কশপ আয়োজন করা যেতে পারে। বাংলাদেশে এমন ট্রেনিংয়ে শিক্ষকরা প্র্যাকটিক্যাল সেশনে অংশ নেবেন, যেখানে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিখণ পদ্ধতি, লেসন প্ল্যানিং, মূল্যায়ন এবং রুব্রিক তৈরি করতে সহায়তা করা হবে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোকে কাজে লাগানো যেতে পারে। জেলাভিত্তিক স্বল্প মেয়াদি পেডাগোজির প্রশিক্ষণ চালু করলে দ্রুত ও কার্যকরভাবে অধিকসংখ্যক শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব।

দ্বিতীয়ত, সেমিনার এবং ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামের মাধ্যমে শিক্ষকদের সচেতন করতে হবে। লার্নিং পলিসি ইনস্টিটিউটের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, কার্যকর প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্টের সাতটা বৈশিষ্ট্য রয়েছে– কনটেন্ট ফোকাস, অ্যাকটিভ লার্নিং, কোলাবরেশন, মডেলিং, কোচিং, ফিডব্যাক এবং সাসটেইন্ড ডিউরেশন বাংলাদেশে এগুলো প্রয়োগ করে ওবিই ট্রেনিং চালালে শিক্ষকরা ক্লাসরুমে নতুন পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারবেন। উদাহরণস্বরূপ, মাসিক সেমিনারে পেডাগোজি এক্সপার্টদের আমন্ত্রণ জানিয়ে কার্যকর মডেল শেয়ার করা যেতে পারে।

তৃতীয়ত, প্রফেশনাল লার্নিং কমিউনিটিস গঠন করতে হবে, যেখানে শিক্ষকরা পিয়ার কোচিংয়ের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা বিনিময় করবেন। 
চতুর্থত, নীতিগত পরিবর্তন দরকার। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং ডিএসএইচইর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে ওবিইর জন্য জাতীয় গাইডলাইন তৈরি করতে হবে। বিদেশে যেমন ভিয়েতনাম এবং লাওসে ওবিই চালুর জন্য মাল্টিপল কেস স্টাডি করে ট্রেনিং প্রোগ্রাম ডিজাইন করা হয়েছে, যা হায়ার এডুকেশন প্রোগ্রামগুলোকে শক্তিশালী করেছে। বাংলাদেশে অনুরূপ কেস স্টাডি করে কলেজভিত্তিক ট্রেনিং চালু করা যেতে পারে।

আশাবাদী ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
শিক্ষকদের এই দ্বিধা ওবিইর বাধা নয়, বরং একটা সুযোগ– যদি আমরা সঠিক পদক্ষেপ নিই। প্রশিক্ষণ, ওয়ার্কশপ এবং সেমিনারের মাধ্যমে শিক্ষকদের প্রশিক্ষিত করলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজগুলো বিশ্বমানের শিক্ষা দিতে পারবে। 

ড. মো. আসিরুল হক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, এমসি কলেজ, সিলেট
[email protected]

আরও পড়ুন

×