ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অর্থনীতি

শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমবে?

শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমবে?
×

সাইফুল হোসেন

সাইফুল হোসেন

প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:১৭ | আপডেট: ১২ নভেম্বর ২০২৫ | ১২:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদকালে বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রাস্ফীতির লাগাম টেনে ধরার প্রধান কৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি; অর্থাৎ সুদের হার বাড়িয়ে বাজারে টাকার প্রবাহ কমানো। এর লক্ষ্য হলো মানুষ ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান যাতে সহজে ঋণ না নিতে পারে। ফলে বাজারে অর্থের চাহিদা কমে যায় এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

উল্লেখ্য, এই নীতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩ সালের মে মাস থেকে ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে টানা ১১ বার নীতিগত সুদের হার বা রেপো রেট বৃদ্ধি করেছে। ২০২৩ সালের শুরুতে যেখানে নীতিগত সুদের হার ছিল ৫ শতাংশের নিচে, সেখানে এক বছরেরও কিছু বেশি সময়ের মধ্যে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ব্যাংকগুলোর সুদের হার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ফলে নতুন ঋণ গ্রহণ ও বিনিয়োগ প্রবাহে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

এসব নীতিগত পরিবর্তন ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক ইঙ্গিত দেয়, তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য মুদ্রাস্ফীতি এক অঙ্কে নামিয়ে আনা। অর্থাৎ টাকার ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো ও দাম স্থিতিশীল রাখা। এসব প্রয়াস সত্ত্বেও প্রত্যাশিত ফল এখনও পাওয়া যায়নি। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেশের সাধারণ মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ১১.৬৬ শতাংশে, যা বিগত এক দশকের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। অর্থাৎ নীতিগত সুদের হার বাড়ানোর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক যতই অর্থপ্রবাহ কমানোর চেষ্টা করছে, বাস্তবে দ্রব্যমূল্যের চাপ তেমন হ্রাস পাচ্ছে না।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সুদের হার বাড়ানোর মতো ‘একমুখী পদক্ষেপ’ হয়তো কিছু সময়ের জন্য চাহিদা কমাতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে মুদ্রাস্ফীতি কেবল চাহিদা-চলিত নয়; বরং সরবরাহ-চলিতও। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়ন এবং আমদানিনির্ভর পণ্যের খরচ বাড়ার কারণে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে বাজারে পণ্যের সংকট তৈরি হচ্ছে, যা সুদের হার বাড়িয়ে নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব।
এই বাস্তবতায় সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির প্রয়োগ সত্ত্বেও মুদ্রাস্ফীতি দমনে কাঙ্ক্ষিত ফল তো দেয়ইনি; বরং ব্যবসা-বাণিজ্যে ঋণপ্রবাহ হ্রাস পেয়েছে, বিনিয়োগ কমেছে এবং উৎপাদন খরচ বেড়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশের ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ছিল ১১.৬৬ শতাংশ, যা এখনও বেশি। 

প্রকৃতপক্ষে শুধু মুদ্রানীতি কঠোর করলেই মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বাজারের বিকৃতি, সরবরাহ চেইনের সমস্যা এবং টাকার অবমূল্যায়নও এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। যেমন রান্নাঘরে চুলা আছে, কিন্তু গ্যাস আসে না। রান্নার উপকরণের দাম বেড়েছে, আগুন ঠিকমতো জ্বলে না। তখন রান্না দেরিতে হবে আর খাবারের দামও বাড়বে। শুধু গ্যাস সিলিন্ডারের দাম কমালে সমস্যা মিটবে না; পুরো রান্না ব্যবস্থা ঠিক করতে হবে।

ঠিক তেমনি, বাংলাদেশে শুধু সুদের হার বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। কারণ সমস্যার মূল বিষয়টি লুকিয়ে আছে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতায়। যেমন উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, আমদানিনির্ভরতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার জটিলতা।
এ ক্ষেত্রে কয়েকটি সহজ ভাষার সুপারিশ দেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, মুদ্রানীতির সঙ্গে ফিসক্যাল নীতিকে একসঙ্গেই কার্যকর করতে হবে। অর্থাৎ বাজেট ঘাটতি কমানো, কর সংগ্রহ বাড়ানো, সরকারি ব্যয় কার্যকর করা। দ্বিতীয়ত, সরবরাহ চেইন ও উৎপাদন খাতকে মজবুত করতে হবে– কৃষিতে ইনপুট খরচ কমিয়ে আনা, শিল্পে স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার বাড়ানো, আমদানির খরচ  কমিয়ে আনা। তৃতীয়ত, বাজারে প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে– সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীর দখল কমাতে হবে। চতুর্থত, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করতে হবে– আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বেশ কয়েকবার নিয়েছে। কিন্তু সুদের হার বাড়িয়েও মুদ্রাস্ফীতি দ্রুত কমছে না এবং উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অর্থাৎ শুধু সুদের হার বাড়িয়ে দেওয়াই যথেষ্ট নয়। বরং সেই নীতির সঙ্গে উল্লিখিত অন্যান্য সংস্কার ও নীতি একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। যদি তা না হয়, তাহলে মুদ্রাস্ফীতি কমবে ধীরে, আর অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়বে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন চেইন সক্রিয় রাখতে হলে ‘মুদ্রানীতি + ফিসক্যাল নীতি + সরবরাহ চেইন সংস্কার + বিনিয়োগ পরিবেশ’ এই চারটি একসঙ্গে গুরুত্ব পাবে।

সাইফুল হোসেন: ব্যাংকার ও আর্থিকবিষয়ক ব্যবস্থাপনা ও কৌশল বিশেষজ্ঞ; ‘আমি কি এক কাপ কফিও খাবো না’ গ্রন্থের লেখক 
[email protected]

আরও পড়ুন

×